বিমানের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাপান সফর শেষে ঢাকায় ফেরার পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ভিভিআইপি ফ্লাইটের উড়োজাহাজে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছিল। গতকাল জাপানের নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উড্ডয়নের প্রস্তুতির সময় ত্রুটি ধরা পড়লে ফ্লাইটটির যাত্রা বিলম্বিত হয়। উড়োজাহাজটির স্পয়লারে ত্রুটি ধরা পড়লে পাইলট উড্ডয়ন স্থগিত করেন। পরে সেটিকে পার্কিং এলাকায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়। বিমানটির ফ্লাইট নম্বর বিজি-৩৭৭। স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ১৮ মিনিটে ফ্লাইটটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করার কথা ছিল। তবে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে যাত্রা করতে চার ঘণ্টার বেশি বিলম্ব হয়।

জানা গেছে, উড্ডয়নের প্রস্তুতি শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যে পাইলট যাত্রীদের যান্ত্রিক সমস্যার কথা জানান। পরে উড়োজাহাজটিকে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীদের বিমান থেকে নামিয়ে বিমানবন্দরের লাউঞ্জে নেওয়া হয়।

ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পরপরই উড়োজাহাজটির কারিগরি পরীক্ষা ও মেরামতের কাজ শুরু করেন প্রকৌশলীরা। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল শাখার তথ্যানুযায়ী, ইঞ্জিনিয়ার সাদেকুল ইসলাম ভূঁইয়া ও মান্নানের নেতৃত্বে একটি কারিগরি দল ত্রুটি সারানোর কাজ করে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শাহনূর আহমেদ ত্রুটির বিষয়টি স্বীকার করে জানান, প্রকৌশলীরা সমস্যা সমাধানে কাজ করছেন। প্রাথমিকভাবে ত্রুটি মেরামতে দুই থেকে তিন ঘণ্টা লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা ধারণা দিয়েছিলেন। তবে মেরামত ও প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা শেষ করতে আরও সময় লাগে।

এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভিভিআইপি ফ্লাইটে দ্বিতীয়বারের মতো ত্রুটি ধরা পড়ল। এর আগে গত বছর ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানকে বহন করা ভিভিআইপি ফ্লাইটে ত্রুটি ধরা পড়ে। এবার প্রধানমন্ত্রীর ফিরতি ফ্লাইটে স্পয়লারের ত্রুটির ঘটনা এমন সময়ে ঘটল, যখন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে নানা অসংগতির তথ্য তুলে ধরা হয়। ওই মূল্যায়নটি তৈরি করা হয়েছিল ২০২৫ সালের অক্টোবরে। বোয়িংয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, যন্ত্রাংশের অভাব, দক্ষ কর্মীর সংকট ও ঘন ঘন কারিগরি ত্রুটিতে উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। বিশ্বজুড়ে বোয়িংয়ের অন্য যেকোনো বহরের চেয়ে বিমানের উড়োজাহাজে কারিগরি ত্রুটি বেশি। আর তা মেরামতেও সময় লাগছে স্বাভাবিকের চেয়ে তিন গুণ। দীর্ঘদিন যন্ত্রাংশ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব থাকায় অনেক ক্ষেত্রে ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রাংশ নিয়েই উড়োজাহাজ চালাতে হচ্ছে। এ ছাড়া পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না থাকা কর্মীরাও নানা সমস্যার কারণ হয়ে উঠছেন। বোয়িংয়ের ‘বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ৭৭৭/৭৮৭ অনসাইট এনহ্যান্সড সাপোর্ট ক্লোজআউট রিপোর্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বিমানের ৭৭৭ ও ৭৮৭ উড়োজাহাজের সঙ্গে বিশ্বজুড়ে বোয়িংয়ের একই মডেলের উড়োজাহাজের কারিগরি সমস্যার তুলনা করা হয়েছে। বিমানের আমন্ত্রণে বোয়িংয়ের একটি রক্ষণাবেক্ষণ দল গত বছর কয়েক মাস সংস্থাটির সঙ্গে কাজ করে। এ কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এ তথ্য জানিয়েছে। বোয়িংয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারিগরি ত্রুটির কারণে অনেক ফ্লাইট বিলম্বিত হচ্ছে। এ ছাড়া উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় তিন গুণ পর্যন্ত বেশি সময় লাগছে। অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক উইং কমান্ডার এ টি এম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বিমানের উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন অনেক পুরোনো। তবে ভিভিআইপি ফ্লাইট কোনো সাধারণ ফ্লাইট নয়। এটি মাথায় রেখেই ফ্লাইটটি প্রস্তুত রাখা উচিত।’ তিনি বলেন, ‘এটি ইচ্ছাকৃত নাকি অনিচ্ছাকৃত এ বিষয়টিও তদন্ত করে দেখতে হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights