ঐক্যের জন্য চাই জ্ঞান ও মুক্তবুদ্ধি

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

আমাদের জন্য ভক্তি বৃদ্ধির কারণগুলোর মধ্যে আরেকটি হচ্ছে পরাধীনতা। রাজনৈতিক পরাধীনতা জাতিকে অনেকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা যেটা ঘটায় সেটি হলো মনস্তাত্ত্বিক। মনস্তাত্ত্বিকভাবে ঘটে আত্মবিশ্বাসের বিনাশ। আত্মবিশ্বাস একেবারে নষ্ট হয়ে যায়। পরগাছাবৃত্তি ও চাটুকারিতা বৃদ্ধি পায়। দেখা যায় তারাই উন্নতি করছে, যারা শাসকদের আশপাশে থাকে। ছোঁয়াটি হলেও পাচ্ছে এবং চাটুকারিতা করছে। আমরা বলে থাকি বাংলা ভাষায় ওই যে একটি শব্দ আছে ‘অভিমান’, অমনটি তুমি পাবে না আর কোথাও, ও যেন আমাদের পদ্মার ইলিশ; কিন্তু আরও একটি বস্তু অবশ্যই আছে আমাদের উন্নত সমাজে, সেটি হলো চাটুকারিতা। চাটুকারিতার এমন প্রাদুর্ভাব বিরল বলেই মনে করি।

এ অবস্থায় খুব কম লোকই আছে, এখানে যারা বিশ্বাস করে যে ব্যবস্থাটায় পরিবর্তন আসবে। লক্ষণ নেই। দেশে কোনো সামাজিক বিপ্লব ঘটেনি। আমরা বলেছি ইংরেজরা এসে আমাদের জন্য জ্ঞানবিজ্ঞানের নানাবিধ উৎসমুখ খুলে দিয়েছিল। দিয়েছিল বৈকি। ইংরেজি শিক্ষা আমাদের যে উপকার করেছে, সেটা মিথ্যা নয়। কিন্তু সত্য আবার এটাও যে ওই শিক্ষা যতটা মঙ্গল করেছে মনে হয় আসলে ততটা করেনি। কিছুটা অবশ্যই করেছে, কিন্তু অতটা নয়। তার কারণ ওই ভক্তি। ইংরেজির মাধ্যমে ও ইংরেজের সমর্থনে অর্জিত শিক্ষা শাসক ইংরেজের প্রতি ভক্তি বাড়িয়েছে। এমনকি এমনও তো দেখেছি, আমরা যে অত্যন্ত বিজ্ঞ ব্যক্তিরাও ছোট ইংরেজ ও বড় ইংরেজের ভিতর ভেদ রেখা টেনে বোঝাতে চেয়েছেন যে কুকীর্তি যা, তা ছোট ইংরেজরই, বড় ইংরেজ নির্দোষ। বড় ইংরেজ আমাদের ভালো করতে চায়, ছোট ইংরেজ বাধা দেয়। সত্য কিন্তু আসলে এই যে উভয় ইংরেজই ছিল সাম্রাজ্যবাদের দড়িতে বাঁধা, যে সাম্রাজ্যবাদ একটি প্রকাণ্ড ও প্রচণ্ড শৃঙ্খল হয়ে সমগ্র ভারতবর্ষকে শৃঙ্খলিত করে রেখেছিল। ছোট ইংরেজ ও বড় ইংরেজে পার্থক্যে বিশ্বাসীরা যে ইংরেজের ভক্ত ছিলেন, তাতে সন্দেহ নেই। কেউ কেউ ইংরেজের বিরুদ্ধে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাঁরা জাতীয়তাবাদী হয়েছেন। কিন্তু সেই জাতীয়তাবাদে ধর্ম এসে জুটেছে। ফলে সেটিও জ্ঞানের দিকে যায়নি, গিয়েছে ভক্তির দিকে। কেউ ইংরেজভক্ত, কেউ নিজ নিজ ঈশ্বরের ভক্ত। এটা একটা তফাৎ বটে; কিন্তু উভয়েই তো ভক্তিবাদী।

সামন্তবাদ এদেশে পুরোনো সত্য। ইংরেজ এসে সেই সামন্তবাদকে নানাভাবে উৎসাহিত করল। সাংস্কৃতিকভাবে তো বটেই, অর্থনৈতিকভাবেও। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রতিষ্ঠা ওই উৎসাহদানেরই অভিব্যক্তি।

সব মিলিয়ে এ ক্ষেত্রে সত্য একটাই; সেটা হলো কর্ম এখানে অন্ধ হয়ে রয়েছে জ্ঞানের অভাবে এবং জ্ঞান বিকশিত হতে পারছে না ভক্তির হাতে অবরুদ্ধ হয়ে। জ্ঞানের পথে অর্থনৈতিক অন্তরায় খুবই বাস্তবিক ব্যাপার। আমরা সেটা জানি এবং তাকে চিনি। বাঙালি মুসলমান যে শিক্ষা লাভের সুযোগ পায়নি তার পেছনে প্রথম নিয়ামক শক্তি ছিল তার অর্থনৈতিক দুর্দশা। কিন্তু হিন্দু-মুসলমাননির্বিশেষে যে শিক্ষা আমরা এখানে লাভ করেছি সে শিক্ষা প্রকৃত প্রস্তাবে আমাদের জ্ঞানী করেনি। শক্তি জোগায়নি বন্ধনমুক্তির। বরং উৎসাহিত করেছে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাটাকে মেনে নিয়ে ব্যক্তিগত মতলব হাসিল করার কাজে। কানে কানে বলেছে সর্বক্ষণ যে ব্যবস্থা যা আছে তাই থাকবে, এ নিয়ে তুমি মাথা ঘামিও না, সময় নষ্ট হবে; তুমি তোমার কাজ উদ্ধার করে নাও, যেমন ভাবে পার। এই যে আনুগত্যের শিক্ষা, এ বড় গভীর ব্যাপার। অত্যন্ত গভীরেই আমরা ভক্তিবাদী, জ্ঞানবাদী নই।

কৃষক কেন, উচ্চশিক্ষিত মহলেও দেখতে পাব গভীর অবিশ্বাস রয়েছে পরিবর্তনের ব্যাপারে। এমনিই তো ছিল, এমনি থাকবে। চেষ্টা হয়েছে, বদলায়নি। যারা বদলাবে বলেছিল, হয় তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, নয় তো আপস করে অনুগতদের চেয়েও অনুগত হয়ে যেটুকু পিছিয়ে পড়েছিল সেটুকু পুষিয়ে নেওয়ার জন্য খ্যাপার মতো ছোটাছুটি শুরু করে দিয়েছে। ঠিক এ কথাগুলো কদিন আগে আমার এক পরিচিতজন বলছিলেন। খুবই বিজ্ঞ তিনি এবং অবশ্যই অভিজ্ঞ। বিদেশে লেখাপড়া করেছেন। উঁচু উঁচু পদে কাজ করেছেন, তিনি আমাকে বুঝিয়ে বললেন যে কিছুই হবে না, এই রকমই চলবে, শুধু দোয়া করতে হবে অবস্থা যেন আরও খারাপ না হয়। আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকি। যতটা অবাক হওয়া উচিত, ততটা হতে পারি না। কেননা যদিও দেখি তাঁর মুখাবয়ব থেকে নয় কেবল, ভাবভঙ্গিসমেত সবকিছু থেকেই জ্ঞানের সবটুকু আলো নির্বাপিত এবং তাঁর ভাষা আলাদা বটে, কিন্তু বক্তব্য ও সুর পুরোপুরি ভাগ্যবিড়ম্বিত কৃষকের, তবু এটা তো জানি আমি যে এ হতাশাটাই স্বাভাবিক। হতাশা কাউকে কাউকে করে উদাসীন, অধিকাংশকেই করে ভক্তিবাদী। ইনি উদাসীন, সাধারণ কৃষকের তুলনায়। ব্যবধান এটুকুই। ওই যে অত তাঁর শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা, অত অত অর্জন ও সাধনা, কোথায় গেল সেসব, সেখানেই তো রইলেন যেখানে তাঁর পূর্বপুরুষ ছিলেন। কথা হচ্ছিল সন্ধ্যাবেলায়, মনে হলো গভীর রাত। গ্রামাঞ্চলের।

ঐতিহাসিকভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে আমাদের ভাষায়ও কর্ম ও জ্ঞানের তুলনায় ভক্তিরই প্রাবল্য। সাহিত্যে রস থাকে; আদি বীর করুণ অদ্ভুত রৌদ্র ভয়ানক হাস্য বীভৎস শান্তি-এসব রসের কথা অলংকারশাস্ত্রে উল্লেখ আছে। এর মধ্যে আদি রসের ধাক্কাটাই বেশি। সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু ভক্তি? রস হিসেবে ভক্তির উল্লেখ নেই, অথচ বাংলা ভাষার রক্তপ্রবাহে ভক্তিরস মিশে আছে অনিবার্যরূপে। আমরা ভক্তিরসে নানাভাবে আপ্লুত। এ ভাষার লেখকরা কেউ কেউ বিদ্রোহ করেছেন, যেমন মধুসূদন, নজরুল, সুকান্ত ভট্টাচার্য, কিছু লক্ষ্য করবার বিষয় লেখক হিসেবে এঁরা কেউই দীর্ঘ জীবন পাননি। সমাজ ও সংস্কৃতি তাঁদের সহ্য করেনি। অচিরেই স্তব্ধ করে দিয়েছে। স্থায়ী হয়েছে ভক্তি। নায়ক ও অবতার খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে গেছি আমরা। ধর্মবাদী প্রাচীন গ্রিকরা তাঁদের দেবতাদের মানুষ বানিয়েছেন, আমাদের মধ্যে এমনকি যাঁরা ইহজাগতিক তাঁরাও মানুষকে দেবতা বানাতে চেয়েছেন। এখনো চাইছেন। এ দেশে গণতন্ত্রের অনেক শত্রু। একটি শত্রু নেতার মুখাপেক্ষিতা। সারা জীবন যাঁরা সংসদীয় গণতন্ত্রের পক্ষে ছিলেন, ক্ষমতা পাওয়ামাত্র তাঁরাই যে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির ভক্ত হয়ে ওঠেন, কিংবা গণচাপের মুখে যাঁরা রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি পরিত্যাগ করে সংসদীয় পদ্ধতির নামে একনায়কত্বই প্রতিষ্ঠিত রাখেন, তাঁদের কারও পক্ষেই গণতন্ত্রী হওয়া সম্ভব নয়।

উপায়টা তাহলে কী? স্থানীয় অর্থাৎ বিচ্ছিন্নভাবে আলো জ্বালিয়ে কাজ হবে কী? সর্বত্র অন্ধকার, তাই বলে আমি যদি একটি মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখি, তাহলে সেই যে আমার চেষ্টা তার ফল যা-ই হোক, সেটি কি মিথ্যা? অবশ্যই নয়। অবশ্যই সত্য। অবশ্যই মূল্যবান। কিন্তু কতটুকু? সেখানে প্রতিনিয়ত ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে, সেখানে অন্ধকার প্রাঙ্গণে ওই প্রদীপশিখা নিভে যেতে বাধ্য এবং যখন নিভে যায় তখন যিনি চেষ্টা করেছিলেন জ্বালিয়ে রাখবার তিনি ভেঙে পড়েন। একটি এলাকার কথা জানি। একজন দেশপ্রেমিক সেখানে তাঁর যা কিছু শক্তি ছিল সমস্তটা প্রয়োগ করে নিরক্ষরতা দূর করেছিলেন। তিনি সফল মনে করতেন নিজেকে; কিন্তু খুব বড় একটা ধাক্কা খেলেন গত নির্বাচনে দাঁড়িয়ে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন। হেরে গেলেন। এর অল্প দিন পরেই তিনি মারা যান। যাঁরা তাঁকে জানেন তাঁরা জানাচ্ছেন যে তাঁর জানাজায় হাজার হাজার মানুষ এসেছেন তাঁর প্রতি তাদের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করতে, কিন্তু তারা সেই কাজটি করেননি, যেটি করলে তিনি হয়তো দীর্ঘ জীবন লাভ করতেন এবং সংসদে গিয়ে এলাকার জন্য আরও ভালো কিছু নিয়ে আসতে পারতেন। প্রদীপশিখাটি নিভে গেল, একাধিক অর্থে।

শিক্ষা অবশ্যই মূল্যবান। কিন্তু শুধু শিক্ষা দিলেই যে কাজ হবে তা তো নয়। দেখতে হবে কোন শিক্ষা পাচ্ছে লোকে। অক্ষরজ্ঞান খুবই দরকার, কিন্তু অক্ষরজ্ঞান যে অনেক দূর নিয়ে যাবে, তা নয়। শিক্ষাকে আমরা সাধারণত অধিক রূপে মূল্যায়িত করি, দেশটা বিশেষভাবে অশিক্ষায় নিমজ্জিত বলে। এটাও বলা হয় এবং ভালোও লাগে শুনতে যে একজন অশিক্ষিত লোকের তুলনায় একজন শিক্ষিত লোকের পক্ষে দরিদ্র হওয়ার সম্ভাবনা কম। কথাটা কিন্তু ঢালাওভাবে সত্য নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রেই আজকাল দেখা যায় যে অশিক্ষিত লোকটিই কম দরিদ্র। তার কারণ যে অশিক্ষিত তার মোহ নেই, অহমিকা নেই; সে সব রকমের কাজ করতে পারে এবং কোনো কিছুতেই পিছপা হয় না। কথা আছে নানা রকমের। এমনও তো বলা হয় যে শিক্ষিত লোক মানেই ধান্ধাবাজ ও চোর। চোরের চেয়ে ধান্ধাবাজ অবশ্য আরও মারাত্মক। সেটা অন্য কথা। কিন্তু শিক্ষিত মানেই চোর কিংবা ধান্ধাবাজ এই মত একটি অন্যায় সাধারণীকরণ। শিক্ষিত লোক মানেই বাজে লোক নয়, ঠিক যেমন শিক্ষিত লোক মানেই দারিদ্র্য বিমোচনে সমর্থ মানুষটি নয়।

বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহে কাজ হবে কি? না, তাতে ব্যবস্থা বদলাবে না। আর আছে গোঁয়ার্তুমি কিংবা বেয়াদবি। নিছক গোঁয়ার্তুমি অনেক সময় বেয়াদবির মতোই, অফলপ্রসূ। দড়িতে বাঁধা গাভিটি ক্ষেপে গিয়ে দড়ি ছিঁড়তে চাইলে দড়িটি ছিঁড়ে না, বরং গলায় আরও শক্ত হয়ে বসে যায়। কিংবা দৈবাৎ যদি ছিঁড়েও যায়, তাহলে দেখা যায় অচিরেই সে ধরা পড়ছে, আরও কঠিন বন্ধনে। আর ওই লাফঝাঁপ বলে দেয় একটি কথা, প্রাণীটি ভীষণভাবে বন্দি।

মানুষকে সুশিক্ষিত করা চাই; কেবল বুদ্ধিকে নয়, তার হৃদয়কেও। অশিক্ষিত হৃদয় অশিক্ষিত বুদ্ধির চেয়েও ক্ষতিকর। ভক্তি রয়েছে আমাদের হৃদয়ে, রয়েছে আমাদের বুদ্ধিতে। উভয়কেই মুক্ত করা আবশ্যক। বস্তুত ভক্তির বন্ধন ছিন্ন না করলে আমরা জ্ঞানের অনুশীলনকে কার্যকর করতে পারব না, যেমন এখন পারছি না। এখন আমাদের অবিচল আস্থা নব্য-ঈশ্বর পুঁজিবাদে এবং তার তীর্থস্থানসমূহে। এ ভক্তি আগের ভক্তির তুলনায় সর্বগ্রাসী ও স্বাধীনতাবিনাশক, কেননা এ ঈশ্বর আধুনিক উজ্জ্বল এবং কর্মদক্ষ ও কর্মমুখর।

মনে হতে পারে যে ভক্তি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে। না, তা করে না। একত্র করে হয়তো, কিন্তু ঐক্যবদ্ধ করে না। ঐক্যের জন্য জ্ঞান চাই, চাই মুক্তবুদ্ধি এবং শিক্ষিত হৃদয়। যে মুক্তি ও শিক্ষার পথে ভক্তি কখনো দৈত্য, কখনো পাথর।

♦ লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights