আদালতে নারীবান্ধব পরিবেশ এখনো নিশ্চিত হয়নি

মডেলিং ও অভিনয়ের পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবেও নিজের দৃঢ় অবস্থান তৈরি করেছেন জান্নাতুল ফেরদৌস পিয়া। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নারী আইনজীবীদের পেশাগত চ্যালেঞ্জ, আদালতের কর্মপরিবেশ, মক্কেলদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিচার বিভাগে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আরাফাত মুন্না

প্রশ্ন : বাংলাদেশের আদালতগুলো নারী আইনজীবীদের জন্য কতটা নারীবান্ধব?

পিয়া : আগের তুলনায় পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে। তবে এখনো পুরোপুরি নারীবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয়নি। বিশেষ করে জেলা আদালতগুলোতে নারী আইনজীবীদের জন্য পর্যাপ্ত পরিষ্কার ওয়াশরুম, মানসম্মত কমনরুম কিংবা ডে-কেয়ার সুবিধার অভাব রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টে কিছু সুবিধা থাকলেও সব আদালতে সমান সুযোগ নেই। আদালতের অবকাঠামো উন্নয়নের সময় নারী আইনজীবীদের বাস্তব চাহিদাগুলোকে আরও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। শুধু ভবন নির্মাণ নয়, নারীদের স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করার পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে।

প্রশ্ন : মক্কেলদের মধ্যে নারী আইনজীবীদের যোগ্যতা নিয়ে এখনো কি নেতিবাচক ধারণা রয়েছে?

পিয়া : হ্যাঁ, কিছু ক্ষেত্রে এখনো রয়েছে। অনেক মক্কেল মনে করেন, পুরুষ আইনজীবীরা হয়তো বেশি অভিজ্ঞ কিংবা জটিল মামলা ভালোভাবে পরিচালনা করতে পারবেন। বিশেষ করে ফৌজদারি বা বড় অঙ্কের আর্থিক মামলায় এমন মানসিকতা দেখা যায়। তবে একজন মক্কেল যখন আইনজীবীর প্রস্তুতি, কাজ ও আইনি যুক্তি উপস্থাপনের দক্ষতা দেখেন, তখন সেই ধারণা অনেকটাই বদলে যায়। বাস্তবতা হলো, নারীদের অনেক সময় নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণে তুলনামূলক বেশি পরিশ্রম করতে হয়। তবে আমি এটিকে নিজের কাজের প্রতি আরও মনোযোগী হওয়ার প্রেরণা হিসেবে দেখি।

প্রশ্ন : সিনিয়র আইনজীবী ও পুরুষ সহকর্মীদের কাছ থেকে কেমন সহযোগিতা পান?

পিয়া : ব্যক্তিগতভাবে অনেক সিনিয়র আইনজীবীর কাছ থেকে আন্তরিক সহযোগিতা পেয়েছি। যাঁরা প্রকৃত অর্থে পেশাদার, তাঁরা নারী-পুরুষের পার্থক্য না করে দক্ষতা ও যোগ্যতাকে গুরুত্ব দেন। তবে সবার অভিজ্ঞতা এক রকম নয়। কখনো কখনো একজন নারী আইনজীবীকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে কিছুটা সময় লাগে। আবার অনেক পুরুষ সহকর্মী অত্যন্ত সহযোগিতাপূর্ণ।

প্রশ্ন : দেওয়ানি বা করপোরেট মামলার তুলনায় ফৌজদারি মামলায় নারী আইনজীবীদের অংশগ্রহণ কম কেন?

পিয়া : ফৌজদারি মামলা পরিচালনায় নারীদের দক্ষতার কোনো ঘাটতি আছে বলে আমি মনে করি না। মূল সমস্যা দক্ষতার নয়, কাজের পরিবেশ ও সুযোগের। ফৌজদারি মামলা পরিচালনায় অনেক সময় থানায়, কারাগারে কিংবা আসামির সঙ্গে দেখা করতে যেতে হয়। দীর্ঘ সময় আদালতে থাকতে হয়। কখনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার বাইরেও কাজ করতে হয়। আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় এসব পরিস্থিতি সামলানো একজন নারীর জন্য কিছুটা কঠিন হতে পারে। আবার পেশাজীবনের শুরু থেকেই অনেক নারী আইনজীবীকে পারিবারিক বা দেওয়ানি মামলার দিকে বেশি উৎসাহিত করা হয়। ফলে ফৌজদারি মামলায় অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগও কমে যায়।

প্রশ্ন : নারী আইনজীবীর সংখ্যা বাড়লেও উচ্চ আদালতে নারী বিচারকদের প্রতিনিধিত্ব কম। এর কারণ কী?

পিয়া : আমার মনে হয়, মূল সমস্যা যোগ্য নারীর অভাব নয়; বরং যোগ্য নারীদের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছানোর সুযোগ ও প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা। একজন নারী আইনজীবীকে পেশাগত জীবন গড়ার পাশাপাশি অনেক সময় সংসার, সন্তান ও পরিবারের দায়িত্বও সামলাতে হয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে একই গতিতে পেশায় এগিয়ে যাওয়া সবার জন্য সহজ হয় না। উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও সততার পাশাপাশি নারীদের প্রতিনিধিত্বের বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়া উচিত। ২০২৬ সালের অক্টোবরের প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের হাই কোর্ট বিভাগে ৯৯ জন বিচারপতির মধ্যে নারী মাত্র ১০ জন। আর আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির মধ্যে নারী একজন। এ পরিসংখ্যানই বলে দেয়, বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো কতটা জরুরি।

প্রশ্ন : বার কাউন্সিল ও আইনজীবী সমিতির নেতৃত্বে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে কী করা প্রয়োজন?

পিয়া : প্রথমত, নারীদের নেতৃত্বে আসার বাস্তব সুযোগ তৈরি করতে হবে। শুধু নির্বাচনে নারী প্রার্থী রাখলেই হবে না, তাঁদের নীতিনির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায়ও নিয়ে আসতে হবে। বার কাউন্সিলসহ বিভিন্ন আইনজীবী সমিতিতে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

প্রয়োজনে নির্দিষ্টসংখ্যক নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি তরুণ নারী আইনজীবীদের নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ, সিনিয়রদের মেন্টরশিপ এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণে উৎসাহ দেওয়া জরুরি। আমরা শুধু আইন পেশায় নারীর সংখ্যা বাড়াতে চাই না, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গাগুলোতেও তাঁদের দেখতে চাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights