আরেকটি এক এগারোর ষড়যন্ত্র রুখতে হবে

বিশেষ প্রতিনিধি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন একটা গুমোট পরিবেশ। ১২ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। বিএনপি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে একটি প্রতিকূল পরিস্থিতিতে। ইউনূস সরকারের অপশাসন, ভুল নীতি আর দুর্নীতির কারণে দেশের অর্থনীতি সংকটে। বেসরকারি খাত ধ্বংসের মুখে। হাজার হাজার কলকারখানা বন্ধ, লাখো শ্রমিক বেকার। ব‍্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা আর হয়রানির কারণে নতুন বিনিয়োগ বন্ধ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়েছে। মব সন্ত্রাস আর কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যে জনজীবন বিপর্যস্ত। মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বেড়ে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। প্রশাসনে অস্থিরতা, শিক্ষাঙ্গনে নৈরাজ্য, সামাজিক অস্থিরতা চরমে। এরকম একটি ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। বিএনপি সরকার গঠনের কয়েকদিনের মধ্যেই শুরু হয় ইরান যুদ্ধ। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হয়। হু হু করে বাড়তে থাকে জ্বালানি তেলের দাম। ইরান যুদ্ধ সারাবিশ্বে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে।

বিএনপি সরকার শুরুতেই এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সমস্যা এবং বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলায় সরকার সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করে। প্রধানমন্ত্রী দিনরাত পরিশ্রম করে সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট হন। এরকম পরিস্থিতি থেকে রাতারাতি উত্তরণ সম্ভব নয়-এটা সকলেই জানেন এবং বোঝেন। কিন্তু তারপরও সাত মাস বয়সী সরকারের সমালোচনায় মুখর কেউ কেউ। কোনো কোনো মহল সরকারকে অযৌক্তিক ভাবে দোষারোপ করার চেষ্টা করছে। কয়েকটি রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে ঘোষণা দিচ্ছে, সরকারকে বেশি সময় দেওয়া যাবে না। সুশীল সমাজের একটা অংশ ক্ষমতা দখলের পুরনো খেলা শুরু করেছে। এই সময় যখন দেশে সংকট সমাধানে দরকার ঐক্য এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, ঠিক তখনই দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে। এই লক্ষণগুলো এদেশের জনগণের কাছে পরিচিত। দেশে গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত করতে, বিরাজনীতিকরণের জন্য কৃত্রিমভাবে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা অতীতেও হয়েছে। এরকম পরিস্থিতি তৈরি করেই ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত সুশীল সরকার ক্ষমতায় এসেছিল।

এ রকম একটি পরিস্থিতি হঠাৎ করেই হচ্ছে, নাকি উদ্দেশ্যমূলকভাবে তৈরি করা হচ্ছে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে হলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে। আমরা যদি ২০০৬ সালের বাংলাদেশের চিত্র দেখি, তাহলে সেই চিত্রের সঙ্গে আজকের বাংলাদেশের চিত্রটি অনেকটাই মিলে যায়। ২০০৬ সালের শেষ দিকে রাজনৈতিক দলগুলোকে মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছিল। রক্তক্ষয়ী সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েছিল তারা ক্ষমতার জন্য। দেশজুড়ে রাজপথ, রেলপথ অবরোধ, নানা রকম কর্মসূচির মাধ্যমে ব্যবসাবাণিজ্য অচল করে দেওয়া হয়েছিল। ওই সময় সুশীলরা দুই পক্ষের বিরোধ উসকে দেওয়ার জন্য আদাজল খেয়ে নেমেছিলেন। টেলিভিশনে, সংবাদপত্রে তাঁদের বিভেদজাগানিয়া লেখা এবং কথা জাতিকে বিভ্রান্ত করেছিল। রাজনৈতিক দলগুলোকে সমঝোতার বদলে সংঘাতের পথে প্ররোচিত করেছিল একটি মহল। উদ্দেশ্য ছিল দেশে জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি। আর এ সুযোগেই ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে এক-এগারো সরকার ক্ষমতা দখল করে। এক-এগারো সরকার ক্ষমতা দখল করেই বাংলাদেশকে ধ্বংসের এবং বিরাজনীতিকরণের যে কার্যক্রম শুরু করে, তা থেকেই বোঝা যায় যে ২০০৬ সালের শেষ দিক থেকে যে ঘটনাগুলো বাংলাদেশে ঘটেছিল, সবই ছিল পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। একটি নীলনকশার সুনিপুণ বাস্তবায়ন। এবারও কি সে রকম ঘটনাই হচ্ছে?

বাংলাদেশের সুশীল সমাজ সুযোগ পেলেই ক্ষমতায় বসতে চায়। এজন্য তারা রাজনৈতিক বিভাজন সৃষ্টি করে, রাজনৈতিক সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলে। কিন্তু বাংলাদেশে দু’টি সুশীল সরকারের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়।

২০০৭ সালে ড. ফখরুদ্দীনের নেতৃত্বে এক-এগারো সরকারের তিনটি এজেন্ডা ছিল। প্রথম লক্ষ্য ছিল রাজনীতির মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি এবং বিভাজন সৃষ্টির মাধ্যমে সন্ত্রাস, সহিংসতা উসকে দেওয়া। যেন রাজনীতি সম্পর্কে মানুষের অনীহা তৈরি হয়। এক-এগারো সরকারের দ্বিতীয় এজেন্ডা ছিল অর্থনীতি ধ্বংস করা। দেশ পরনির্ভর, বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীল করা। যেন দাতাদের ক্রীতদাস হয়ে চলতে আমরা বাধ্য হই। বাংলাদেশে যেসব দেশপ্রেমিক ব্যবসায়ী-শিল্পোদ্যোক্তা কোটি মানুষের কর্মসংস্থান করেন, তাদের হয়রানি করা, নানা রকম মিথ্যা মামলা, মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে তাদের ইমেজ নষ্ট করাই ছিল এক-এগারো কুশীলবদের মিশন। অর্থনীতি যেন স্থবির এবং ধ্বংস হয়ে যায়। তৃতীয়ত. দীর্ঘমেয়াদি বিদেশিদের অনুগত, সুশীল সমাজের শাসন প্রতিষ্ঠা। দেশ জনগণের ইচ্ছায় নয়, জনগণের স্বার্থে না, চলবে বিদেশি প্রভাবশালীদের প্রেসক্রিপশনে। সুশীল শাসকরা হবেন বিদেশি প্রভুদের ‘বিশ্বস্ত ম্যানেজার’।

এবার আমরা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থানটা একটু বিশ্লেষণ করে দেখতে চাই ২০০৭ সালের ফখরুদ্দীন সরকারের কর্মকাণ্ডের আলোকে। ড. ফখরুদ্দীন আহমদের সরকার যেভাবে বিরাজনীতিকরণের প্রক্রিয়া শুরু করেছিল, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজন সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল, ঠিক একই কাজ করেছিল ইউনূস সরকার।

ড. ইউনূস যে ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’ গঠন করে তার প্রধান লক্ষ্য ছিল ঐক্যের জায়গা খোঁজার বদলে চিরস্থায়ী রাজনৈতিক বিভেদ সৃষ্টি। জুলাই সনদ নিয়ে ইউনূস সরকারের প্রতারণা, এবং কর্তৃত্ব বহির্ভূত ভাবে গণভোট দেশে অমীমাংসিত রাজনৈতিক ইস্যু সৃষ্টি করেছে। ইউনূস সরকারের সংবিধান সংস্কারের কোন আইনগত বৈধতা ছিল না। কারণ, সংবিধানের সংশোধন সংসদ ছাড়া আর কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কিন্তু ইউনূস ইচ্ছাকৃত ভাবে সংবিধানের মৌলিক সংশোধনী নিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করে। একারণেই এখন কারণেই বিএনপি, এনসিপি এবং জামায়াত মুখোমুখি।

জামায়াত, এনসিপি আন্দোলন করছে। প্রশ্ন হলো, ইউনূস কেন এটা করলেন? কারণ খুবই পরিষ্কার। ইউনূস চেয়েছিলেন দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে। তিনি নিজেই বলেছিলেন জনগণ চায় তার সরকার যেন ৫০ বছর ক্ষমতায় থাকে। কিন্তু সীমাহীন দুর্নীতি, অযোগ্যতা এবং অপশাসনের কারণে জনগণের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মহলের চাপে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইউনূস নির্বাচন দেন। কিন্তু বাংলাদেশে গণতন্ত্র এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা যেন না হয় সেজন্যই ইউনূস সংবিধান সংশোধনীর কিছু উদ্ভট প্রস্তাব রেখে যান। এখন বিরোধী দলগুলো ইউনূসের পাতানো ফাঁদে পা দিয়েছে। তারা বুঝে না বুঝে অসময়ে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। আন্দোলন থেকে ফায়দা লুটবে ক্ষমকালোভী সুশীলরা। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে বুঝতে হবে, সরকার কেবল যাত্রা শুরু করেছে। গণতন্ত্রে পারস্পরিক আলাপ আলোচনার মাধ্যমে যেকোনো সমস্যার সমাধান করা যায়। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। বিরোধীদলের নেতারা যদি একটু সচেতন ভাবে লক্ষ্য করেন তাহলে দেখবেন, সুশীল সমাজের যারা একটি নতুন সরকারের দোষ খুঁজতে মরিয়া তারা সবাই ইউনূস সরকারের সুবিধাভোগী। এরা দেড় বছর ইউনূস সরকারের কোনো সমালোচনা করে নাই। বাংলাদেশে আবার একটা অনির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতায় বসানোর যে চক্রান্ত চলছে তার অংশীদার কেন রাজনৈতিক দলগুলো হবে?

সরকারকেও এই বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। জনগণকে সচেতন করতে হবে। সবাইকে অনুধাবন করতে হবে যে, একটি অনির্বাচিত সরকারের চেয়ে একটি নির্বাচিত সরকার অনেক ভালো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights