ইউআইটিএস’র সমাবর্তনে হ-য-ব-র-ল
নিজস্ব প্রতিবেদক
দীর্ঘ ৮ বছর প্রতীক্ষার পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ইউনিভার্সিট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সাইন্সেস (ইউআইটিএস)-এর চতুর্থ সমাবর্তন। তবে বহুল কাঙ্ক্ষিত এই আয়োজনকে ঘিরে উচ্ছ্বাসের বদলে বিশ্ববিদ্যালয়টির গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে বইছে তীব্র ক্ষোভ ও চরম হতাশা। সমাবর্তনে থাকছেন না রাষ্ট্রপতি। সমাবর্তন বক্তা হিসেবেও আসছেন না বাইরের কোনো স্বনামধন্য অতিথি। এছাড়া গোল্ড মেডেল প্রদানে স্বজনপ্রীতি ও অনুষ্ঠানে বড় অংকের রেজিস্ট্রেশন ফি নিয়ে নিম্নমানের উপহারসামগ্রী দেওয়ার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা নয়-ছয়য়ের অভিযোগও করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরা। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন গ্রুপে বইছে সমালোচনার ঝড়।
সমাবর্তনের আমন্ত্রণপত্রের তথ্যানুযায়ী, আগামী ৩১ অক্টোবর শনিবার ঢাকার পূর্বাচলে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে ইউআইটিএস’র চতুর্থ সমাবর্তন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আবু হাসান ভূঁইয়া। সমাবর্তন বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখবেন বিশ্ববিদ্যালটির ট্রাস্টি বোর্ড ও পিএইচপি গ্রুপের চেয়ারম্যান সুফি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ— ২০০৯ সালে প্রথম সমাবর্তনে সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য জিল্লুর রহমান। সমাবর্তন বক্তা ছিলেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. এ পি জে আবদুল কালাম। ২০১৪ সালে দ্বিতীয় সমাবর্তনে সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। সমাবর্তন বক্তা ছিলেন মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদ। ২০১৮ সালে তৃতীয় সমাবর্তনেও রাষ্ট্রপতি সভাপতিত্ব করেন। সমাবর্তন বক্তা ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও কম্পিউটার বিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ। আট বছর পর চতুর্থ সমাবর্তন হতে যাচ্ছে, যেখানে রাষ্ট্রপতি থাকছেন না। সমাবর্তন বক্তা হিসেবেও বাইরের কেউ থাকছেন না। আর এই তথ্যটিও সমাবর্তনের রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হবার আগে কাউকে জানানো হয়নি। আগে জানলে অনেকেই এতো টাকা খরচ করে রেজিস্ট্রেশন করতো না। উল্টো শিক্ষার্থীদের সমাবর্তনে আগ্রহী করতে অনেক দিন আগে ওয়েবসাইটে প্রতারণামূলক ৩৭০০+ শিক্ষার্থী রেজিস্ট্রেশন করেছে বলে তথ্য প্রকাশ করা হয়। পরবর্তীতে জানা গেছে মোট ১৬০০ জনের মতো রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করেছে।
গতকাল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়টির বেশ কয়েকজন সাবেক শিক্ষার্থী সমাবর্তন নিয়ে অভিযোগ জানাতে বাংলাদেশ প্রতিদিন অফিসে আসেন। সঙ্গে নিয়ে আসেন সমাবর্তন উপলক্ষে দেওয়া উপহার। তাতে দেখা যায়, সমাবর্তনের জন্য দেওয়া গাউনের সেলাই অনেক স্থান থেকে খুলে গেছে। খুলে গেছে পানির ফ্লাক্সের তলা।
সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের ৩১তম ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী মনজুর শামীম বলেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮ বছরের জমে থাকা গ্র্যাজুয়েটদের সমাবর্তনে মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে অতিথি হিসেবে না পেয়ে আমরা হতাশ। নামকাওয়াস্তে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত স্যুভেনির ও উপহার সামগ্রী অত্যন্ত নিম্নমানের এবং তাও বিভিন্ন স্পন্সরের থেকে আনা বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অথচ, এই অনুষ্ঠানের জন্য প্রতি বেসিক গ্র্যাজুয়েটের কাছ থেকে ৭,০০০ টাকা এবং অতিথি প্রতি ১,৫০০ টাকা হারে নিয়েছে। দেওয়া হয়েছে গাউন, দুইটা কলম, একটা ফ্লাক্স ও ফুলদানি। উপহারের গায়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম ও লোগো রয়েছে। টি-শার্টের মাপ নিয়েও তা দেওয়া হয়নি।
গোল্ড মেডেল দেওয়া নিয়ে স্বজনপ্রীতির অভিযোগও করেছেন শিক্ষার্থীরা। তারা বলেন, সিজিপিএ ৪ এর মধ্যে ৪ পেয়েও অনেকের নাম গোল্ড মেডেলিস্টের তালিকায় নেই। সমাবর্তনের বিভিন্ন বিষয় জানতে ও করণীয় নির্ধারণে গত সেপ্টেম্বরে উপাচার্য বরাবর সাবেক শিক্ষার্থীরা লিখিত প্রস্তাবনা দিলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাতে কর্ণপাত করেনি। সমাবর্তনের অনুষ্ঠান সূচি ও অতিথি তালিকা মাত্র দুই দিন আগে প্রকাশ করা হয়। সমাবর্তনের অনলাইন পোর্টালের কারিগরি দুর্বলতায় গ্র্যাজুয়েট এবং তাদের পরিবারের এনআইডি নম্বর, ব্যক্তিগত সার্টিফিকেট, মোবাইল নম্বরসহ অত্যন্ত স্পর্শকাতর ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ্যে চলে আসার ঘটনাও ঘটে। এসব অব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলতে গেলে সমাবর্তন আয়োজনের দায়িত্বে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হন। এ নিয়ে সম্প্রতি একটি ঘটনার ভিডিও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন গ্রুপে ছড়িয়ে পড়লে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ভিডিওতে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে কাউকে বলতে শোনা যায়- ‘তোগো জন্য সমাবর্তন অ্যারেঞ্জ করতেছি, করলে কর না করলে যা!’
নামকাওয়াস্তে সমাবর্তন আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করছে বলে ধারণা বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের। নানা খাতে খরচ বৃদ্ধির অভিযোগ করে বিশ্ববিদ্যালয়টির আয়-ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তারা। তারা ইউজিসি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে ইউআইটিএস’র সমাবর্তন ফান্ডের অডিট, সমাবর্তনের গোল্ড মেডেলের বিতর্কিত তালিকা পুনর্মূল্যায়ন এবং অনলাইনে তথ্য ফাঁসের বিষয় তদন্তের দাবি জানান। এছাড়া অনেক কোর্স কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে বন্ধ রাখা হয়েছে বলে জানান শিক্ষার্থীরা।
এদিকে, ইউআইটিএস’র সমাবর্তন নিয়ে ‘প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট অ্যালায়েন্টস অব বাংলাদেশ’ নামের ফেসবুক পেজেও চলছে সমালোচনা। সেখানে পেজ অ্যাডমিন থেকে দেওয়া একটি পোস্টের নিচে বিশ্ববিদ্যালয়টির শত শত সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী মন্তব্য করেছেন।
মোফাজ্জল হোসেন নামের এক শিক্ষার্থী লিখেছেন, ‘কনভোকেশনের জন্য রেজিস্ট্রেশন করে টাকা জমা দিয়েছি। দীর্ঘ ৮ বছর পর আয়োজিত এই সমাবর্তন আমাদের জীবনের একটি স্মরণীয় ও আবেগঘন মুহূর্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অতিরিক্ত ফি, অব্যবস্থাপনা এবং উপহারসামগ্রীর মান নিয়ে এমন অভিযোগ সত্যিই হতাশাজনক। আমরা টাকার বিনিময়ে শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং আমাদের শিক্ষাজীবনের একটি বিশেষ দিনকে সুন্দরভাবে স্মরণীয় করে রাখতে চেয়েছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ, শিক্ষার্থীদের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ করুন এবং সমস্যাগুলোর যথাযথ সমাধান করুন। শিক্ষার্থীদের বিশ্বাস ও আবেগের মূল্যায়ন করা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।’
