আইসিটি ও জ্বালানিতে বিনিয়োগের আহ্বান
নিজস্ব প্রতিবেদক
আইসিটি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে জাপানি ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল জাপান সফরের প্রথম দিনে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী তাদের বলেছেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য দেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করছে সরকার। বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে জাপানি কোম্পানিগুলো। আজ মঙ্গলবার জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন তারেক রহমান। বৈঠকে ৮টি সমঝোতা স্মারক সইয়ের বিষয়ে আলোচনা চলছে। বৈঠক শেষে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করবে ঢাকা-টোকিও। চার দিনের সরকারি সফরে গতকাল সকালে জাপানের নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নাকাসোনে ইয়াসুতাকা। পরে বিমানবন্দর থেকে টোকিওর ইমপেরিয়াল হোটেলে যান তারেক রহমান। সফরকালে তিনি এই হোটেলে অবস্থান করবেন।
জাপান সফরসফরের প্রথম দিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট ড. তানাকা আকিহিকো, জাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিটির (জেবিসিসিইসি) সভাপতি ও মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যান মাসুমি কাকিনোকি ও জাপান-বাংলাদেশ সংসদীয় মৈত্রী লীগের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। মৈত্রী লীগের সভাপতি ও জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসো প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। সাক্ষাৎকালে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং উভয় দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ আরও জোরদারের ওপর গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। এ সময় জাপান-বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তারো আসো বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণের একটি বড় অংশই তরুণ। দেশটিতে বর্তমানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। এটি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এ পরিস্থিতিতে জাপানি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগে অত্যন্ত আগ্রহী।’
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে কিছু আইনি পরিবর্তনও আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার বাস্তবায়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে জাপানের অব্যাহত সহযোগিতার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। সাক্ষাৎকালে জাপানের সাবেক মন্ত্রী ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ইয়াসুতোশি নিশিমুরা, দেশটির ভূমি, অবকাঠামো, পরিবহন ও পর্যটনবিষয়ক মন্ত্রী তাতসুনোরি ইবায়াশিসহ দেশটির সংসদের সিনিয়র সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। জাইকার প্রেসিডেন্ট ড. তানাকা আকিহিকোর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার বাস্তবায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জনগণের জীবনমান উন্নয়নে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, আর্থসামাজিক অগ্রগতি ও উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষা পূরণে জাপানের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও গভীর করে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও জনগণের জীবনমান উন্নয়নে জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখা জরুরি।’ বৈঠকে জাপানের সহায়তায় চলমান বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশের বর্তমান উন্নয়ন অগ্রাধিকার বিবেচনায় জাপানের কাছ থেকে সহজ শর্তে ঋণসহায়তা অব্যাহত রাখা এবং কারিগরি সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। জবাবে জাইকার প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের সমৃদ্ধি অর্জনে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। এ সময় জাইকার সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হারা শোহেই এবং সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। জাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিটির (জেবিসিসিইসি) সভাপতি ও মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যান মাসুমি কাকিনোকির সঙ্গে পৃথক বৈঠকে অর্থনৈতিক অংশীদারি আরও সুদৃঢ় করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সাক্ষাৎকালে কাকিনোকি বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি (ইপিএ) কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ সৃষ্টির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
এসব বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক) ড. মো. শাকিরুল ইসলাম খান, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এদিকে গতকাল রাতে ইমপেরিয়াল হোটেলে এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রথম দিনে দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি উদ্ভাবন কেন্দ্র গড়ে তোলা এবং কৃষির আধুনিকীকরণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো নতুন সম্ভাবনাময় খাতে জাপানি বিনিয়োগ ও অংশীদারির আহ্বান জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও সক্ষমতা বাড়াতে জাপান সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছে। জাইকার প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে তাদের ঐতিহাসিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে এবং নতুন নির্বাচিত সরকারের অধীনে এই সম্পর্ক আরও জোরদার হবে। পরে রাতে নিপ্পন ফাউন্ডেশন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ইয়োহেই সাসাকাওয়া আয়োজিত এক নৈশভোজে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তারেক-তাকাইচি শীর্ষ বৈঠক আজ : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি আজ মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হবে। দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন তারেক রহমান। এরপর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আয়োজনে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন দুই সরকারপ্রধান। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ব্যবসা, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারসহ পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। এ ছাড়া দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ৮টি সমঝোতা স্মারক সইয়ের বিষয়ে আলোচনা চলছে। বৈঠক শেষে যৌথ বিবৃতি দিবে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, সফরে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে। দুই দেশের মধ্যে ৮টি সমঝোতা স্মারক সইয়ের বিষয়ে প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যে ৩ থেকে ৪টি সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে জাপানি সহায়তার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার পরিকল্পনা রয়েছে।
