ভালো নেই দলিতরা
নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা
প্রায় ৩০ বছর ধরে বাজারে গলিতে জুতা সেলাইয়ের কাজ করেন চিরতন মুচি। বাপ-ঠাকুররাও একই কাজ করতেন। পেশা বদলের আশায় ছেলেকে পড়াশোনা করিয়েছেন। কিন্তু কলেজজীবন পার করলেও দলিত সম্প্রদায়ের হওয়ায় কোথাও কাজ মেলেনি। একইভাবে ৫৫ বছর ধরে ঋষিপল্লিতে বাঁশ-বেত দিয়ে ঝুড়ি তৈরি করেন বৃদ্ধ বলয় দাস। আক্ষেপ নিয়ে বললেন, ‘আমরা যেন এই জাতে জন্ম নিয়ে বড় পাপ করেছি। কোথাও সম্মান নেই। সরকারি অনুদান, সুযোগ-সুবিধা কিছুই নেই। কেউ ব্যবসা করবে ব্যাংক ঋণ মেলে না। বাজারে দোকানঘর মেলে না। ছোট জাত বলে কেউ কথাই শুনতে চায় না।’
জানা যায়, খুলনা নগরীসহ বিভিন্ন পল্লিতে দলিত সম্প্রদায়ের ১০ হাজারের বেশি মানুষ আছে। শুধু ডুমুরিয়ায় ৩৭টি ঋষিপল্লিতে বাস করেন কয়েক হাজার দলিত মানুষ, যারা সামাজিকভাবে বঞ্চিত প্রাান্তিক জনগোষ্ঠী। এরা বংশপরম্পরায় মুচি, ঋষি, ডোম, মেথর বা হরিজন, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, চামড়ার কাজ ও দিনমজুরির মতো নিম্ন আয়ের পেশার সঙ্গে যুক্ত। ডুমুরিয়া উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মাসুদুর রহমান বলেন, সমাজের কিছু নিয়ম ও প্রথার কারণে এই জনগোষ্ঠী পিছিয়ে পড়েছে। সামাজিক বৈষম্যের কারণে নির্দিষ্ট কিছু পেশার বাইরে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ কম থাকে। সংবিধানে বৈষম্য নিষিদ্ধ থাকলেও তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য সামাজিক মর্যাদায় এখনো নানা বঞ্চনার শিকার হন।
ঋষি সম্প্রদায়ের শিক্ষিত তরুণ সাগর দাস বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষদের পেশা ছোট ছিল। ভালো যোগাযোগ নেই তাই চাকরির ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকতে হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রেও মূল্যায়ন করা হয় না।’ এদিকে দলিত সম্মেলনের অনগ্রসর মানুষের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসূত্র স্থাপনের মাধ্যমে সেবায় প্রবেশাধিকার বৃদ্ধির লক্ষ্যে দলিত সম্মেলন (গণসচেতনতা) বিষয়ক সেমিনার গতকাল ডুমুরিয়া শহীদ জোবায়েদ আলী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়।
এতে ৮০টি কমিউনিটি গ্রুপের ১৮০ জন প্রতিনিধি অংশ নেন। দলিত প্রকল্পের ব্যবস্থাপক সমীর কুমার পান্ডে বলেন, ‘আমরা এই জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩৪ শ মানুষকে নিয়ে কাজ করছি। তাদের অধিকার আদায়ে সচেতন করা, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে।’ উপজেলা যুবউন্নয়ন কর্মকর্তা এস এম কামরুজ্জামান বলেন, এখানে ৩৪টি ট্রেডে দলিত সম্প্রদায়ের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। সম্মিলিতভাবে কাজ করলে অনগ্রসর এই মানুষদের সমাজে মূল ধারায় ফিরিয়ে আনা যাবে।
