ডেঙ্গুর প্রকোপ : মৃত্যুর ৫৫ শতাংশ নারী

রেজা মুজাম্মেল, চট্টগ্রাম

নতুন প্রাণের আগমন ঘিরে যেখানে আনন্দ ও উৎসবমুখর হওয়ার কথা পুরো পরিবার, সেখানে মরণব্যাধি ডেঙ্গু যেন ডেকে আনছে এক নির্মম বিষাদ। চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, শেষ এক মাসে ডেঙ্গুর থাবায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত চারজন অন্তঃসত্ত্বা। অন্যদিকে ডেঙ্গুর হটস্পট খুলনায় সংক্রমণ কিছুটা কমলেও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যুর হার।

চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে আছেন গর্ভবতী নারীরা। গত এক মাসে চট্টগ্রামে অন্তত চারজন অন্তঃসত্ত্বা নারীকে ডেঙ্গুর কাছে হার মানতে হয়েছে। অন্যদিকে, চট্টগ্রামে চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট মারা যান ৩৫ জন। এর মধ্যে ১৮ জনই মহিলা, যা মোট মৃত্যুর ৫২ শতাংশ। ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে যে সেবা পাওয়ার কথা তাও ঠিকমতো পাচ্ছেন না অনেকে। আক্রান্ত হলেও হাসপাতালে মিলছে না সাধারণ ও আইসিইউ শয্যা। হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরেই মারা যাচ্ছেন রোগী। সরকারি হাসপাতালে শয্যা সংকটে যেতে হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতালে। কিন্তু এখানে অনেকেই বহন করতে পারছেন না চিকিৎসার ব্যয়। ফলে আক্রান্তদের অন্তহীন সমস্যা-সংকটে পড়তে হচ্ছে।

গত ২৫ অক্টোবর ডেঙ্গু আক্রান্ত হন নগরের হামজারবাগ এলাকার বাসিন্দা আনিসা দাশ মলি (২৫)। তিনি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। তাকে মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মলি। তার এক্সপান্ডেড ডেঙ্গু সিনড্রোম দেখা দিয়েছিল। তাঁর গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার খিলপাড়া গ্রামে। এর আগে স্কুল শিক্ষিকা অর্পিতা দাশ (২৬) ছিলেন ৩৫ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে প্রথমে জেনারেল হাসপাতাল, মেমন মাতৃসদন হাসপাতাল, মা ও শিশু হাসপাতাল পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। কিন্তু তাকে বাঁচানো যায়নি। গত ১১ সেপ্টেম্বর মারা যান। এর এক সপ্তাহ পর নগরের হকার মোহাম্মদ আলামিনের স্ত্রী মণি বেগম ছিলেন ৯ মাসের গর্ভবতী। ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে ভর্তি করা হয় হাসপাতালে। নেওয়া হয় আইসিইউতে। বিল আসে ১ লাখ ২১ হাজার টাকা। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে না পেরে হাসপাতাল ছেড়ে বাড়ি নেওয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্সেই মারা যান মণি বেগম। সঙ্গে মারা যায় গর্ভের সন্তানও। এর আগে আনোয়ারা উপজেলায় গর্ভবতী এক নারীর মৃত্যু হয়। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) ডা. এএসএম লুৎফুল কবির শিমুল বলেন, গর্ভবর্তী নারীরা ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে রোগীর শরীরে মারাত্মক অবস্থা তৈরি হয়। গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গু হলে বাচ্চার গ্রোথ কমে যায়, বিলম্বে ডেঙ্গু শনাক্ত করা হয়, ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মহিলার বাচ্চা নষ্ট হয়ে যায়, এ সময় প্রচুর পরিমাণে রক্তক্ষরণ হয়। ফলে মা ও গর্ভের সন্তান-দুজনই ঝুঁকিতে পড়েন। তাই গর্ভাবস্থায় কেউ আক্রান্ত হলে তাকে অবশ্যই হাসপাতালে রেখেই চিকিৎসা দেওয়া জরুরি।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যান ৩৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ সাতজন, নারী ১৮ জন ও শিশু ১০ চারজন। চলতি বছর মোট আক্রান্ত হন ৬ হাজার ৯২৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৩ হাজার ২২৫, মহিলা ২ হাজার ৬৭ ও শিশু ১ হাজার ৬৩২ জন। গত বৃহস্পতিবার একদিনেই আক্রান্ত হন ৭২ জন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights