রপ্তানি ও আয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন, তবু সংকট
নিজস্ব প্রতিবেদক, যশোর
যশোর বিসিক শিল্পনগরীতে রয়েছে ১২০টি শিল্প ইউনিট, উৎপাদন হচ্ছে ৩২৮ কোটি টাকার পণ্য, যার মধ্যে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে ১১৬ কোটি টাকার পণ্য। বর্তমানে কোনো শিল্প ইউনিটই খালি পড়ে নেই। এ অবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পাশাপাশি সরকারও পাচ্ছে বড় অঙ্কের রাজস্ব। অথচ ৫০ একর জায়গার ওপর গড়ে ওঠা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ শিল্পনগরী ভুগছে নানা সমস্যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শিল্পনগরীর অভ্যন্তরীণ রাস্তাগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী, ড্রেনেজ ব্যবস্থা প্রায় অচল, বর্ষায় পানি জমে যায়। সড়কে বাতি নেই। রাতের পালায় কাজ করা নারী-পুরুষ শ্রমিকরা থাকেন নিরাপত্তাহীনতায়। চুরি-ছিনতাইও নিয়মিত ঘটনা। এমন পরিস্থিতিতে ছয় দশকের পুরোনো অবকাঠামো দিয়ে শিল্প ইউনিটগুলোকে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছে বিসিক। সূত্রে তথ্যানুযায়ী, যশোর শহরের পাশেই ঝুমঝুমপুরে ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এ শিল্পনগরী। শুরুতে ২৫টি শিল্প ইউনিট নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে ইউনিটের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২০-এ। বিসিক কর্তৃপক্ষ জানায়, গত অর্থবছরে এসব ইউনিটে ৩২৮ কোটি টাকার পণ্য উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে ১১৬ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এ শিল্পনগরীতে কর্মরত আছেন ২ হাজার ৭৭৫ জনেরও বেশি শ্রমিক। স্থানীয়দের অভিযোগ, এখানে শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটলেও বাড়েনি প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধা। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, নিয়মিত সার্ভিস চার্জ দিয়েও তারা কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছেন না। অভিযোগ অনুযায়ী, শিল্পনগরীতে তিন কিলোমিটার পাকা রাস্তা ও ছয় কিলোমিটার ড্রেন রয়েছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সেগুলো এখন কার্যত অচল। ১২০টি শিল্প ইউনিটের বিপরীতে পানির জন্য এখনো নির্ভর করতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠাকালীন ৬০-এর দশকের পুরোনো পাম্পের ওপর। নেই পুলিশ ক্যাম্প ও সড়কবাতি। এসব সমস্যায় উৎপাদন কার্যক্রমের পাশাপাশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগে থাকতে হয় উদ্যোক্তাদের। যশোর বিসিকে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের স্পেয়ার পার্টস তৈরি করছে মদিনা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ। তাদের পণ্য যাচ্ছে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায়। মদিনা মেটালের জেনারেল ম্যানেজার মো. সাব্বির হোসেন বলেন, যশোর বিসিকের রাস্তাঘাট ও ড্রেনেজের সমস্যা দীর্ঘদিনের। বহিরাগতদের অবাধ যাতায়াতের কারণে নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। রাতে নারী শ্রমিকদের বাড়ি ফেরার সময় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয়। চুরি-ছিনতাইও নিয়মিত ঘটছে। এসব সমস্যার পাশাপাশি বর্জ্য পানি পরিশোধনাগার (ইটিপি) নিয়েও অভিযোগ করেন তিনি। বলেন, কোটি কোটি টাকা খরচ করে ইন্ডাস্ট্রি করেন উদ্যোক্তারা। এখন সবাইকে আলাদা আলাদাভাবে ইটিপি করতে হলে উদ্যোক্তাদের ওপর চাপ তৈরি হয়। প্রতিটি কারখানায় আলাদা বর্জ্য পানি পরিশোধন ব্যবস্থা স্থাপনের পরিবর্তে বিসিক এলাকায় একটি কেন্দ্রীয় বর্জ্য পানি পরিশোধনাগার (সেন্ট্রাল ইটিপি) করা হলে উদ্যোক্তারা উপকৃত হবেন বলে মনে করেন তিনি। যশোর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাধারণ সম্পাদক ও রেসকো বিস্কুট অ্যান্ড ব্রেড ফ্যাক্টরির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীরুল ইসলাম সোহান বলেন, রাস্তাঘাট ও ড্রেনেজের অবস্থা খুবই খারাপ। নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা সমস্যা রয়েছে। এখানে গ্যাস সরবরাহের ব্যবস্থাও নেই। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর মতো সুযোগ-সুবিধা বিসিকেও দেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।
যশোর চেম্বারের সভাপতি মিজানুর রহমান খান বলেন, যশোর বিসিকে কোনো ইউনিট খালি নেই। নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য উদ্যোক্তারা আবেদন করেও প্লট পাচ্ছেন না। অথচ দ্বিতীয় বিসিক স্থাপনের উদ্যোগ দীর্ঘদিন ধরে ‘প্রক্রিয়াধীন’ই থেকে যাচ্ছে। এটা দ্রুত বাস্তবায়ন হওয়া দরকার। তাছাড়া যশোর বিসিক থেকে প্রচুর পণ্য বিদেশে রপ্তানি হয়, বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়, সরকার রাজস্বও পায়। এ বিসিকের উন্নয়নে সরকারের দৃষ্টি দেওয়া দরকার।
যশোর বিসিকের ভারপ্রাপ্ত উপমহাব্যবস্থাপক এম এনাম আহমেদ বলেন, দ্বিতীয় শিল্পনগরী স্থাপনের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ের বিভাগীয় প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি অনুমোদন করেছে। নতুন রাস্তা, ড্রেন, নিরাপত্তাবেষ্টনী ও গেট নির্মাণের প্রাক্কলন বিসিকের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। সড়কবাতির বৈদ্যুতিক সংযোগের কাজ শেষ হয়েছে; এখন বাতি স্থাপনের কাজ চলছে। অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের কাজও চলমান।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী এবং যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, যশোর বিসিকের উন্নয়ন তাঁর নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অংশ। সরকার গঠনের পর থেকেই নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অভ্যন্তরীণ সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা সংস্কারের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসের সাবস্টেশন স্থাপন, পুরো শিল্পনগরী সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা এবং অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের কাজ চলছে।
