হানি ট্র্যাপের ভয়ংকর জাল

মুহাম্মদ সেলিম, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামে প্রতারণার ভয়ংকর ফাঁদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ‘হানি ট্র্যাপ’ বা প্রেমের ফাঁদ। সামাজিক মাধ্যমে মিথ্যা প্রেমের অভিনয়, প্রলোভন এবং পরবর্তীতে জিম্মি করে অর্থ আদায়ের এই অভিনব কৌশলে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন পেশাজীবী থেকে শুরু করে শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তারাও। প্রতারিত হয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) শীর্ষ কর্তা। প্রতারিতের তালিকা থেকে বাদ যায়নি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। বাংলাদেশ প্রতিদিনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে হানি ট্র্যাপের অর্ধশতাধিক চক্রের প্রতারণার রোমহর্ষক তথ্য। এ বিষয়ে সিএমপির কমিশনার হাসান মো শওকত আলী বলেন, ‘হানি ট্র্যাপের নামে প্রতারণা প্রতিরোধে কাজ করছে সিএমপির সব ইউনিট। গত ছয় মাসে অন্তত ১০টি চক্রকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আর যারা সক্রিয় রয়েছে তাদেরও আইনের আওতায় আনতে কাজ করছে পুলিশ।’

হানি ট্র্যাপের প্রতারণার শিকার আদনান নামে এক যুবক বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন হোজাইফা ও তার স্ত্রীর (একটি চক্র) সঙ্গে পরিচয় হয়। ওই পরিচয়ের সূত্র ধরেই তারা সিক্রেট গ্রুপে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। অশ্লীল কাজে যুক্ত হওয়ার প্রলুব্ধ করে। এতে রাজি না হওয়ায় তারা পর্নোগ্রাফি ধারায় মামলা দায়ের করেন। মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করছে।’ এ ধরনের চক্রের ফাঁদে প্রতারিত হয়েছেন একটি সরকারি সংস্থার সিনিয়র কর্মকর্তা। সামাজিক অবস্থানের কারণে পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এ কর্মকর্তা বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক তরুণীর সঙ্গে পরিচয় হয়। পরে বন্ধুত্ব। তার সঙ্গে মাঝেমধ্যে ভিডিও কলে কথা হয়। পরে ওই তরুণী এআইর মাধ্যমে ভিডিও এডিট করে প্রতারণা শুরু করে। দুই দফায় মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, হানি ট্র্যাপ চক্রগুলো মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে নারীদের। এদের মূল টার্গেট সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, উচ্চপদস্থ সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তা, প্রবাসী এবং আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিরা। প্রতারণার শুরুটা হয় ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জারের মতো সামাজিকমাধ্যম দিয়ে। চক্রের সদস্যরা আকর্ষণীয় প্রোফাইল খুলে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায়। এরপর ধীরে ধীরে চ্যাটিং এবং অডিও-ভিডিও কলের মাধ্যমে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভয়েস চেঞ্জিং অ্যাপ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে অন্যের ছবি ও ভিডিও জুড়ে দিয়ে টার্গেটেড ব্যক্তির সঙ্গে আপত্তিকর ভিডিও কল করা হয়। আবার কিছু চক্র সরাসরি নারী সদস্যদের দিয়ে টার্গেটকে কোনো নির্দিষ্ট ফ্ল্যাট বা বাসায় দেখা করার নাম করে ডেকে নেয়। টার্গেট একবার ফ্ল্যাটে প্রবেশ করলে বা আপত্তিকর ভিডিও কলে যুক্ত হলেই শুরু হয় ব্ল্যাকমেল। বাসায় ডেকে নেওয়ার ক্ষেত্রে চক্রের অন্য সদস্যরা নিজেদের পুলিশ, সাংবাদিক বা আত্মীয় পরিচয় দিয়ে রুমে প্রবেশ করে এবং আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ধারণ করে। অন্যদিকে ভিডিও কলের ক্ষেত্রে স্ক্রিন রেকর্ড করে রাখা হয়। এরপর সেই ছবি বা ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার এবং পরিবারকে জানিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। চট্টগ্রামে বর্তমানে অর্ধশতাধিক সংঘবদ্ধ হানি ট্র্যাপ চক্র সক্রিয় রয়েছে। চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক সক্রিয় রয়েছে হোজাইফা দম্পতি। তাদের হানি ট্র্যাপে পড়ে প্রতারিত হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়- পড়ুয়া শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ীসহ চট্টগ্রামের অর্ধশতাধিক ব্যক্তি। জুবাইরুল হক জিয়ানের নেতৃত্বে আছে হানি ট্রাপের আরেকটি চক্র। অভিযোগ আছে, এ চক্রের নেপথ্যে আছেন সিএমপির পরিদর্শক পদমর্যাদার দুই কর্মকর্তা। এ চক্রের হোতা জিয়ান গ্রেপ্তার হলেও অন্যরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। নগরীর কোতোয়ালি থানা এলাকায় সক্রিয় রয়েছে মোবারক হোসেন ও নুসরাত ফারিয়া চক্র; শাফায়েত উল্লাহ আকাশের নেতৃত্বে সক্রিয় রয়েছে আরেকটা গ্রুপ। নগরীর চান্দগাঁও এলাকায় সক্রিয় জয়নাল আবেদীন ওরফে সাকিব ও সুমি আকতার জুটি। তাদের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে। নগরীর বায়েজিদ এলাকায় ফাইভ স্টার গ্রুপ। গত কয়েক বছরে এ চক্রের ফাঁদে পড়ে প্রতারিত হয়েছেন অর্ধশতাধিক ব্যক্তি। একই এলাকায় আসিফের নেতৃত্বে রয়েছে সাতজনের আরেকটা গ্রুপ। নগরীর পতেঙ্গা এলাকায় সক্রিয় সুন্দর রানি ওরফে অথৈই, জাহিদুল ইসলাম ওরফের জাহিদ এবং আল মামুন শাহীনের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ। নগরীর খুলশী থানা এলাকায় সক্রিয় রয়েছে মোহাম্মদ আবদুল হান্নান, মোহাম্মদ মনির হোসেন ওরফে ইমন এবং সাবিহা বেগম একটি গ্রুপ।

গাঁজার ভিডিও করে কিশোরকে অপহরণ : বরিশালে এক কিশোরের হাতে গাঁজার পোঁটলা ধরিয়ে ভিডিও ধারণ করে তাকে ব্ল্যাকমেল এবং পরে মুক্তিপণের জন্য অপহরণের ঘটনায় আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে তিনজন কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য, তিনজন হানিট্র্যাপ চক্রের এবং দুইজন চোরাই স্বর্ণ ক্রয় চক্রের সদস্য। শনিবার দিনভর অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার এবং অপহৃত কিশোরকে উদ্ধার করা হয়। কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুল ইসলাম জানান, গত ২ অক্টোবর সন্ধ্যায় নগরীর রূপাতলী এলাকার বাসার সামনে থেকে অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে কৌশলে নির্জন স্থানে নিয়ে যায় অভিযুক্তরা। সেখানে তার হাতে দুটি গাঁজার পোঁটলা ধরিয়ে ভিডিও ধারণ করা হয়। পরে সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তার কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। ভয়ে বিষয়টি পরিবারকে না জানিয়ে ওই কিশোর বাসা থেকে ৭ হাজার টাকা, দুটি স্বর্ণের আংটি, দুই জোড়া স্বর্ণের দুল এবং দুটি স্বর্ণের চেইন এনে অভিযুক্তদের হাতে তুলে দেয়। ওসি আরও জানান, ২৯ অক্টোবর ওই কিশোর ওয়াজ মাহফিল শুনতে নগরীর ভাটারখাল ঈদগাহ মাঠে যাওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরে তার পরিবার থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। কিশোরটির মায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights