গুগল সার্চ থেকে ব্যক্তিগত তথ্য সরাবেন যেভাবে
অনলাইন ডেস্ক
নাম, বাসার ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া এখন বড় ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি। এসব তথ্য গুগল সার্চের ফলাফল থেকে সরানোর অনুরোধ জানাতে বিনামূল্যের একটি সেবা চালু করেছে গুগল। ‘রেজাল্টস অ্যাবাউট ইউ’ নামের এই টুল সম্পর্কে এখনো অনেকেই জানেন না।
ইন্টারনেটে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান মানুষের নাম, বাসার ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে বিক্রি করে। এসব প্রতিষ্ঠানকে বলা হয় ডেটা ব্রোকার। তারা বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে অনলাইনে বিক্রি করে থাকে। সামান্য অর্থের বিনিময়েই এসব তথ্য কিনতে পারে টেলিমার্কেটার, প্রতারক, পরিচিতজন কিংবা পরিচয় চুরির সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা। ফলে ঝুঁকিতে পড়ে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা।
এ পরিস্থিতিতে অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্যের সহজলভ্যতা কমানোর সুযোগ দিচ্ছে গুগলের বিনামূল্যের সেবা ‘রেজাল্টস অ্যাবাউট ইউ’। এর মাধ্যমে গুগল সার্চের ফলাফলে থাকা নিজের সংবেদনশীল তথ্য সরানোর অনুরোধ জানানো যায়। চলতি বছর সেবাটিতে নতুন কিছু সুবিধাও যুক্ত করেছে প্রতিষ্ঠানটি। খবর বিবিসির।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ডিজিটাল অধিকারবিষয়ক সংগঠন ইলেকট্রনিক ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশনের (ইএফএফ) নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা বিশেষজ্ঞ থরিন ক্লোসোস্কির মতে, এটি সহজে ব্যবহারযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ একটি গোপনীয়তা সুরক্ষার টুল। তার ভাষায়, খুব কম পরিশ্রমে ব্যক্তিগত তথ্যের সহজলভ্যতা কমানোর ক্ষেত্রে এটি অন্যতম কার্যকর ব্যবস্থা।
যেভাবে কাজ করে ‘রেজাল্টস অ্যাবাউট ইউ’
সেবাটি চালু করার পর গুগল আপনার নাম, ই-মেইল ঠিকানা, ফোন নম্বর ও বাসার ঠিকানার মতো তথ্য সার্চের ফলাফলে খুঁজতে থাকে। এসব তথ্য কোথাও পাওয়া গেলে গুগল ই-মেইলের মাধ্যমে আপনাকে জানায়। এরপর সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটের লিংক পর্যালোচনা করে সেগুলো সরানোর অনুরোধ জানানো যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহারকারীরা চাইলে সামাজিক নিরাপত্তা নম্বর, পাসপোর্ট নম্বর এবং ড্রাইভিং লাইসেন্সের তথ্যও শনাক্ত করার অনুরোধ করতে পারেন।
স্বয়ংক্রিয় সুবিধাটি ব্যবহার করতে একটি গুগল অ্যাকাউন্ট প্রয়োজন। তবে নিজে সার্চ করে কোনো সংবেদনশীল তথ্য খুঁজে পেলে অ্যাকাউন্ট ছাড়াও ম্যানুয়ালি সেটি সরানোর আবেদন করা সম্ভব।
ব্যবহারের আগে যেসব বিষয় জানা জরুরি
‘রেজাল্টস অ্যাবাউট ইউ’ ব্যবহার করলেই ইন্টারনেট থেকে আপনার সব ব্যক্তিগত তথ্য মুছে যাবে, বিষয়টি এমন নয়। এই সেবা মূলত গুগল সার্চের ফলাফল থেকে সংশ্লিষ্ট লিংক সরানোর ব্যবস্থা করে। যে ওয়েবসাইটে তথ্যটি প্রকাশিত হয়েছে, সেখান থেকে তথ্য মুছে যায় না।
এ ছাড়া হ্যাকিং বা ডেটা চুরির মাধ্যমে অপরাধীদের হাতে পৌঁছে যাওয়া তথ্যও এই টুলের মাধ্যমে সরানো সম্ভব নয়।
তবে গুগল সার্চে ব্যক্তিগত তথ্যের সহজলভ্যতা কমানোও নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইএফএফের বিশেষজ্ঞ ক্লোসোস্কির মতে, কেউ বিশেষভাবে আপনার তথ্য খুঁজতে চাইলে অন্য উপায়েও তা বের করতে পারে। কিন্তু গুগল সার্চে সহজে পাওয়া যায়—এমন ব্যক্তিগত তথ্য সরিয়ে ফেললে সাধারণ অনুসন্ধানের মাধ্যমে আপনাকে শনাক্ত করা অনেক কঠিন হয়ে যায়।
গুগলকে ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়া কতটা নিরাপদ?
সেবাটি ব্যবহার করতে হলে গুগলকে আপনার নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ যেসব তথ্য শনাক্ত করতে চান, সেগুলো জানাতে হবে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কাছে এত সংবেদনশীল তথ্য দেওয়া কতটা নিরাপদ?
এ বিষয়ে গুগলের বক্তব্য, ‘রেজাল্টস অ্যাবাউট ইউ’-এর মাধ্যমে জমা দেওয়া তথ্য অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা হয় না। এসব তথ্যের সুরক্ষায় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা ও এনক্রিপশন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে গুগলকে এসব তথ্য দেওয়ার আগে সেবাটির গোপনীয়তা নীতিমালা পড়ে নেওয়া ভালো।
যেভাবে ব্যবহার করবেন
‘রেজাল্টস অ্যাবাউট ইউ’ ব্যবহার করতে প্রথমে গুগলের নির্ধারিত সেবা পেজে যেতে হবে। এরপর প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে ফরম পূরণ করতে হবে। কোন কোন ব্যক্তিগত তথ্য খোঁজা হবে, সেটিও সেখানে নির্ধারণ করে দেওয়া যাবে।
এ ছাড়া গুগল সার্চে নিজের কোনো সংবেদনশীল তথ্য চোখে পড়লে সরাসরি সেটি সরানোর অনুরোধ জানানো যায়। এ জন্য—
গুগল সার্চে সংশ্লিষ্ট ফলাফলের পাশে থাকা তিন ডট মেনুতে ক্লিক করুন।
‘রিমুভ রেজাল্ট’ অপশন নির্বাচন করুন।
এরপর নির্দেশনা অনুসরণ করে তথ্যটি সরানোর আবেদন জমা দিন।
তবে সব ধরনের তথ্য সরানোর আবেদন গুগল গ্রহণ করে না। সরকারি ওয়েবসাইট বা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কিছু তথ্য এই সুবিধার আওতার বাইরে থাকতে পারে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত তথ্য সরানোর আবেদনও করা যায়।
ইন্টারনেট থেকে পুরোপুরি তথ্য মুছতে চাইলে কী করবেন?
গুগল সার্চ থেকে কোনো লিংক সরানো আর ইন্টারনেট থেকে ব্যক্তিগত তথ্য পুরোপুরি মুছে ফেলা এক বিষয় নয়। অনলাইনে তথ্যের মূল উৎস সরাতে চাইলে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট বা ডেটা ব্রোকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য মুছে ফেলার অনুরোধ জানাতে হবে।
এ কাজে কিছু অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সহায়তা করে থাকে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দাদের জন্য রয়েছে বিনামূল্যের সরকারি সেবা ‘ডিলিট রিকোয়েস্ট অ্যান্ড অপ্ট-আউট প্ল্যাটফর্ম’। এর মাধ্যমে একসঙ্গে হাজারো ডেটা ব্রোকারের কাছে ব্যক্তিগত তথ্য মুছে ফেলার অনুরোধ পাঠানো যায়।
এ ছাড়া অনলাইনে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা বাড়ানোর বিষয়ে বিস্তারিত জানতে ইলেকট্রনিক ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশনের ‘সারভেইলেন্স সেল্ফ-ডিফেন্স’ গাইড অনুসরণ করা যেতে পারে।
কেন এখনই ব্যবহার করা উচিত?
গুগলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে চালুর পর থেকে ২০২৬ সালের শুরু পর্যন্ত ১ কোটির বেশি মানুষ ‘রেজাল্টস অ্যাবাউট ইউ’ ব্যবহার করেছেন। তবে গুগল অ্যাকাউন্টের সংখ্যা প্রায় ১৮০ কোটি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ সম্ভাব্য ব্যবহারকারীর তুলনায় এখনো অনেক কম মানুষ এই সুবিধা কাজে লাগাচ্ছেন।
