দীপের তথ্যে মিলছে না অনেক প্রশ্নের উত্তর

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির (২৮) মৃত্যুর ঘটনা এখনো রহস্যের বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগে তাঁর সঙ্গে থাকা আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে জিজ্ঞাসাবাদেও সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাচ্ছেন না তদন্তসংশ্লিষ্টরা। উল্টো দীপের দেওয়া ভিন্ন ভিন্ন তথ্যে ধোঁয়াশায় পড়ছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনাস্থল টঙ্গীর হোন্ডা রোড ও মাজার বস্তি পরিদর্শন করেও তদন্তে কোনো কূলকিনারা পাচ্ছেন না। কারণ দীপ একবার বলেছেন, রাত ১২টার দিকে হাউস বিল্ডিং এলাকা থেকে তাহসিফের সঙ্গে আলাদা হয়ে যান। পরে আবার বলেছেন, টঙ্গী মাজার বস্তি এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন। এরপর বলেছেন, একদল লোকের ধাওয়া খেয়ে নদে ঝাঁপ দেন তাহসিফ। দীপের এসব বয়ান বাস্তবতার সঙ্গে মিলছে না। মিলছে না আরও অনেক প্রশ্নের উত্তর। কেননা পুলিশ বা একদল লোকের ধাওয়া খেয়ে তাহসিফ যদি নদে ঝাঁপ দিয়ে থাকেন, তাহলে সাঁতার জানার পরেও কেন তিনি তীরে উঠে এলেন না? দীপ কেন তাঁকে ফেলে বাসায় চলে এলেন এবং পিবিআই হেফাজতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত নদে ঝাঁপ দেওয়ার তথ্য জানালেন না? এত রাতে তাঁরা কেন মাদকের হটস্পট হিসেবে খ্যাত টঙ্গীর মাজার বস্তিতে গিয়েছিলেন? মোটরসাইকেল উদ্ধার হলেও সেটি তাহসিফ নিজেই সেখানে নিয়েছেন কি না এ প্রশ্ন তদন্তসংশ্লিষ্টদের। যদিও তদন্তকারীরা বলছেন, দীপের সর্বশেষ বক্তব্যের ভিত্তিতেই ঘটনাস্থলে গিয়ে তাহসিফের মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে। দীপের দেওয়া অন্য সব তথ্য এবং প্রযুক্তির সহায়তায় এ ঘটনার রহস্য উন্মোচন হবে। তবে গতকাল এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত দীপকে গ্রেপ্তার করার মতো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানা গেছে। এদিকে গতকাল তাহসিফ সাউরির বাবা এ কে এম এনায়েতুল করিম বলেছেন, তাহসিফ সাউরি সাঁতার জানতেন। শুধু তা-ই নয়, পাইলট হিসেবে প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে সাঁতারের ওপর বড় ধরনের কোর্সও করেছিলেন তিনি। আছে সেই কোর্সের সনদও। এতে দীপের দেওয়া নদে ঝাঁপের তথ্য মানতে নারাজ তিনি। উল্টো এনায়েতুল করিম দাবি করেছেন, কেন লোকজন তাহসিফকে ধাওয়া দিতে যাবে? এগুলো বাজে কথা, প্রশ্নই আসে না। ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহের চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। পিবিআই সূত্র বলছে, তাহসিফ ও দীপ মঙ্গলবার রাতে ঘটনাস্থলে অবস্থানের সময় পুলিশের একটি দল তাঁদের ধাওয়া দিলে দীপ তুরাগ তীরে স্থাপিত বিআইডব্লিউটিএর ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের পেছনে গিয়ে লুকান। আর তাহসিফ নদে ঝাঁপ দেন। এরপর সুযোগ বুঝে দীপ সেখান থেকে চলে আসেন। রাত আড়াইটার দিকে নিজের বাড়িতে ফেরেন দীপ। গভীর রাতে দুজন কেন সেখানে অবস্থান করছিলেন, জানতে চাইলে পিবিআইয়ের ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা বিষয়টি জেনেছি, এটা একটু সেনসিটিভ। আরেকটু ক্রসচেক করে বলা যাবে। আর পুলিশের কোন টিম তাঁদের ধাওয়া দিয়েছিল, কেন ধাওয়া দিয়েছিল-আমরা সেগুলো খতিয়ে দেখছি।’ এর আগে সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি থেকে তাহসিফের ব্যবহৃত নম্বর প্লেটবিহীন সুজুকি জিক্সার এসএফ মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করে পিবিআই। যেখানে মোটরসাইকেলটি রাখা ছিল, তার খুব কাছেই তুরাগ নদ। পিবিআই সদর দপ্তরের পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ জানান, নদ থেকে আনুমানিক ৫০ গজ দূরে মাজার বস্তি এলাকায় একটি মোটরসাইকেল পাওয়া গেছে। মোটরসাইকেলটি তাহসিফের কি না, তা যাচাইবাছাই চলছে। অবশ্য পিবিআইপ্রধান মোস্তফা কামাল বলেন, ‘আমরা তাহসিফের মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করেছি।’ এদিকে দীপ পিবিআইকে প্রথমে জানান, দুজন উত্তরা থেকে মোটরসাইকেলে মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন। একপর্যায়ে তাঁদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। তাহসিফকে খুঁজে না পেয়ে দীপ প্রায় এক ঘণ্টা খোঁজাখুঁজি করে মোটরসাইকেল নিয়ে বাসায় ফিরে যান। রাত দেড়টা থেকে দুইটার মধ্যে তিনি বাসায় পৌঁছান। পরে আবার জানান, ঘটনার সময় তাঁরা ঘটনাস্থলে (মাজার বস্তি) কথা বলছিলেন। এ সময় কিছু লোক ধাওয়া করে। তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন। আর তিনি সেখান থেকে পালিয়ে আসেন। সবশেষ বলেছেন, পুলিশের মতো দুজন ছিল। দীপ কেন একেক সময় একেক রকম কথা বলেছেন-এমন প্রশ্নের জবাবে পিবিআইয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘তাহসিফ ও দীপ একসঙ্গে এখানে আসার পর তাহসিফকে ফেলে কেন দীপ একা চলে গেলেন, সেই তথ্যটিতে আমাদের কাছে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। আমরা তদন্ত করছি। তদন্ত শেষে বিষয়টি জানা যাবে।’ এ বিষয়ে পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, ‘আমরা দীপকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। তাঁর দেওয়া বিভিন্ন তথ্য যাচাইবাছাই করেছি। আমরা আসলে প্রকৃত সত্য জানতে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি। তাঁরা ওইখানে কেন গিয়েছিল, তাঁকে কেউ হত্যা করেছে নাকি দুর্ঘটনা, নাকি আত্মহত্যা-এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা খুঁজছি। এখন পর্যন্ত যেসব উত্তর পাওয়া গেছে, সেগুলো যাচাই করা প্রয়োজন। আপাতত আমরা তদন্ত করছি। রহস্য উদ্ঘাটন হলে পরে জানানো হবে।’

মামলার বিষয়ে নৌপুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘তাহসিফের পরিবার মামলা না করলে পুলিশ নিজেই বাদী হয়ে মামলা করবে।’ উল্লেখ্য, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় ‘দীপ আসছে, ওর সঙ্গে কথা বলে আসি’ মাকে এ কথা বলে বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন তাহসিফ সাউরি। এরপর আর বাসায় ফেরেননি জুলাই গণ অভুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণকারী হিসেবে আলোচনায় থাকা বিমানবাহিনীর সাবেক এই ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট। পরদিন তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয় তাঁর লাশ। এরপর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলের মর্গে লাশ নিতে এসে তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিম বলেন, তাঁর ছেলে আত্মহত্যা করার মতো মানুষ না। তাহসিফকে হত্যার পর লাশ নদে ফেলা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights