দখল-দূষণে অস্তিত্ব সংকটে কর্ণফুলী
আজহার মাহমুদ
দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত কর্ণফুলী নদী দখল, শিল্পবর্জ্য ও অবৈধ বালু উত্তোলনের চাপে সংকটের মুখে পড়েছে। চট্টগ্রাম নগর এলাকায় নদীর দুই তীরের শিল্পকারখানার বর্জ্য নদীতে মিশে পানি দূষিত করছে।
অন্যদিকে রাঙ্গুনিয়া ও বোয়ালখালী উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ড্রেজার ও ভলগেট দিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর পাড় ভাঙছে। এতে নদীর স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ফসলি জমি ও বসতভিটা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা।
নদী রক্ষায় উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও দখল উচ্ছেদের উদ্যোগ থাকলেও পুনর্দখল ঠেকানো, শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কার্যকর নজরদারির ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে কর্ণফুলীর পরিবেশ, নাব্যতা ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও হুমকির মুখে পড়বে।
উচ্ছেদের পরও পুনর্দখল
চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আলীউর রহমান বলেন, ‘এক দশক আগে কর্ণফুলী রক্ষায় উচ্চ আদালতের রায়ের পর জেলা প্রশাসন ১ হাজার ১৮১ জন অবৈধ দখলদারের তালিকা তৈরি করেছিল। উচ্ছেদ করা হয়েছিল ৩৫০ জন দখলদারকে। কিন্তু বর্তমানে ওই সব স্থানের অনেকগুলো আবার দখল হয়ে গেছে। পাশাপাশি নতুন নতুন স্থানও দখল হয়েছে। ফলে সংকুচিত হচ্ছে নদী। দখলদার উচ্ছেদের পর তা নিয়মিত তদারকি না করলে এসব উচ্ছেদের কোনো অর্থ থাকে না।’
তিনি আরও বলেন, নদীতীরবর্তী অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বর্জ্য পরিশোধনাগার বা ইটিপি নেই। যেসব প্রতিষ্ঠানে ইটিপি রয়েছে, সেগুলোর কিছু নিয়মিত চালু রাখা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে শিল্পবর্জ্য সরাসরি কর্ণফুলীর পানিতে মিশছে। শুধু ইটিপি স্থাপন করলেই হবে না, সেগুলো কার্যকরভাবে চালু আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি ইটিপিতে আধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে সার্বক্ষণিক নজরদারির ব্যবস্থাও নেওয়া প্রয়োজন। আলীউর রহমানের অভিযোগ, রাঙ্গুনিয়া ও বোয়ালখালী এলাকায় নদীর তীরে ব্লক বসানো হলেও অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে কোনো কোনো স্থানে সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
গবেষণায় উঠে এসেছে দূষণের চিত্র
কর্ণফুলী নদীর দূষণ নিয়ে সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। চলতি বছর *সায়েন্সডাইরেক্ট*-এ প্রকাশিত একটি সমন্বিত মূল্যায়ন গবেষণায় শিল্পকারখানার অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ও নগরের পয়োবর্জ্যের কারণে নদীর পানিতে অ্যামোনিয়াম ও ফসফেটের মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণায় এ দূষণের ফলে ইউট্রোফিকেশন বা পানিতে অতিরিক্ত পুষ্টি উপাদান জমার ঝুঁকির বিষয়টিও উঠে এসেছে। এর ফলে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে গিয়ে জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের সমীক্ষায় কর্ণফুলী নদীর পানি ও তলানির পলিতে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক কণার উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়। ওই গবেষণায় ক্রোমিয়াম, সিসা ও ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতুর উপস্থিতির কথাও উল্লেখ করা হয়। এসব দূষণ নদীর মৎস্যসম্পদ ও জলজ জীববৈচিত্র্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। তবে গবেষণাগুলোর নির্দিষ্ট শিরোনাম, নমুনা সংগ্রহের স্থান, পরীক্ষার ফলাফল ও ব্যবহৃত মানদণ্ড যাচাই করে দূষণের মাত্রা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
ইটিপি স্থাপন হলেও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মুক্তাদির হাসান জানান, সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী চট্টগ্রাম নগর এলাকার ৩১৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ইটিপি স্থাপন প্রযোজ্য। এর মধ্যে ২৯২টি প্রতিষ্ঠানে ইটিপি স্থাপন করা হয়েছে এবং সেগুলো সচল বলে দাবি করা হয়েছে। আরও ১৪টি প্রতিষ্ঠানে ইটিপি নির্মাণাধীন। বাকি আটটি প্রতিষ্ঠান ইটিপি স্থাপন করেনি।
তবে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, ইটিপি স্থাপন করা হলেও সব প্রতিষ্ঠানে তা নিয়মিত চালু রাখা হয় না। ফলে শিল্পবর্জ্য পরিশোধন ছাড়াই বিভিন্ন খাল ও জলপথের মাধ্যমে কিংবা সরাসরি কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে পড়ছে। নগরের পয়োবর্জ্য ও প্লাস্টিকসহ অন্যান্য বর্জ্যও নদীর দূষণ বাড়াচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ইটিপি স্থাপনের সংখ্যা এবং বাস্তবে সেগুলো কতক্ষণ চালু থাকে- দুটি বিষয় আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে শিল্পবর্জ্যের পাশাপাশি নগরের পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনাও উন্নত করতে হবে।
বালু উত্তোলনে বাড়ছে ভাঙনের ঝুঁকি
পরিবেশবিদদের মতে, প্রায় ২৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ কর্ণফুলী নদী চট্টগ্রাম বন্দর, আমদানি-রপ্তানি ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ নদীর প্রবাহ ও নাব্যতা ব্যাহত হলে নৌপরিবহন, মৎস্যসম্পদ এবং নদীকেন্দ্রিক জীবিকার ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু দূষণ, দখল ও অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে নদীর পরিবেশ ও তীরবর্তী এলাকার স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়ছে।
কর্ণফুলী রাঙ্গুনিয়া ও বোয়ালখালী উপজেলার বিভিন্ন এলাকা অতিক্রম করে চট্টগ্রাম নগরের পাশ দিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হালদা নদীও কর্ণফুলীতে এসে মিশেছে। নদীটির দুই তীরে রয়েছে অসংখ্য বসতি, কৃষিজমি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বেতাগী, সরফভাটা ও চন্দ্রঘোনা এবং বোয়ালখালী উপজেলার কয়েকটি এলাকায় ভলগেট ও ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব স্থানে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর পাড় ও তলদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বর্ষা ও জোয়ারের সময় ভাঙন তীব্র হয়ে ফসলি জমি ও বসতভিটা বিলীন হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মুহিবুল্লাহ মারুফী বলেন, ‘গত দুই বছর ধরে সরফভাটা গোডাউন ব্রিজ থেকে জুরুর মুখ এলাকা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে বালু উত্তোলনের কারণে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। যেসব স্থানে ব্লক আছে, সেগুলোও ধসে পড়ছে। যেখানে ব্লক নেই, সেখানে পাড় ভেঙে কৃষিজমি ও বসতবাড়ি বিলীন হচ্ছে। পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে নদীর গতিপথ। একাধিকবার স্থানীয়রা মানববন্ধন করে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। বালু তোলার প্রতিবাদ করায় বালুদস্যুরা স্থানীয়দের ওপর হামলাও করেছে।’
তবে বালু উত্তোলনের কারণে ভাঙনের মাত্রা কতটা বেড়েছে, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট এলাকার নদীর গতিপথ, তলদেশের গভীরতা ও ভাঙনের তথ্য নিয়ে কারিগরি সমীক্ষা প্রয়োজন।
সমন্বিত পদক্ষেপের তাগিদ
নদী গবেষক অধ্যাপক ইদ্রিস আলী বলেন, ‘উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও মাস্টারপ্ল্যান থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও বন্দর কর্তৃপক্ষের সমন্বিত কঠোর পদক্ষেপের অভাবে কর্ণফুলী নদী বিলীন হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে অচিরেই এ নদী সংকুচিত হয়ে অর্থনীতির লাইফলাইন অচল হয়ে যেতে পারে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিবেশ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠানে ইটিপি আছে, সেগুলো নিয়মিত তদারকি করা হয়। ইটিপি চালু না রাখায় বিভিন্ন সময়ে জরিমানাও করা হয়েছে। জনবলসংকট ও অন্যান্য কার্যক্রমের ব্যস্ততার কারণে মাঝেমধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান ইটিপি বন্ধ রাখে। তবে খবর পেলেই সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বালু উত্তোলন ও ভাঙন রোধের বিষয়গুলো স্থানীয় প্রশাসনের তদারকি করা উচিত।’
কর্ণফুলী রক্ষায় নদীর অবৈধ দখল উচ্ছেদের পাশাপাশি পুনর্দখল বন্ধ, শিল্পকারখানার ইটিপি নিয়মিত চালু রাখা, বর্জ্য পরিশোধন নিশ্চিত করা এবং অবৈধ বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ জরুরি। একই সঙ্গে ভাঙনপ্রবণ এলাকায় বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার ভিত্তিতে সুরক্ষাব্যবস্থা নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত ও ধারাবাহিক নজরদারি নিশ্চিত করা না গেলে নদীর পরিবেশ ও নাব্যতা রক্ষার উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না।
