মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: সৌদির কাছে ৬ প্রশ্ন ঢাকার

অনলাইন ডেস্ক

সৌদি আরবের মক্কায় দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় তাদের অপরাধের বিবরণ, বিচারপ্রক্রিয়া, আইনি সহায়তা এবং মরদেহের অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চেয়েছে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে ১৯ অক্টোবর জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মক্কা শাখায় একটি কূটনৈতিক পত্র পাঠিয়েছে। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষের জবাব এখনো পাওয়া যায়নি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গতকাল শুক্রবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ১৯ অক্টোবর জেদ্দায় সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ফরিদ বিন সাদ আল সেহেরির সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল মো. সাখাওয়াত হোসেন। ওই বৈঠকে তিনি সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো কূটনৈতিক পত্রটি হস্তান্তর করেন।

গত ১৪ অক্টোবর মক্কা অঞ্চলে বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। বিচারকের স্বেচ্ছাধীন শাস্তির আওতায় তাদের এ দণ্ড দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে। তবে ঠিক কী অপরাধে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, কীভাবে তা কার্যকর করা হয়েছে এবং বিচার চলাকালে তাঁরা আইনজীবী পেয়েছিলেন কি না—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মিশনের কাছে নেই।

দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে ছয়টি নির্দিষ্ট বিষয়ে তথ্য চেয়েছে বাংলাদেশ।

সেগুলো হলো- ১. অপরাধের বিবরণ: তারা কী ধরনের অপরাধ করেছিলেন, ঘটনাগুলো কবে ও কোথায় ঘটেছিল এবং তাদের কবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল?

২. আদালতের রায়: দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে দেওয়া রায়ের সত্যায়িত অনুলিপি সরবরাহ করা।

৩. মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি: কীভাবে দণ্ড কার্যকর করা হয়েছে—প্রকাশ্যে তলোয়ার দিয়ে শিরশ্ছেদ, নাকি অন্য কোনো পদ্ধতিতে?

৪. মরদেহের অবস্থান: মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর তাঁদের মরদেহ কোথায় রাখা হয়েছে?

৫. দাফন বা দেশে ফেরত পাঠানো: মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানো হবে, নাকি সৌদি আরবেই দাফন করা হয়েছে?

৬. আইনি প্রতিনিধিত্ব: তদন্ত ও বিচার চলাকালে তাঁদের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছিল কি না এবং তাঁরা নিজেরা আইনি সহায়তা চেয়েছিলেন কি না?

কনস্যুলেটের চিঠিতে এসব প্রশ্নের দ্রুত জবাব দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। ঢাকার সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে বাংলাদেশে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা জেদ্দায় বাংলাদেশ মিশনের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য ছিল না। বিশেষ করে বিচার চলাকালে দুই নাগরিকের আইনি প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

কূটনৈতিক সূত্রের ভাষ্য, সৌদি কর্তৃপক্ষ নিয়মিত বাংলাদেশকে দেশটিতে আটক ও দণ্ডিত বাংলাদেশি নাগরিকদের তালিকা পাঠায়। গত সেপ্টেম্বরের তালিকায় নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সুইটি আক্তারের নাম ছিল। সেখানে একজনের বিরুদ্ধে ‘ব্যভিচার’ এবং অন্যজনের বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি-সংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে তাদের বিরুদ্ধে কী শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা তালিকায় স্পষ্ট ছিল না।

অন্যদিকে, সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বিবৃতিতে মক্কার একটি মসজিদ কমপ্লেক্সে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হয়ে পবিত্রতা লঙ্ঘনের অভিযোগে দণ্ড দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। দুটি সূত্রে অপরাধের যে বিবরণ পাওয়া গেছে, তার মধ্যে সম্পর্ক কী—তা এখনো পরিষ্কার নয়। এ কারণেই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অপরাধের প্রকৃতি, আদালতের রায় এবং দণ্ড কার্যকরের বিস্তারিত জানতে চাওয়া হয়েছে।

১৯ অক্টোবরের বৈঠকে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চান, মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে বাংলাদেশকে আগে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি কেন।

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে আগাম তথ্য জানা থাকলে বাংলাদেশ মিশন দুই নাগরিকের পক্ষে আইনি সহায়তা, আপিলের সুযোগ যাচাই এবং প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারত।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির গত সপ্তাহে ঢাকায় সাংবাদিকদের বলেন, দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে অভিযোগের পর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঘটনায় তারা হতাশ। সৌদি আরব থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিম্ন আদালত ও আপিল আদালতে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর চলতি মাসে দণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।

তবে আদালতের রায়ের অনুলিপি এবং আইনি প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রায় আড়াই হাজার বন্দির একটি তালিকা পাঠিয়েছিল। ওই তালিকায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই বাংলাদেশিসহ মোট ২২ জন বাংলাদেশির দণ্ডিত হওয়ার তথ্য ছিল। তবে তাঁদের সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিবরণ উল্লেখ করা হয়নি।

এ কারণে তালিকায় থাকা ২০ জন বাংলাদেশির বিষয়ে শাস্তির ধরন ও সংশ্লিষ্ট তথ্য জানতে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে পাঠানো কূটনৈতিক পত্রের জবাব এখনো আসেনি। বাংলাদেশ সরকার সৌদি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights