কোন পথে অগ্নিগর্ভ ফ্রান্স?
অনলাইন ডেস্ক
জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, মজুরি বৃদ্ধি এবং শিক্ষাখাতে সংস্কারের দাবিতে ফুঁসে উঠেছে ফ্রান্স। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শ্রমজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী এবং আলোচিত ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের কর্মীদের পূর্বনির্ধারিত সাত শতাধিক বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুরো ফ্রান্সে একরকম যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন। সম্ভাব্য সহিংসতা ও গত সপ্তাহের ব্যাপক ভাঙচুরের পুনরাবৃত্তি রোধ করতে ফরাসি কর্তৃপক্ষ দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করেছে। হেলিকপ্টার, সাঁজোয়া যান এবং জলকামান সজ্জিত এই বিশাল বাহিনী রাজধানী প্যারিসসহ বড় বড় শহরগুলোতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে লিঁও ও মার্সেইসহ দশটিরও বেশি বড় শহরের কেন্দ্রস্থলে বিক্ষোভের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন। লিয়ঁ শহরে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে রাস্তায় নেমে আসা বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশকে টিয়ারগ্যাস ব্যবহার করতে দেখা গেছে। বিশেষ করে একটি বিশবিদ্যালয় ভবন ও থানার কাছাকাছি এলাকায় বিক্ষোভকারীরা রাস্তা অবরোধের চেষ্টা করলে নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর অবস্থান নেয়। অন্যদিকে রাজধানী প্যারিসেও বিক্ষোভের নির্ধারিত রুট পরিবর্তন করার চেষ্টা চালায় পুলিশ। তবে আন্দোলনকারীরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে তারা শহরের কেন্দ্রস্থল থেকেই মূল প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করবেন, কোনোভাবেই শহরের উপকণ্ঠে পিছু হটবেন না। এ বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে উভয় পক্ষ।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের এই গণবিক্ষোভ কেবল সাধারণ কোনো প্রতিবাদ নয় বরং এটি বর্তমান ফরাসি সরকারের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা। গত মাসের শেষের দিকে প্যারিসের দক্ষিণ-পূর্বে একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকটের জেরে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা আজ দাবানলের মতো পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের উন্নত পড়াশোনার পরিবেশ ও শিক্ষা সংস্কারের দাবি এবং শ্রমিকদের অধিকতর মজুরি ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের দাবি আজ একাকার হয়ে গেছে। সাধারণ মানুষের এই ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর প্রশাসনের শেষ সময়গুলোতে এক গভীর রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে।
এদিকে পূর্বের বিক্ষোভগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ নিয়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বিগত সপ্তাহের সংঘাত ও সংঘর্ষের সময় পুলিশের মারমুখী পদক্ষেপে বেশ কয়েকজন তরুণ গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে মুলহাউস শহরে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরীর একটি চোখ চিরতরে নষ্ট হয়ে গেছে এবং সেন্ট-এতিয়েন শহরে আরেক ১৭ বছরের কিশোর তার একটি হাত হারিয়েছে। এছাড়া স্কুল ব্লকেড ও রাজপথের মিছিলে পুলিশের টিয়ারগ্যাস, স্টান গ্রেনেড এবং ফোম-রাউন্ড লঞ্চারের ব্যবহারে বহু কিশোর-স্থায়ী শারীরিক আঘাতের শিকার হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো ২০১৮ সালের ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের পর থেকেই এসব মরণাস্ত্র ব্যবহারের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানিয়ে আসছে এবং সাম্প্রতিক ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলো পুলিশি নৃশংসতার বিচার দাবি করেছে।
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট লেখকদের মতে, বর্তমান ফরাসি সরকার বিগত দশকের প্রথাগত কমিউনিটি পুলিশিং বা জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার কৌশল থেকে সরে এসে পুরোদমে বিশেষায়িত দাঙ্গা পুলিশ ও চড়াও হওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে, যা আজ রাজনৈতিক ও সামাজিক উভয় ক্ষেত্রেই তীব্র অনুশোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড ডারমানিন জানিয়েছেন যে গত সপ্তাহের তথাকথিত লুটপাট ও বিশৃঙ্খলার অভিযোগে পুলিশ ইতিমধ্যে প্রায় ২ হাজার ৭০০ জনকে আটক করেছে। এমতাবস্থায় আগামী সোমবারের দিনটিকে অত্যন্ত নির্ণায়ক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
