এলডিসি উত্তরণের পর দাম বাড়তে পারে নতুন ওষুধের

নিজস্ব প্রতিবেদক

এলডিসি উত্তরণের পর নতুন পেটেন্টের আওতাভুক্ত কিছু ওষুধের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে ক্যানসার, ইনসুলিন ও হরমোন জাতীয় ওষুধের মতো উচ্চপ্রযুক্তির চিকিৎসাপণ্যের ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। তবে বিদ্যমান সব জেনেরিক ওষুধের দাম বেড়ে যাবে, এমন নয়। সম্ভাব্য প্রভাব নির্ভর করবে পেটেন্টের আওতা, সংশ্লিষ্ট ওষুধের উৎপাদনব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব বিধির প্রয়োগের ওপর। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়তে পারে রোগীর চিকিৎসা ব্যয়েও।

বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) এক প্রতিবেদনে ওষুধশিল্পের এ সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা তুলে ধরা হয়েছে। উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, এলডিসি উত্তরণের পর নতুন পেটেন্টের আওতায় আসা ওষুধ উৎপাদনে বিদেশি কোম্পানিগুলো বেশি রয়্যালটি দাবি করতে পারে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ওষুধের দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উপস্থাপনায় এ প্রভাব উত্তরণের তিন থেকে চার বছর পর দৃশ্যমান হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি সম্ভাব্য সময়সীমা, নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়।

সব ওষুধের দাম বাড়বে না : বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের অন্যতম শক্তি জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন। বিএফটিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ওষুধের চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ স্থানীয় শিল্প পূরণ করে। তবে স্থানীয় চাহিদা পূরণের এ সক্ষমতার অর্থ এই নয় যে সব ধরনের ওষুধ উৎপাদনে দেশ সম্পূর্ণ স্বনির্ভর। নতুন পেটেন্টযুক্ত ওষুধ, বিশেষায়িত চিকিৎসাপণ্য ও উচ্চপ্রযুক্তির ওষুধের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি, পেটেন্ট এবং রয়্যালটিসংক্রান্ত বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

জেনেরিক ওষুধ সাধারণত মূল ওষুধের পেটেন্ট সুরক্ষা শেষ হওয়ার পর বা প্রযোজ্য আইনগত সুযোগের আওতায় উৎপাদিত হয়। ফলে নতুন পেটেন্টের সম্ভাব্য প্রভাব সব জেনেরিক ওষুধের ওপর একইভাবে পড়ার কথা নয়। কোন ওষুধের ক্ষেত্রে পেটেন্ট সুরক্ষা প্রযোজ্য, বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট বিধান কীভাবে কার্যকর হবে এবং বিকল্প উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে কি না-তার ওপর সম্ভাব্য মূল্যপ্রভাব নির্ভর করবে।

বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির সভাপতি আবদুল মুকতাদির বলেন, আন্তর্জাতিক মূল পেটেন্টধারী কোম্পানির কাছ থেকে ফর্মুলা ব্যবহারের অনুমতি বা লাইসেন্স নিতে হবে, যার জন্য বড় অঙ্কের রয়্যালটি ফি দিতে হবে। এটি সরাসরি কোম্পানির উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেবে।

বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মোস্তফা আবিদ খান বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর ওষুধের পেটেন্ট আবেদন বাড়তে পারে। এ পরিস্থিতি সামলাতে পেটেন্ট ও মেধাস্বত্ব-সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের জনবল, প্রশিক্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। নতুন ওষুধের পেটেন্ট আবেদন যাচাই, মেধাস্বত্বের অধিকার নিশ্চিত করা এবং জনস্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নীতিমালা প্রয়োগ করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

নতুন পেটেন্টের আওতাভুক্ত কোনো ওষুধের উৎপাদন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব বাজারমূল্যে পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব রোগের চিকিৎসায় বিকল্প ওষুধ সীমিত, সেসব ক্ষেত্রে রোগীর ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা বেশি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তবে ওষুধের দাম কতটা বাড়তে পারে, কোন কোন ওষুধ সরাসরি প্রভাবিত হবে কিংবা কতসংখ্যক রোগী এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে-এ বিষয়ে উপস্থাপনায় নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান দেওয়া হয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, ওষুধশিল্পের সক্ষমতা ধরে রাখতে স্থানীয় কোম্পানিগুলোর গবেষণা ও উন্নয়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, উচ্চপ্রযুক্তির ওষুধ উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক মান পূরণের সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি। একই সঙ্গে পেটেন্টের আওতাভুক্ত ওষুধের বিকল্প, প্রযোজ্য আইনগত সুযোগ এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তিনি আরও বলেন, এলডিসি উত্তরণের প্রভাব তাই শুধু ওষুধের সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় শিল্পের উদ্ভাবনী সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা এবং রোগীদের সাশ্রয়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করার মধ্যেও এর গুরুত্ব রয়েছে। উত্তরণের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া গেলে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলা সহজ হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights