ইন্টারনেট ক্যাবল কাটার হুমকি ইরানের, ঝুঁকিতে ব্যাংকিং ও ইন্টারনেট ব্যবস্থা

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালির তলদেশ দিয়ে যাওয়া ইন্টারনেট ক্যাবল কেটে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে ইরান। দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) মুখপাত্র জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি সমুদ্রের তলদেশে থাকা এসব যোগাযোগ ক্যাবলকে সংঘাতের ‘নতুন লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ক্যাবলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা, আর্থিক লেনদেন, স্বাস্থ্যসেবা ও সাধারণ ইন্টারনেট যোগাযোগে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।

জেনারেল মোহেব্বি বলেন, হরমুজ প্রণালির তলদেশ দিয়ে সাতটি বড় যোগাযোগ ক্যাবল গেছে। ইন্টারনেট ও বাণিজ্যিক তথ্যের আদান-প্রদানের বড় অংশ এসব ক্যাবলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু তাদের জানাতে চাই, নতুন লক্ষ্যবস্তু ও নতুন অস্ত্রের আবির্ভাব ঘটবে।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে আবারও হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছেন। এরই মধ্যে আইআরজিসি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ১৫ হাজার ৫০০ মাইল দীর্ঘ একটি যোগাযোগ ক্যাবলের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে। বর্ণনাটি এশিয়া-আফ্রিকা-ইউরোপ-১ (এএই-১) ক্যাবলের সঙ্গে মিলে যায়। ক্যাবলটি ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারে সংযুক্ত হয়েছে।

তেহরানে অবস্থানরত এক ইরানি কর্মকর্তা দ্য টেলিগ্রাফকে জানিয়েছেন, যুদ্ধ চলাকালে একাধিকবার ক্যাবলটি কেটে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে পুরো বিশ্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা এবং নতুন শত্রু তৈরি করার ঝুঁকি এড়াতে এখন পর্যন্ত এ ধরনের হামলার নির্দেশ দেওয়া হয়নি। তবে ট্রাম্প সংঘাত আরও বাড়ালে ক্যাবল কেটে দেওয়ার বিষয়টি একটি বিকল্প হিসেবে বিবেচনায় থাকতে পারে।

আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের তলদেশে বিস্তৃত ১০ লাখ মাইলের বেশি যোগাযোগ ক্যাবলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক তথ্য আদান-প্রদানের ৯৯ শতাংশেরও বেশি সম্পন্ন হয়। ফলে এসব ক্যাবল বৈশ্বিক যোগাযোগব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।

লন্ডনের কিংস কলেজের যুদ্ধ ও কৌশলবিষয়ক অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজির সহপরিচালক আলেসিও পাতালানো বলেন, ইরানের হুমকিকে প্রযুক্তিগতভাবে বাস্তবসম্মত বলে বিবেচনা করা যায়, যদিও বিষয়টি নিয়ে অনেকের ধারণা স্পষ্ট নয়।

তার মতে, হরমুজ প্রণালির সাতটি ক্যাবলই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে ইন্টারনেট সেবা সীমিত ও অনিয়মিত হয়ে পড়তে পারে। আর্থিক লেনদেন ধীর হয়ে যাবে এবং ইরানের অভ্যন্তরেও তথ্য আদান-প্রদানে বিঘ্ন ঘটবে। দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন তথ্যপ্রবাহের ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য দেশের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এদিকে এ ধরনের হামলায় বিদেশি প্রযুক্তিগত সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি অধ্যাপক পাতালানো। তাঁর মতে, ইরানের ড্রোনসহ বিভিন্ন ব্যবস্থায় ইতিমধ্যে চীন ও রাশিয়ার তৈরি যন্ত্রাংশ রয়েছে। দেশ তিনটির মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতার ব্যবস্থাও প্রতিষ্ঠিত।

তবে রাশিয়া বা চীন তাদের সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি ইরানের সঙ্গে ভাগাভাগি করবে কি না, সে বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।

ইরানের হুমকিকে গুরুতর হিসেবে উল্লেখ করে পাতালানো সতর্ক করেন, বিষয়টিকে শুধু ক্যাবল চালু থাকা বা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রশ্ন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তাঁর ভাষায়, ‘এটি কোনো সুইচ নয়।’ অর্থাৎ, ক্যাবলের আংশিক ক্ষতি, তথ্যপ্রবাহের গতি কমে যাওয়া কিংবা বিকল্প পথে যোগাযোগ পরিচালনার প্রয়োজনও বৈশ্বিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights