এআই কি বিজ্ঞানের স্বর্ণযুগ ফিরিয়ে আনল?

অনলাইন ডেস্ক

বিশ্ববিজ্ঞানের দরবারে দীর্ঘ সময় ধরে ঘনিয়ে এসেছিল এক গভীর অন্ধকার আর হতাশার মেঘ! একের পর এক গবেষক, নামজাদা বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে প্রথিতযশা লেখকরা অশুভ সংকেত দিয়ে বলছিলেন, বিজ্ঞানের সেই স্বর্ণযুগ নাকি চিরতরে শেষ হতে চলেছে।

১৯৯৬ সালে জন হোরগানের মতো লেখকরা চিৎকার করে বলেছিলেন ‘দ্য এন্ড অফ সায়েন্স’-এর কথা, অর্থাৎ বিজ্ঞানের সমাপ্তি আর জ্ঞানের সূর্যাস্তের গল্প। বিজ্ঞানীদের আক্ষেপ ছিল, প্রকৃতি তার সবচেয়ে সহজ আর মৌলিক আবিষ্কারগুলোর রস নিংড়ে নেওয়া শেষ করে ফেলেছে। ল্যাগ্রাঞ্জের সেই পুরনো আফসোসের মতোই বিশ্বব্যবস্থাকে তো আর বারবার নতুন করে আবিষ্কার করা যায় না! নতুন কোনো একটা উদ্ভাবনের জন্য হাজারো মেধা ঢেলে দিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছিল না, দিন দিন কমছিল গবেষণার উৎপাদনশীলতা। উপরন্তু তরুণ প্রজন্মের অনাগ্রহ আর বিজ্ঞানের জটিলতার তোড়ে যেন এক জায়গায় থমকে দাঁড়িয়েছিল মানবজাতির অগ্রযাত্রা। বিজ্ঞান কি তবে সত্যিই এক কঠিন দেয়ালের মুখে এসে আছড়ে পড়েছিল?

ঠিক তখনই বিশ্বমঞ্চে আবির্ভূত হলো এক নতুন পরাশক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই! আজ হয়তো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না সামগ্রিক অর্থনীতিতে এআই কতটা প্রভাব ফেলবে, কিন্তু বিজ্ঞান গবেষণার জগতে যে এক অলৌকিক আর অভূতপূর্ব ঝড় উঠে গেছে, তা আর অস্বীকার করার উপায় নেই। অ্যানথ্রোপিকের মতো জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানগুলো আজ ওষুধ আবিষ্কারের জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করে দিয়ে খাদ্য অ্যালার্জির নিরাময়ে নিয়ে আসছে অবিশ্বাস্য সব অগ্রগতি। ওপেনএআই স্নায়ুক্ষয়কারী জটিল সব ব্যাধির পথ্য খুঁজে পেতে উন্মোচন করছে নতুন দিগন্ত। আর ওদিকে গুগল ক্লাউডের বিজ্ঞানীরা জেমিনি মডেলের হাত ধরে পারমাণবিক ফিউশন রিয়্যাক্টরের নিখুঁত ডিজাইন তৈরি করা থেকে শুরু করে বিরল রোগ ও কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের হাজারো জটিল ধাঁধার সমাধান চোখের পলকে সামনে এনে দাঁড় করাচ্ছে। অথচ এগুলো তো কেবল সেই মহাসমুদ্রের অতি সামান্য কিছু ফুটকি মাত্র! আসল বৈপ্লবিক রূপান্তরটি তো ঘটতে যাচ্ছে ঠিক দরজার ওপারেই।

এতদিন বিজ্ঞান গবেষণার সবচেয়ে বড় সীমা বা বাধা ছিল খোদ মানুষ নিজেই। একজন প্রখর মেধাবী বিজ্ঞানীকে তৈরি করতে বছরের পর বছর পার হয়ে যেত, তাকে পড়ে ফেলতে হতো গোটা বিশ্বের পর্বতসম গবেষণা। তারপর বয়সের ভারে যখন তিনি ফ্রন্টিয়ার বা গবেষণার চূড়ায় পৌঁছাতেন, ততদিনে তার মৌলিক চিন্তার ধার কমে যেত। উপরন্তু গবেষণার এই বিপুল সমুদ্রে মেধার যে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, এআই এসে সেই সব সীমাবদ্ধতাকে একেবারে উড়িয়ে চুরমার করে দিয়েছে! আজ আর কোনো গবেষণাগারকে উপযুক্ত মানবের অপেক্ষায় প্রহর গুনতে হয় না। কারণ, এখন এআই এজেন্ট নিজেই হয়ে উঠেছে এক স্বাধীন, স্বয়ংসম্পূর্ণ আর অসীম ক্ষমতার অধিকারী গবেষক। আপনি চাইলে মুহূর্তে হাজার হাজার এআই এজেন্ট তৈরি করে সমান্তরালভাবে বিজ্ঞানের হাজারো শাখায় একসাথে অভিযান চালাতে পারেন। যে পড়া পড়তে একজন বিজ্ঞানীর লেগে যেত বছরের পর বছর, এআই সেই কোটি কোটি পেপার চোখের পলকে পড়ে ফেলে পৌঁছে যাচ্ছে জ্ঞানের একদম শেষ প্রান্তে।

বিজ্ঞানের মূল চালিকাশক্তি হলো তত্ত্ব আর পরীক্ষার এক যুগলবন্দি। আগে একটা পরীক্ষার ফলাফল ব্যাখ্যা করে নতুন একটা গাণিতিক তত্ত্ব দাঁড় করাতেই বিজ্ঞানীদের জীবনের বহু বছর কেটে যেত। কিন্তু এআই আজ সেই তত্ত্বের দেয়ালকেও ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। সম্প্রতি ওপেনএআই-এর একটি মডেল কম্পিউটার সায়েন্স ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের এমন সব জটিল সমস্যার সমাধান করে ফেলেছে, যা নিয়ে যুগের পর যুগ বাঘা বাঘা গণিতবিদরা মাথা কুটে মরেছেন। এমন কি পার্টিকেল ফিজিক্সের স্ট্যান্ডার্ড মডেলের মতো জটিল গাণিতিক প্রমাণের যে সমস্যা এতদিন অধরা ছিল, তাও এআই নিমেষে সমাধান করে দিয়েছে! এর ফলে এখন বিজ্ঞানের দুয়ার উন্মুক্ত হয়ে গেছে এমন সব মানুষদের জন্যও, যাদের হয়তো গাণিতিক তত্ত্বে সহজাত পারদর্শিতা ছিল না।

শুধু তাই নয়, গবেষণার ক্ষেত্রে সাহিত্যের সমুদ্র মন্থন করার যে ক্লান্তিকর কাজ, তাও এখন প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। ওপেনএআই-এর নতুন গবেষণা জিটিপি-রোজালিন্ডের কথাই ধরা যাক! হাজার হাজার এআই এজেন্ট একসাথে জিঙ্ক ডিসরাপশন ও কোষের প্রতিক্রিয়া নিয়ে গবেষণা চালিয়ে, বৈজ্ঞানিক সাহিত্যের বিশাল পাহাড় চষে ফেলে তৈরি করে ফেলেছে আস্ত এক বায়োলজিক্যাল রিজনিং অ্যাটলাস। মানুষ বিজ্ঞানী যে কাজ করতে মাসের পর মাস বা বছর পার করে দিতেন, এই এআই এজেন্টরা চোখ মেলতেই তা নিখুঁতভাবে শেষ করে এনেছে। সবথেকে রোমাঞ্চকর বিষয় হলো, এআই কিন্তু কেবল একটা নির্দিষ্ট খোপের ভেতর আটকে নেই। একজন মানুষের পক্ষে চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের লক্ষ লক্ষ গবেষণাপত্র একসাথে মনে রাখা অসম্ভব হলেও, এআই এক নিমেষেই একদম ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের জ্ঞানকে জুড়ে দিয়ে এমন সব বৈপ্লবিক চিন্তার জন্ম দিচ্ছে, যা মানুষ হয়তো কোনোদিন কল্পনাও করতে পারত না!

আর সবথেকে রোমাঞ্চকর এবং রূপকথার মতো রহস্যময় অধ্যায়টি লুকিয়ে আছে বিজ্ঞানের এক নতুন রূপান্তরের মাঝে, যাকে বলা হচ্ছে ‘সুপার সায়েন্স’! এআই হয়তো বিজ্ঞানের এমন কিছু রহস্য ও প্রাকৃতিক নিয়ম উন্মোচন করতে যাচ্ছে, যাকে বলা যায় ‘ক্লাউড লস’ বা মেঘ-নিয়ম। প্রকৃতির এমন অনেক জটিল প্রপঞ্চ বা ঘটনা রয়েছে যা এত বেশি বিস্তৃত আর জটিল যে, কোনো সাধারণ মানুষের মস্তিষ্কে বা পাঠ্যবইয়ের ছোট ছোট বাক্যে তাকে সংকুচিত করা সম্ভব নয়। কিন্তু বিশাল ডাটা সেন্টার ও শক্তিশালী সেন্সরের মাধ্যমে এআই সরাসরি প্রকৃতি, মস্তিষ্ক কিংবা কোষের হাজারো অদৃশ্য ছন্দ থেকে এমন সব নিখুঁত প্যাটার্ন বা নিয়ম খুঁজে বের করতে পারে, যা মানবজাতির চিন্তার বহু উর্ধ্বে। মানুষের বুদ্ধির কোনো প্রকার মধ্যস্থতা ছাড়াই এআই সরাসরি এই রহস্যগুলো উন্মোচন করবে। সেই আবিষ্কারগুলো হয়তো সাধারণ মানুষের কাছে মনে হবে কোনো জাদুকরী মন্ত্রের মতো অলৌকিক, কিন্তু এআইয়ের কাছে তা হবে নিখুঁত বিজ্ঞান!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights