মাদকের বিরুদ্ধে জয়ী হলেই দেশ এগিয়ে যাবে
অদিতি করিম
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকার আন্তরিক। মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আমরা যদি কেবল দেশকে মাদকমুক্ত করতে পারি তাহলে আমাদের অগ্রযাত্রা কেউ থামিয়ে রাখতে পারবে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী ধূমপানসহ মাদকের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষতির পরিমাণ বছরে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। মাদকের ব্যবহারের কারণে অসুস্থতা বৃদ্ধি, কর্মক্ষমতা হ্রাস, সরাসরি অর্থনৈতিক ক্ষতি করছে। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ মাদকাসক্তির কারণে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলছেন। মাদকের কারণে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। অন্যান্য অপরাধের উৎসস্থল হলো মাদক। মাদকের বিস্তার আমাদের তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংস করছে। এ কারণেই মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমাদের জয়ের কোনো বিকল্প নেই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সঠিকভাবেই মাদক নির্মূলকে অগ্রাধিকার কর্মসূচি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। পৃথিবীতে যত দেশ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটিয়ে একটি সুখী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তারা সবাই মাদককে না বলার নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করেছে। আধুনিক সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ (Lee Kuan Yew) বলেছিলেন, মাদক হলো সব অপরাধের মা।
(Mother of all crime)। তিনি বলেছিলেন, ‘শুধু মাদক বন্ধ করতে পারলেই একটি নিরাপদ ও অপরাধ মুক্ত সিঙ্গাপুর গড়ে তোলা সম্ভব’। এই লক্ষ্যে তাঁর নেতৃত্বে ১৯৭৩ সালে প্রণীত ‘মিসইউস অব ড্রাগস অ্যাক্ট’ (Misuse of Drugs Act)-এর অধীনে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি মাদক রাখা বা পাচারের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়। তিনি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহলের সমালোচনা সত্ত্বেও এই আইনকে দেশটির নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য বলে জোরালোভাবে রক্ষা করেন। সেন্ট্রাল নারকোটিকস ব্যুরোকে (CNB) ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়, যার ফলে তারা যেকোনো সময় মাদক বিরোধী অভিযান, র্যান্ডম তল্লাশি ও কঠোর নজরদারি চালাতে পারে। লি কুয়ানের এই শূন্য সহনশীলতার (Zero-Tolerance) নীতির কারণেই সিঙ্গাপুর বিশ্বের অন্যতম মাদকমুক্ত দেশ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। আর মাদকের অভিশাপ থেকে মুক্ত হওয়ার কারণেই সিঙ্গাপুরে অপরাধ কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ দেশ হিসেবে পরিচিত সিঙ্গাপুর। লি কুয়ানের এই কঠোর অবস্থান তখন পশ্চিমা বিশ্ব সমালোচনা করলেও বিশ্বের অধিকাংশ দেশই মাদকের আগ্রাসন থেকে মুক্তির জন্য এই পথই বেছে নিয়েছে। মাদক বিক্রি করতে গিয়ে ধরা পড়লে মালয়েশিয়ায় মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। দেশটিতে মাদক রাখার জন্য জেল, জরিমানার ব্যবস্থা আছে। এ ছাড়া অভিবাসীদের কাছে মাদক পাওয়া গেলে তাদের দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হতে পারে। অন্যদিকে থাইল্যান্ডে মাদক পাচারের কারণে হতে পারে মৃত্যুদণ্ড। সৌদি আরবে মাদক বিক্রি করতে গিয়ে ধরা পড়লে মৃত্যুদণ্ড প্রায় নিশ্চিত। মাদক সেবন কিংবা সেগুলো রাখার জন্য দেশটিতে প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত, জরিমানা ও দীর্ঘদিনের কারাবাস দেওয়া হয়। একই বিধান রয়েছে কুয়েত, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। ইন্দোনেশিয়ায় মাদক বিক্রির দায়ে হতে পারে মৃত্যুদণ্ড। ১৯৭১ সালের গ্রীষ্মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন মাদককে ‘এক নম্বর গণশত্রু’ ঘোষণা করে এর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেন, যা পরবর্তীতে ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধ’ নামে পরিচিত হয়। এই নীতি যুক্তরাষ্ট্রের রাস্তাঘাটকে মাদকমুক্ত করা, পাচার নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং মার্কিন নাগরিকদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরির অঙ্গীকার করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মাদক নিয়ন্ত্রণে কেবল তাদের দেশে নয়, বিশ্বের যেকোনো দেশে অভিযান চালাতে পারে। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অংশ হিসেবে।
ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তে সেদেশে মাদকবিরোধী যুদ্ধের কারণে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছেন। কিন্তু তার এই বিতর্কিত অভিযান বিশ্বে সমালোচিত হলেও ফিলিপাইনে মাদকের অবাধ বিস্তার বন্ধ করে দিয়েছে। দুতার্তে কয়েক দফায় ফিলিপাইনের দাভাওয়ের সিটি মেয়র ছিলেন। পরে তিনি ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট হন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০১৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। দুতার্তে মেয়র ও প্রেসিডেন্ট থাকাকালে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেন। কথিত এই মাদকবিরোধী যুদ্ধের নামে বহু মানুষকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়। গত বছর ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় দুতার্তেকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই দিন দুতার্তেকে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে অবস্থিত আইসিসির উদ্দেশে পাঠানো হয়। ৭৯ বছর বয়সি দুতার্তে এখন এই আদালতে বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন। কিন্তু সেদেশের জনগণ মাদক থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এখনো দুতার্তের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
পৃথিবীতে যেসব দেশ মাদকের করাল গ্রাস থেকে বাঁচতে পেরেছে তারা সবাই কঠোর আইন প্রণয়ন করে এবং সেই আইনের পক্ষপাতহীন প্রয়োগের মাধ্যমেই মাদক নিয়ন্ত্রণ করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর আইন থাকলেও এতদিন তার যথাযথ প্রয়োগ ছিল না। ফলে বাংলাদেশ মাদক ব্যবসায়ীদের এক অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সারা দেশে চলছে মাদকের অবাধ বিস্তার। শিশু কিশোর থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত আজ মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে। দেশের মানুষের কর্ম শক্তি, সৃজনশীলতা, নৈতিক মূল্যবোধ সবকিছু ধ্বংস করছে মাদক। মাদক মানুষকে করছে হিংস্র, পাশবিক। যেমনটা সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা লি কুয়ান বলেছিলেন মাদক হলো সব অপরাধের উৎস- তার বাস্তব প্রমাণ আমরা এখন দেখছি বাংলাদেশে। মাদকের কারণে বাড়ছে ধর্ষণ, নারী নির্যাতনের ঘটনা। মাদকের সঙ্গে বিস্তৃত হচ্ছে হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতির মতো ঘটনা। মাদকের অবাধ বিচরণের কারণেই অবৈধ অস্ত্রের রমরমা ব্যবসা চলছে। মাদক সিন্ডিকেটের ওপর ভর করেই গড়ে উঠেছে চোরাচালান এবং নারী পাচারের সিন্ডিকেট। কিশোর গ্যাং আজ সমাজের সবচেয়ে বড় ব্যাধি। এর প্রধান কারণ মাদকের অবাধ বিস্তার।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে বিভিন্ন ধরনের অপরাধের নব্বই শতাংশই মাদক থেকে শুরু। মাদক চোরাচালান এবং তার অবাধ বিস্তার বন্ধ করতে পারলে বাংলাদেশে অপরাধ প্রবণতা কমে আসবে উল্লেখযোগ্য হারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশে প্রতিটি সরকারই দায়িত্ব গ্রহণ করে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলেন কিন্তু বাস্তবে মাদকের সিন্ডিকেট বন্ধ হয় না। অতীতে আমরা দেখেছি অনেক স্বীকৃত মাদক ব্যবসায়ী জাতীয় সংসদে সদস্য পর্যন্ত হয়েছেন। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ঘোষণা করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের আলোকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশব্যাপী মাদকবিরোধী অভিযানে শুরু করেছে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, মাদকের বিস্তাররোধে মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। কিন্তু মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা তৈরি করাই ছিল। ২০২৩ সালে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একটি ডিভিশন বেঞ্চ দেশের শীর্ষ মাদক কারবারিদের নাম-ঠিকানাসহ তালিকা দাখিলের নির্দেশ দিয়েছিল সরকারকে। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী প্রায় ৩ হাজার মাদক ব্যবসায়ীর একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সেই তালিকা আদালতে পেশ করা হয়নি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, ২৯২ জন গডফাদার এবং ৪ হাজার শীর্ষ মাদক কারবারির একটি তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই তালিকা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছে। পুলিশের আইজি বলেছেন, মাদক বিরোধী অভিযান পুলিশের অন্যতম অগ্রাধিকার। সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। তবে মাদকের বিরুদ্ধে যে মামলা হয় তা অধিকাংশই শেষ পর্যন্ত টেকে না। মাদক ব্যবসায়ী এবং অপরাধীরা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যায়। আইনে মাদক চোরাচালানের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু এই সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান শুধু আইনেই আছে বাস্তবে নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আসামিরা জামিনে বেরিয়ে যায়। পুলিশ বলছে, সাক্ষীর অভাবে মামলার সুষ্ঠু বিচার সম্ভব হচ্ছে না। মাদকবিরোধী যুদ্ধে কেবল আইন যথেষ্ট নয়। দরকার সামাজিক সচেতনতা। এজন্য প্রয়োজন জাতীয় ঐকমত্য। জাতীয় সংসদের সদস্যদের তাদের নিজ এলাকায় মাদকমুক্ত করার দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। যেখানে তারা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়ে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে হবে। সামাজিকভাবে মাদকের বিরুদ্ধে ঘৃণার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা দরকার। সরকার গাড়ি চালকদের জন্য ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করেছে। কিন্তু সেখানেও আইনের যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করার কথা থাকলেও তা এখনো কার্যকর হয়নি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি থেকে শুরু করে সবক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা দরকার। তাহলে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন জোরদার হবে। অতীতে দেখা গেছে, মাদক ব্যবসায়ী এবং গডফাদাররা যখন যে দল ক্ষমতায় আসে সেই দলের ছত্রছায়ায় ভিড়ে যায়। ফলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক ঐকমত্য দরকার। সব রাজনৈতিক দলকে অঙ্গীকার করতে হবে, মাদক চোরাচালানি এবং গডফাদারদের তারা আশ্রয় দেবে না। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে। মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এই সরকারের অ্যাসিড টেস্ট। এই যুদ্ধে জয়ী হতে পারলে সরকারের জন্য দেশকে এগিয়ে নেওয়া সফল হবে।
লেখক ও নাট্যকার
মেইল : auditekarim@gmail.com
