চীনে ধাক্কা, যে আশায় ভারতে আসছে ব্রিটিশ অভিজাত স্কুলগুলো

অনলাইন ডেস্ক

ভারতের বাজারে শিক্ষার্থী ও মুনাফার সম্ভাবনা দেখে দেশটিতে কার্যক্রম সম্প্রসারণ করছে ব্রিটিশ ঐতিহ্যবাহী অভিজাত বেসরকারি স্কুলগুলো।

চীনে ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ সংকুচিত হওয়া এবং যুক্তরাজ্যে বেসরকারি স্কুলের ফিতে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আরোপের পর এ প্রবণতা আরও জোরালো হয়েছে।

তবে বিপুল জনসংখ্যা ও ক্রমবর্ধমান সম্পদশালী পরিবারের উপস্থিতি সত্ত্বেও ভারতের বাজারে ব্যবসা করা সহজ হচ্ছে না এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য।

ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় পাঞ্জাব রাজ্যের চণ্ডীগড় শহরের উপকণ্ঠে এ বছরের শুরুর দিকে চালু হয়েছে ইংল্যান্ডের বেডফোর্ডশায়ারে অবস্থিত ৪৭৩ বছরের পুরোনো বেডফোর্ড স্কুলের প্রথম আন্তর্জাতিক ছাত্রী ক্যাম্পাস। ‘বেডফোর্ড স্কুল, মোহালি’ নামের এ প্রতিষ্ঠানের ভবনগুলো আধুনিক স্থাপত্যে নির্মিত হলেও ক্যাম্পাসের লাল ইটের একটি চোখে পড়ার মতো ঘড়ির টাওয়ারে ফুটে উঠেছে স্কুলটির ব্রিটিশ ঐতিহ্য।

বেডফোর্ড স্কুলের এই ক্যাম্পাস ভারতে কার্যক্রম শুরু করা অন্তত ছয়টি ব্রিটিশ অভিজাত স্কুলের সর্বশেষ সংযোজন। এসব প্রতিষ্ঠান ঐতিহ্যবাহী, উচ্চ বেতননির্ভর বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। এর মধ্যে ব্রিটেনের সবচেয়ে পুরোনো স্কুলগুলোর তিনটিও রয়েছে।

ব্রিটিশ স্কুলগুলোর এই সম্প্রসারণের পেছনে ভারতের ক্রমবর্ধমান সম্ভাবনার পাশাপাশি চীনের বাজারে প্রতিকূল পরিস্থিতিও ভূমিকা রাখছে। এছাড়া ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে যুক্তরাজ্যে বেসরকারি স্কুলের ফিতে ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্তের পর অনেক প্রতিষ্ঠান বিদেশে নতুন ক্যাম্পাস স্থাপনে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।

ভারতের বিভিন্ন শহরে ব্রিটিশ স্কুল
ভারতের প্রযুক্তি ও স্টার্টআপ ব্যবসার অন্যতম কেন্দ্র বেঙ্গালুরুতে ২০২৩ সাল থেকে কার্যক্রম চালাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী হ্যারো স্কুল। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এই স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী ছিলেন। মধ্য ভারতের ভোপালে ক্যাম্পাস স্থাপন করেছে শ্রুজবেরি স্কুল। আর পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর পুনেতে কার্যক্রম শুরু করেছে ওয়েলিংটন কলেজ। সুপরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য পুনে ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ নামেও পরিচিত।

এছাড়া মিলফিল্ড, কুইন এলিজাবেথ স্কুলসহ আরও কয়েকটি ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান আগামী বছরগুলোতে ভারতে শাখা ক্যাম্পাস চালুর পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে।

ঔপনিবেশিক আমল থেকেই ভারতে ব্রিটিশ পাবলিক স্কুলের আদলে গড়ে ওঠা অভিজাত আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব স্কুলে মূলত ধনী ও অভিজাত পরিবারের সন্তানরা পড়াশোনা করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের নতুন সম্পদশালী পরিবারগুলোর মধ্যে সন্তানদের আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা দেওয়ার আগ্রহ বাড়ায় এ বাজারের পরিধি দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে হ্যারো স্কুলের বেঙ্গালুরু ক্যাম্পাসের প্রধান ক্যারোলিন পাসকো বলেন, অনেক ভারতীয় পরিবারের কাছে আন্তর্জাতিক শিক্ষাক্রম এসব স্কুল বেছে নেওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।

হ্যারো ও বেডফোর্ড ভারতের অল্প কয়েকটি স্কুলের মধ্যে রয়েছে, যেগুলো প্রাথমিক স্তর থেকে এ-লেভেল পর্যন্ত কেমব্রিজ শিক্ষাক্রম অনুসরণ করে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০ হাজার স্কুলে স্বীকৃত এ শিক্ষাকাঠামো আন্তর্জাতিকভাবে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়তা করে।

আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের আকর্ষণ
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে স্কুল পরিচালনাকারী একটি পরিবারের সদস্য হারসিমরন সিং কোচর তার পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে পরনীতকে মোহালির বেডফোর্ড স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন। তার ভাষ্য, শুধু পড়াশোনার ফলাফলের ওপর গুরুত্ব না দিয়ে শিশুর চরিত্র গঠন, আত্মবিশ্বাস ও সামগ্রিক বিকাশে স্কুলটির মনোযোগ তাকে আকৃষ্ট করেছে।

এছাড়া ভারতের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সন্তানদের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়ার যে সংস্কৃতি রয়েছে, বেডফোর্ডে তা নেই বলেও মনে করেন তিনি।

কোচর বলেন, সেখানে সব শিশুকে সমানভাবে দেখা হয়। মন্ত্রী বা সরকারি আমলাদের সন্তানরা অন্য শিক্ষার্থীদের তুলনায় বাড়তি সুযোগ-সুবিধা পায় না।

স্থানীয় ধনী পরিবার ছাড়াও অনাবাসী ভারতীয়দের একটি অংশ এসব স্কুলের গুরুত্বপূর্ণ গ্রাহক। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার পর দেশে ফিরে আসা পরিবার কিংবা যুক্তরাজ্য ও মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত যেসব ভারতীয় নিজেদের সন্তানদের শিকড় ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত রাখতে চান, তাদের কাছেও এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা রয়েছে বলে জানান পাসকো।

হ্যারোর বেঙ্গালুরু ক্যাম্পাসের ৬০ শতাংশ শিক্ষকই আন্তর্জাতিক। স্কুলটি তার ব্রিটিশ ঐতিহ্যের বিভিন্ন অনুষঙ্গও ভারতে নিয়ে এসেছে। এখানে শিক্ষকদের ‘বিকস’ নামে ডাকা হয়। শিক্ষার্থীরা হ্যারোর ঐতিহ্যবাহী টুপি ও পোশাক পরে এবং বিভিন্ন ক্যাম্পাসে আয়োজিত দীর্ঘ দূরত্বের দৌড় প্রতিযোগিতা ‘দ্য লং ডাকারে’ অংশ নেয়। ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থার ঐতিহ্যবাহী ‘হাউস সিস্টেম’ও রয়েছে সেখানে।

তবে ব্রিটিশ ঐতিহ্যের পাশাপাশি ভারতীয় সংস্কৃতিকেও জায়গা দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন সকালে ভারতের জাতীয় সংগীত গাওয়া হয় এবং উদযাপন করা হয় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান উৎসব গণেশ চতুর্থী।

চীনের বাজারে ধাক্কা, ভারতের দিকে ঝোঁক
ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং নতুন কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধি ব্রিটিশ স্কুলগুলোর সম্প্রসারণের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। তবে এই প্রবণতার পেছনে চীনের বাজারে ব্যবসার গতি কমে যাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

গত এক দশকে বিদেশে ব্রিটিশ অভিজাত স্কুলগুলোর ক্যাম্পাস সম্প্রসারণের বড় অংশই হয়েছে চীন ও হংকংয়ে। যুক্তরাজ্যের ৫০টি স্কুল পরিচালিত ১৫১টি শাখা ক্যাম্পাসের প্রায় অর্ধেকই এসব অঞ্চলে অবস্থিত।

কিন্তু নতুন বিধিনিষেধ, সরকারি পর্যায়ে বাড়তি নজরদারি এবং বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের আপত্তির কারণে চীনে সম্প্রসারণের গতি কমেছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা সংস্থা প্রাইভেট এডুকেশন পলিসি ফোরামের (পিইপিএফ) ২০২৫ সালের এক গবেষণায় এ বিষয়গুলো উঠে এসেছে।

চীনে ২০২৪ সালে কার্যকর হওয়া একটি নতুন আইনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সব বিষয়ে দেশপ্রেমমূলক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়। এর ফলে ব্রিটিশ স্কুলগুলোর জন্য সেখানে কার্যক্রম সম্প্রসারণ আরও কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি পরিকল্পিত কিছু ক্যাম্পাস স্থাপনের উদ্যোগও বাতিল হয়। এ পরিস্থিতিতে ভারত ও ভিয়েতনামের মতো বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকছে প্রতিষ্ঠানগুলো।

অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যে ২০২৪ সালের শরৎকালীন বাজেটে বেসরকারি স্কুলের ফির ওপর ২০ শতাংশ ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে। এর ফলে বিদেশে ক্যাম্পাস স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনেক প্রতিষ্ঠানের কাছে বেড়েছে।

মোহালির বেডফোর্ড স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান নাওমি অ্যাটকিনস বিবিসিকে বলেন, ভ্যাট আরোপের কারণে অনেক বেসরকারি স্কুল বিদেশে সম্প্রসারণের কথা ভাবতে বাধ্য হয়েছে।

তার ভাষায়, অনেক প্রতিষ্ঠান এখন কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। আগে যেসব স্কুল আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণের কথা ভাবেনি, তারাও এখন ভারতে সক্রিয়ভাবে সুযোগ খুঁজছে।

ভারতে ব্যবসা করা কেন কঠিন
তবে ভারতের বাজারে প্রবেশ করলেই যে সহজে মুনাফা করা যাবে, তা নয়। অ্যাটকিনসের মতে, দেশটিতে কার্যক্রম পরিচালনায় বেশ কিছু বাধা রয়েছে।

ব্রিটিশ স্কুলগুলোর অধিকাংশই স্থানীয় বিনিয়োগকারী বা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে ক্যাম্পাস স্থাপন করছে। অতীতে বিদেশের কিছু বাজারে স্থানীয় অংশীদারদের কাছ থেকে আয়ের ১০ শতাংশ পর্যন্ত ফি পাওয়া সম্ভব হলেও ভারতে কোনও কোনও ক্ষেত্রে সেই হার কমে প্রায় ১ শতাংশে নেমে এসেছে বলে জানান অ্যাটকিনস।

তার মতে, ভারতের বাজারের আকার সম্পর্কেও কিছু প্রতিষ্ঠানের ধারণা অতিরঞ্জিত ছিল।

ভারতে প্রায় ২৫ কোটি শিশু স্কুলে পড়াশোনা করলেও ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার দীর্ঘদিনের প্রচলন রয়েছে। ফলে স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা অনেক বেশি। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা ভিয়েতনামের মতো যেসব দেশে ইংরেজি শিক্ষার প্রচলন তুলনামূলক কম, সেসব দেশের সঙ্গে ভারতের বাজারের এই পার্থক্য রয়েছে।

এছাড়া ভারতের মাথাপিছু আয় তুলনামূলক কম। ব্রিটিশ অভিজাত স্কুলগুলোতে আবাসিক ব্যবস্থাসহ পূর্ণাঙ্গ শিক্ষার জন্য বছরে ১৫ হাজার পাউন্ড বা তারও বেশি ফি নেওয়া হতে পারে। এত বেশি ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য সামর্থ্যের বাইরে, যা বাজার সম্প্রসারণে বাধা তৈরি করছে।

অ্যাটকিনস বলেন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও চীনে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি দেখেছেন, ভারতীয় গ্রাহকেরা দামের ব্যাপারে তুলনামূলক বেশি সংবেদনশীল। তারা কম দামে ভালো সুবিধা পাওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন।

এ কারণে মোহালির বেডফোর্ড স্কুলে অন্যান্য ব্রিটিশ স্কুলের তুলনায় প্রায় অর্ধেক ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।

মুনাফা বাড়লেও চীনের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া কঠিন
বিদেশে ব্রিটিশ স্কুলগুলোর শাখা ক্যাম্পাস থেকে ২০১১-১২ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরের মধ্যে মোট ১৫ কোটি ২৪ লাখ পাউন্ড মুনাফা এসেছে বলে পিইপিএফের গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে এ মুনাফার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি, নতুন ধনী শ্রেণির উত্থান এবং ব্রিটিশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য—সব মিলিয়ে দেশটিতে তাদের জন্য ব্যবসার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু তীব্র প্রতিযোগিতা, ফি নিয়ে গ্রাহকদের সংবেদনশীলতা এবং পরিচালন ব্যয়ের কারণে এ বাজারে প্রবৃদ্ধি দ্রুত না হয়ে ধীর ও স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

ভারত ব্রিটিশ স্কুলগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ নতুন বাজার হয়ে উঠতে পারে। তবে নিকট ভবিষ্যতে চীনের বাজারে হারানো সুযোগ ও ব্যবসা পুরোপুরি পুষিয়ে নেওয়ার মতো বড় পরিসরে এটি সম্প্রসারিত হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। সূত্র: বিবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights