মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরই কি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র তুমুল যুদ্ধ শুরু হবে?
অনলাইন ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিনক্ষণ যত এগিয়ে আসছে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের আশঙ্কা তত তীব্র হয়ে উঠছে। মার্কিন সামরিক অভিযানের সাময়িক বিরতি ভোটাররা ভোট দেওয়ার পর শেষ হতে পারে, এমন গুঞ্জনে পুরো অঞ্চলজুড়ে এক থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানের সীমানার কাছে ইসরায়েলি সামরিক মহড়া, মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি বৃদ্ধি, উপসাগরীয় অঞ্চলের বেসামরিক পরিকাঠামোর ওপর ইরানি হুমকি এবং বাণিজ্যিক জাহাজে ক্রমাগত হামলার ঘটনাগুলো সেই বড় সামরিক সংঘাতের দিকেই নির্দেশ করছে।
বর্তমানে মূল দৃষ্টি নিবন্ধিত রয়েছে ৪ নভেম্বর মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক পরের দিনটির ওপর। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভোটের আগে সরাসরি হামলার সম্ভাবনা বাতিল করলেও নির্বাচনের পর কোনো সম্ভাব্য অভিযানের সময়সূচি বা পরিসর স্পষ্ট করেননি। তবে বিভিন্ন কূটনীতিক সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা গোপনে তাদের আঞ্চলিক অংশীদারদের প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা সতর্ক করেছেন, নির্বাচন শেষে যুক্তরাষ্ট্র আবারও বিমান হামলা শুরু করতে পারে এবং এর জবাবে ইরানও তীব্র পাল্টা আক্রমণ চালাতে পারে।
গত ১৯ অক্টোবরের দুটি সামরিক তৎপরতা এ প্রস্তুতির ইঙ্গিত পরিষ্কার করে দেয়। ওইদিন কয়েক ডজন ইসরায়েলি ফাইটার জেট মাঝআকাশে জ্বালানি ভরার সুবিধাসহ ইরানের সামরিক লক্ষ্যের অত্যন্ত কাছে পৌঁছে আবার ঘাঁটিতে ফিরে আসে। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথ আচমকা ইসরায়েল সফরে গিয়ে দেশটির দক্ষিণে ওভদা বিমানঘাঁটিতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হন। নেতানিয়াহুর মুখপাত্র এটিকে কেবল আঞ্চলিক হুমকি বিষয়ক বৈঠক বলে উল্লেখ করলেও চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আশঙ্কাবার্তা দিয়ে লেখেন, অঞ্চলে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ফিরে আসার বিষয়ে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ ওই বিমান মহড়াকে ইসরায়েলি নির্বাচনে ইরানের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ রোধে একটি কঠোর সতর্কবার্তা বলে আখ্যা দেন। অন্যদিকে ২১ অক্টোবর প্রকাশিত ইসরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎজ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতানিয়াহু তেহরানে দ্রুত আরেকটি হামলা চালাতে চেয়েছিলেন, তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বাধার মুখে তার সে পরিকল্পনা থমকে যায়।
ট্রাম্পের নিজের বক্তব্যও যুদ্ধের এই সম্ভাবনাকে টিকিয়ে রেখেছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর এক রিপাবলিকান কনভেনশনে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে ট্রাম্প বলেন, আমি মনে করি নির্বাচনের পরপরই যুদ্ধের এক চূড়ান্ত পরিণতি ঘটবে। একই সাথে তিনি তেহরানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তারা আর বেশিদিন টিকে থাকতে পারবে না। তারা মরিয়া হয়ে আমাদের নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে, যাতে দুর্বল নেতৃত্ব ক্ষমতায় আসে এবং তারা পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর সুযোগ পায়। পরবর্তীতে ৮ অক্টোবর ট্রাম্প স্পষ্ট করে দেন যে ভোটের আগে মধ্যবর্তী কোনো হামলার পরিকল্পনা নেই। তবে ২৮ অক্টোবর তিনি আবারও ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় বলেন, একভাবে বা অন্যভাবে খুব শিগগিরই কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। অধিকাংশ মানুষ মনে করছেন এটি নির্বাচনের পরই হবে, দেখা যাক কী ঘটে।
একই দিনে নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়, মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক পরিকল্পনাকারীরা নির্বাচনের পরপরই সমন্বিত হামলার বেশ কয়েকটি পথ উন্মুক্ত রেখেছেন। আলোচ্য এই সামরিক পরিকল্পনাটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু প্রচণ্ড বিধ্বংসী হতে পারে, যা ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্র, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবস্থার পাশাপাশি মূল শক্তি বা জ্বালানি পরিকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু বানাবে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি এক মহাবিপদের ইঙ্গিত বয়ে আনছে। হামলা বন্ধের সাময়িক বিরতি থাকলেও লোহিত সাগর ও প্রণালীগুলোতে জাহাজ আক্রমণ এবং হুথি বিদ্রোহীদের হামলা থামেনি। ইরান ইতোমধ্যেই চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, নতুন করে আক্রমণ হলে তারা সরাসরি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ বা ঘাটিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং মার্কিন মিত্র প্রতিবেশী দেশগুলোর বিমানবন্দর, জ্বালানি পাইপলাইন ও সাবমেরিন ইন্টারনেট ক্যাবলের মতো বেসামরিক পরিকাঠামোতেও সরাসরি আঘাত হানবে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশ সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে না, তারাও অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ধ্বংসযজ্ঞের মুখোমুখি হতে পারে।
সমুদ্রে বাণিজ্য জাহাজে হামলার তীব্রতাও চরম আকার ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) ৩০ অক্টোবরের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী ও সংলগ্ন এলাকায় ১২২টিরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। সম্প্রতি তেলবাহী জাহাজ ‘জেম নম্বর ২’-এ হামলার ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূল জুড়ে বিষাক্ত খনিজ তেল ছড়িয়ে পড়েছে, যা অঞ্চলের পরিবেশ ও মৎস্য সম্পদের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করছে।
একইসাথে জুলাই মাস থেকে ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা ক্রমাগত সৌদি আরবের বিমানবন্দর, জ্বালানি কেন্দ্র এবং মক্কা ও মদিনা অঞ্চল লক্ষ্য করে মিসাইল হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। গত অক্টোবরে ইয়েমেনের এডেন বিমানবন্দরেও ড্রোন হামলা চালানো হয়। জাতিসংঘ ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিশ্চিত করেছে, ইয়েমেনের এই বাহিনীকে উন্নত প্রযুক্তি, ড্রোন ও মিসাইল সরবরাহ করে সরাসরি সহায়তা করছে তেহরান।
তবে সাধারণ অবকাঠামোতে হামলার এই ছক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির মহাসচিবের মুখপাত্র সতর্ক করে বলেছেন, কোনো রাষ্ট্র বা সমাজের বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা কিংবা সাধারণ জনগণকে দুর্ভোগে ফেলার মতো কোনো সামরিক অজুহাত আন্তর্জাতিক আইনে গ্রহণযোগ্য নয়।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে ২১ অক্টোবর মার্কিন সরকার তাদের কিছু অনাবশ্যক কর্মী ও তাদের পরিবারকে ওই অঞ্চল থেকে সরিয়ে নিতে শুরু করেছে বলে *দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল* নিশ্চিত করেছে। তবে একই সময়ে ইরানের জলসীমার কাছাকাছি যুক্তরাষ্ট্রের অভূতপূর্ব নৌ-ঘাঁটি ও শক্তি সমাবেশ ঘটছে। আরব সাগরে ইতিমধ্যে উপস্থিত দুটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার ইউএসএস জর্জ এইচ.ডব্লিউ. বুশ এবং ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনের সাথে যোগ দিতে জাপান থেকে রওনা দিয়েছে ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট।
ইউএস নেভাল ইন্সটিটিউটের তথ্যমতে, দুটি প্রধান রণতরীর সাথে যুক্ত হয়েছে ২২০০ মেরিন সেনা নিয়ে উভচর যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস বক্সার। এর সাথে স্যান ডিয়েগো থেকে ইউএসএস মেকিন আইল্যান্ডে চড়ে ১৩তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট যুক্ত হওয়ার পথে রয়েছে। কেবল আকাশপথে হামলার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা সীমাবদ্ধ নেই, এই বিশাল মেরিন সেনা সমাবেশ স্থলভাগে ঝটিকা অভিযানের সক্ষমতা নির্দেশ করে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত জুনেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইরান থেকে তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র ‘খার্গ আইল্যান্ড’ যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে। বক্সার যুদ্ধজাহাজে থাকা এফ-৩৫বি ফাইটার জেটের সহায়তায় এই দ্বীপটিতে মেরিন অভিযান চালানো সামরিকভাবে সম্পূর্ণ সম্ভব।
সূত্র: আরব নিউজ
