অস্ত্র পরিবহন ও যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে ২২ দেশের ১১৩ বন্দরে শ্রমিকদের ধর্মঘট
অনলাইন ডেস্ক
শুক্রবার ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বন্দরে ধর্মঘট করেছেন বন্দরশ্রমিকেরা। এর ফলে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল ও ফেরি পরিষেবা ব্যাহত হয়েছে। যুদ্ধাঞ্চলে অস্ত্র পরিবহনে বন্দর ব্যবহার এবং উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে কৃষ্ণসাগর পর্যন্ত বিভিন্ন যুদ্ধে নাবিকদের প্রাণহানির প্রতিবাদে তারা এই ধর্মঘট করেন।
২২টি দেশের ১১৩টি বন্দরের ধর্মঘটকারীরা বেতন বাড়ানো, কাজের পরিবেশ উন্নত করা এবং যুদ্ধাঞ্চল অতিক্রমকারী জাহাজে চিকিৎসক রাখার অধিকার নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছেন।
গ্রিসের পিরেয়াস বন্দরে এক সমাবেশে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গ্রিসের বাণিজ্যিক জাহাজের প্রকৌশলীদের শ্রমিক সংগঠনের প্রধান অ্যাপোস্তোলস কিপ্রাইওস বলেন, ‘আমরা তাদের যুদ্ধের জন্য কাজ করব না। তাদের কামানের গোলার খাদ্যও হব না।’
‘অনেক নাবিকদের প্রাণহানি হয়েছে’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নিজেরাই এসব ঘটনার অভিজ্ঞতা পেয়েছি। আমাদের পরিবারগুলোকেও এর মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কোনো সহকর্মী শেষ পর্যন্ত বাড়ি ফিরতে পারবেন কি না, সেই উদ্বেগ নিয়ে তাদের দিন কাটাতে হয়েছে।’
ইতালি, ফ্রান্স, গ্রিস, স্পেনের বাস্ক অঞ্চল, তুরস্ক ও মরক্কোতে প্রথম এই ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছিল। এখন ২৫টির বেশি শ্রমিক সংগঠন এতে সমর্থন জানিয়েছে।
শুক্রবার পিরেয়াস, ভ্যালেন্সিয়া, লে আভর, আলহেসিরাস ও জেনোয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌবাণিজ্যকেন্দ্রগুলোতে এই ধর্মঘট পালিত হয়। এ ছাড়া মরক্কোর তাঞ্জের মেড এবং ভারতের নাভা শেভা বন্দরেও ধর্মঘট হয়।
গ্রিসের নাবিকদের শ্রমিক সংগঠন পেনেন এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘নাবিকদের মধ্যে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে। নিহত ও গুরুতর আহতদের সংখ্যা কয়েক শ।’
সংগঠনটি জানায়, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর অক্টোবরের প্রথম ২১ দিনে উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজে ২৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। যুদ্ধ শুরুর পর এটিই এ ধরনের হামলার সর্বোচ্চ সংখ্যা।
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত কৃষ্ণসাগরে ৫৭০টি হামলার ঘটনা নিশ্চিত হওয়া গেছে। এসব হামলায় ৪০ জন নাবিক নিহত হয়েছেন এবং কয়েক শ আহত হয়েছেন।
কৃষ্ণসাগরের পশ্চিমাঞ্চলে ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ধর্মঘটের কারণে গ্রিসের পিরেয়াস বন্দরে পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে গ্রিসের বিভিন্ন দ্বীপে ফেরি চলাচল বন্ধ রাখা হয়। প্রায় ৩ হাজার বন্দরশ্রমিক ও নাবিক এই ধর্মঘটে অংশ নেন।
ভারতের শ্রমিক সংগঠন ডব্লিউটিডব্লিউএফআইয়ের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে প্রায় ১৫ জন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যু হয়েছে। জলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আরও অনেক নাবিক সমুদ্রে আটকা পড়েছেন।
‘গণহত্যার জন্য কোনো বন্দর নয়’—এই নামে বন্দরশ্রমিক ও অন্যান্য অধিকারকর্মীদের একটি সংগঠন ইসরায়েলের বন্দরে সামরিক পণ্য পৌঁছানো বন্ধের দাবিতে আন্দোলন করছে।
সংগঠনটি শুক্রবার জানিয়েছে, এই প্রতিবাদের ফলে প্রায় ৫২ হাজার পণ্যবাহী কনটেইনারের পরিবহন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে ২৮০ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে এই ধর্মঘটের ফলে পণ্য পরিবহনে ঠিক কতটা প্রভাব পড়েছে, তা রয়টার্স স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
২০২৬ সালের মে মাসে ইউরোপের ৩৫টির বেশি দেশের বন্দরশ্রমিকদের সংগঠন তথাকথিত ‘ইস্তাম্বুল ঘোষণা’ প্রকাশ করে। এতে যুদ্ধাঞ্চলে পাঠানোর জন্য নির্ধারিত অস্ত্র পরিবহনে কোনো বন্দরসুবিধা ব্যবহার না করার দাবি জানানো হয়।
বন্দরশ্রমিকেরা আরও বলেছেন, চলমান সংঘাতের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় তারা উদ্বিগ্ন।
পিরেয়াস বন্দরের বন্দরশ্রমিকদের সংগঠনের প্রধান জর্জ গোগোস বলেন, ‘সুপারমার্কেটে যাওয়ার জন্য গাড়িতে জ্বালানি ভরার সামর্থ্যও আমাদের নেই।’
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
