অযত্নে বরেন্দ্র জাদুঘর

কাজী শাহেদ, রাজশাহী

রাজশাহীর বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের বেশির ভাগ প্রত্ননিদর্শন সংরক্ষণের অভাবে রয়েছে নানান ঝুঁকির মুখে। এমনকি জায়গার অভাবে প্রদর্শন করা যাচ্ছে না মূল্যবান প্রাচীন প্রস্তর-ধাতব প্রত্নভাস্কর্য, টেরাকোটা, মুদ্রা, পাণ্ডুলিপি ও শিলালিপি। প্রদর্শনীর জায়গার অভাবে প্রায় ৯৪ ভাগ প্রত্নসম্পদ রাখা হয়েছে গুদামঘরে। সেখানে যথাযথভাবে সংরক্ষণের অভাবে এগুলো এখন নষ্টের পথে। বিশেষ করে মূল্যবান প্রাচীন পুথি সাহিত্যের পাণ্ডুলিপি নষ্ট হচ্ছে। এগুলোর ডিজিটাল কপিও নেই জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে। ফলে হাজার বছরের পুরোনো পুথিগুলো চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম। বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের পরিচালক কাজী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, এখানে রয়েছে প্রায় ১৫ শ বছরের প্রাচীন প্রস্তর ও ধাতব প্রত্ননিদর্শন, খ্রিস্টপূর্ব এবং মুসলিম ও প্রাক-মুসলিম যুগের বিভিন্ন শ্রেণির মুদ্রা, হাজার বছরের প্রাচীন পুথি সাহিত্যের পাণ্ডুলিপি। এখানে ধাতব প্রত্নভাস্কর্য, টেরাকোটা, মুদ্রা ও পাণ্ডুলিপি, ধাতবসামগ্রী এবং শিলালিপি মিলে প্রায় ১৯ হাজারের মতো প্রত্ননিদর্শন আছে। তিনি আরও জানান, এ জাদুঘরে সংরক্ষিত টেরাকোটা ৫ হাজার বছরের পুরোনো। স্বর্ণ, রৌপ্য, তাম্য ও মিশ্র ধাতুতে নির্মিত মুদ্রা আছে সাড়ে ৬ হাজারের মতো। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ থেকে ৪০০ বছর আগের রৌপ্যমুদ্রাও আছে এখানে। মিউজিয়ামে আছে প্রাচীন পুথি সাহিত্যের পাণ্ডুলিপি, যার অধিকাংশ সংস্কৃত ও আদি বাংলা ভাষায় রচিত। এর মধ্যে সংস্কৃত পুথি আছে ৩ হাজার ৯০০ আর বাংলা পুথি ১৭০০। সবচেয়ে বেশি আলোচিত তালপাতায় লেখা ও রঙিন চিত্রকর্ম শোভিত ত্রয়োদশ শতকের দুটি অষ্ট সাহস্রিকা প্রজ্ঞা পারমিতা পাণ্ডুলিপি, যা বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। জানা যায়, দেশের প্রত্ননিদর্শনের সবচেয়ে পুরোনো সংগ্রহশালা এ বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর। এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত। বাংলার প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভাস্কর্যের শ্রেষ্ঠ সংরক্ষণাগার। এখানে প্রায় ১৯ হাজারের মতো প্রত্ননিদর্শন আছে। অথচ জায়গার অভাবে জাদুঘরের ১১টি গ্যালারিতে প্রদর্শন করা হয় প্রায় ১২০০ নিদর্শন, যা সংগৃহীত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মাত্র ৬ ভাগ। বাকিগুলো রাখা হয়েছে জাদুঘরের পাঁচটি গুদামঘরে। এরই মধ্যে অনেক প্রাচীন পুথিও রাখা হয়েছে একটি গুদামঘরে। ফলে প্রাচীন এ নিদর্শনগুলো দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন দর্শনার্থীরা। আবার বদ্ধঘরে রাখার ফলে নিদর্শনের রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণ করা নিয়েও দেখা দিয়েছে সংশয়। মূল্যবান এ মিউজিয়াম রক্ষায় আছে নিরাপত্তারও ঘাটতি।

লাঠি হাতে কোটি টাকার সম্পদ পাহারা দেন এখানকার আনসার সদস্যরা। এ জাদুঘরের সূচনা ঘটে ১৯১০ সালের সেপ্টেম্বে ‘বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। দুই বাংলার ইতিহাসে এ সমিতিই প্রথম জাদুঘর কার্যক্রম শুরু করে। ‘১৮৬০ সালের ভারতীয় সমিতি আইন’ অনুযায়ী ১৯১৪ সালে এ সমিতি নিবন্ধিত হয়। ১৯১৬ সালের ১৩ নভেম্বর এ জাদুঘরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বাংলার তখনকার গভর্নর লর্ড কারমাইকেল। নির্মাণ শেষে ১৯১৯ সালের ২৭ নভেম্বর এর দ্বার উন্মোচন করেন লর্ড রোনান্ডসে। দীঘাপতিয়ার রাজবংশজাত দয়ারামপুরের জমিদার শরৎকুমার রায়, প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় এবং খ্যাতনামা নৃতত্ত্ব ও শিক্ষাবিদ রমাপ্রসাদ চন্দ্রের উদ্যোগে এ অনুসন্ধান সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৩৭ সালের ৬ নভেম্বর থেকে আধাসরকারি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হতে থাকে এটি। ১৯৪৭ সালের পরে জাদুঘরটি রক্ষণাবেক্ষণ ও টিকিয়ে রাখা অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়ে। দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা থেকে উন্নয়ন ঘটাতে ১৯৬৪ সালের ১০ অক্টোবর থেকে এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়ে আসছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights