কোহিনুর হীরা যার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিল ইংরেজ

মোহাম্মাদ সোহেল

মুঘল আমলে পাঞ্জাবে শিখেরা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। শুধু পাঞ্জাব নয়, আফগানিস্তান পর্যন্ত গড়ে ওঠে শিখ সাম্রাজ্য। মহারাজা রণজিৎ সিং হয়ে ওঠেন শিখদের শৌর্যবীর্যের প্রতীক।

১৮৪৯ সালের ২৯ মার্চ সে রাজ্যের অন্তিমক্ষণ। মসনদ ছাড়েন রণজিৎ সিংয়ের ১১ বছর বয়সী ছেলে মহারাজা দিলীপ সিং। এদিন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয় পাঞ্জাব; যার ফলে ভুবনবিখ্যাত কোহিনুর হীরার দখল পায় ইংরেজ; যা পরে রানি ভিক্টোরিয়ার কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেদিন গ্লানি ও ক্ষোভ নিয়ে অস্ত্র জমা দেন মহারাজার অনুসারীরা। শিখ সেনা ‘খালসা’রা বরাবরই প্রয়াত রণজিতের ছায়া দেখতে পেতেন তাঁর ছেলের মাঝে। কিন্তু তা ছিল নিতান্তই অতি প্রত্যাশা। আর দিলীপ সিং সে সময় ছিলেন নিতান্তই শিশু। ১৭৯৯ সালে রণজিৎ সিং পাঞ্জাবে প্রতিষ্ঠা করেন শিখ রাজ্য। বাবা ও ভাইয়ের মৃত্যুর পর ১৮৪৩ সালে মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই মসনদে আরোহণ করেন দিলীপ। কিন্তু ছয় বছর পর তাঁকে হারাতে হলো সিংহাসন। তখন তার বয়স ১১ বছর। ব্রিটিশ আধিপত্য তখন পুরো ভারতকে শক্তভাবে জড়িয়ে ধরেছে। নামমাত্র ক্ষমতায় ছিলেন দিল্লির শেষ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ। ১৮৪৯ সালে পাঞ্জাব স্বাধীনতা হারায়। দিলীপ সিংয়ের মা জিন্দ কৌরকে কারারুদ্ধ রাখা হয়। আর তাঁর ১১ বছর বয়সী ছেলে মহারাজা দিলীপকে নিয়ে যাওয়া হয় লন্ডনে। পাঞ্জাবে যেন আর বিদ্রোহ মাথা চাড়া না দেয়, সেজন্য নেওয়া হয় এ ব্যবস্থা। ১৫ বছর বয়স থেকে জীবনের বাকিটা সময় নির্বাসনেই কাটিয়েছেন মহারাজা দিলীপ সিং। স্যার জন স্পেন্সার ও লেডি লগিন দম্পতির তত্ত্বাবধানে বড় হন তিনি। ইংরেজি ভাষা রপ্ত করার সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ জীবনাচরণও রপ্ত করেন। একপর্যায়ে খ্রিস্টধর্মও গ্রহণ করেন। দিলীপ যাতে পাঞ্জাবে অশান্তি সৃষ্টি করতে না পারেন সেজন্য তাঁকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা দেওয়া হয়। ফলে রাজ পরিবারের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ক্রমে শিথিল হতে থাকে। ইংল্যান্ডের বিভিন্ন পার্টিতে উপস্থিতি ছিল দিলীপের জন্য স্বাভাবিক ঘটনা। ছুটির দিনে তাঁকে দেখা যেত যুবরাজ অ্যালবার্ট ও রানি ভিক্টোরিয়ার আড্ডার আসরে। এদিকে দিলীপের মা বৃদ্ধ রানি জিন্দ কৌর অসুস্থ হয়ে পড়লে ব্রিটিশ সরকার মনে করে, তিনি আর ক্ষতিকর নন। ফলে ১৩ বছর পর মা-ছেলের দেখা করার অনুমতি মেলে। জিন্দ কৌর ছেলের পরিবর্তনে বিস্মিত হন। বারবার স্মরণ করিয়ে দেন শিখ পরিচয় ও হারানো সাম্রাজ্যের কথা। ১৮৬৪ সালে বাম্বা মুলারকে দিলীপ সিং বিয়ে করেন। বাম্বা ছিলেন খ্রিস্টধর্মে একনিষ্ঠ বিশ্বাসী এবং জার্মান ব্যাংকারের মেয়ে। তাঁদের ঘরে জন্মায় ছয় সন্তান। তাঁদের দুই মেয়ে পরে নারী অধিকারকর্মী হিসেবে নাম করেন। ছেলে প্রিন্স ফ্রেডরিখ দিলীপ সিং ছিলেন সেনা কর্মকর্তা। একসময় আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাপন করলেও পরে অর্থনৈতিক সংকটে পড়েন মহারাজা দিলীপ। বিপুল ধারদেনার সঙ্গে ছিল আত্মপরিচয়ের সংকট। এ পরিস্থিতিতে মনে মনে বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন তিনি। হারানো সম্পদ ফেরত চেয়ে ব্রিটিশ সরকারের কাছে বারবার চিঠি লেখেন। কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হন। অবশেষে ১৮৮৬ সালে দিলীপ সিং কঠিন সিদ্ধান্ত নেন; সপরিবারে ভারত গিয়ে শিখধর্মে ফিরে যাবেন।

ধর্ম ও হারানো সম্পদ উদ্ধারের আশায় ব্রিটেন ত্যাগ করেন মহারাজা। কিন্তু কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি ব্রিটিশ সরকার। ইয়েমেনের এডেন বন্দর থেকে গ্রেফতার করে তাঁকে ইংল্যান্ডে ফেরত এনে গৃহবন্দি রাখা হয়। ১৮৯৩ সালে প্যারিসে মৃত্যুবরণ করেন দিলীপ সিং। দিলীপের অন্তত একটা ইচ্ছা পূরণ হয়েছিল। শেষ জীবনে খ্রিস্টধর্ম ত্যাগ করে শিখধর্মে ফেরেন। তবে ভারতের মাটিতে মৃত্যুবরণের ইচ্ছা পূরণ হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights