ইয়াসের-তাবিথের ‘মাস্টারস্ট্রোকে’ কাটল বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ব্ল্যাকআউটের শঙ্কা

অনলাইন ডেস্ক

বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই বাঙালির রাত জেগে উন্মাদনা, পাড়ায় পাড়ায় প্রিয় দলের পতাকা ওড়ানো আর চায়ের কাপে ঝড় তোলা। অথচ বিশ্বমঞ্চের লড়াইয়ের কাছাকাছি সময়েও দেশের কোটি ফুটবলপ্রেমীর কপালে দেখা দিয়েছিল চিন্তার ভাঁজ। প্রশ্ন উঠেছিল, এবার কি তবে টেলিভিশনে দেখা যাবে না ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ?

সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে স্বস্তির খবর এসেছে। বিশ্বকাপ দেখতে পাবে বাংলাদেশ, বিষয়টি এখন পুরোপুরি নিশ্চিত। আর এই ‘ব্ল্যাকআউট’ বা খেলা দেখতে না পাওয়ার শঙ্কা দূর করার পেছনে যিনি সবচেয়ে বড় ‘মাস্টারস্ট্রোক’ খেলেছেন, তিনি হলেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। তাঁর দূরদর্শী সিদ্ধান্ত এবং বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়ালের সহায়তায় খাদের কিনারা থেকে আলোর মুখ দেখেছে বাংলাদেশের কোটি ফুটবল ভক্ত।

ঘটনার সূত্রপাত গত কয়েক সপ্তাহ আগে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্প্রিংবক পিটিই লিমিটেড প্রাথমিকভাবে ফিফার কাছ থেকে বাংলাদেশের মিডিয়া স্বত্ব পেয়েছিল। কিন্তু বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে কেনা এই স্বত্ব তারা স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে ব্যর্থ হয় এবং শেষ মুহূর্তে এসে চুক্তিটি সমর্পণ করে। ফলে বিশ্বকাপ শুরুর দুই সপ্তাহেরও কম সময় আগে দেশটিতে কোনো ব্রডকাস্টার বা সম্প্রচারকারী মাধ্যম ছিল না। বিশাল অঙ্কের আকাশচুম্বী দাম, সীমিত বাণিজ্যিক সুযোগ এবং ম্যাচের প্রতিকূল সময়ের কারণে স্থানীয় কোনো ব্রডকাস্টারই এই স্বত্ব কিনতে সাহস বা আগ্রহ দেখাচ্ছিল না।

কিন্তু কোটি মানুষের এই আবেগ ও প্রত্যাশাকে মাঠেই ভেস্তে যেতে দিতে রাজি হননি তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। মন্ত্রণালয় থেকে এই সংকট সমাধানের পুরো উদ্যোগের নেতৃত্ব দেন তিনি।

মন্ত্রণালয়ের জরুরি তোড়জোড়ের মাঝেই পাশে এসে দাঁড়ান নবনির্বাচিত বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল। এই চুক্তি সফল করার পেছনে ফিফার সঙ্গে সরাসরি সেতু বন্ধন তৈরিতে তাবিথ আউয়াল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সহায়ক ভূমিকা পালন করেছেন।

ফিফার সঙ্গে চুক্তি নিয়ে তাবিথ আউয়াল বলেন, ‘বিষয়টি বাফুফে সংক্রান্ত নয়; বরং বাফুফে সভাপতি হিসেবে ফিফাই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। বিটিভিসহ (বাংলাদেশ টেলিভিশন) স্থানীয় অংশীজনদের (স্টেকহোল্ডার) সঙ্গে যেন একটি ফলপ্রসূ যোগাযোগ বা সমন্বয় তৈরি করা যায়, সেই লক্ষ্যেই তারা আমার দ্বারস্থ হয়।’

বাফুফে সভাপতি আরও যোগ করেন, ‘বাংলাদেশে যদি বিশ্বকাপ ফুটবল সঠিকভাবে সম্প্রচার করা না হতো, তা দেশের কোটি ফুটবল ভক্ত এবং সাধারণ মানুষের জন্য চরম হতাশাজনক হতো। একই সঙ্গে এটাও সত্যি, যদি সবচেয়ে যৌক্তিক বাণিজ্যিক শর্ত মেনে এই সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা না যায়, তা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জন্যই একটি যৌথ ব্যর্থতা হিসেবে গণ্য হবে।’

পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করে মন্ত্রণালয় ও বাফুফে যৌথভাবে কোমর বেঁধে মাঠে নামে। একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, তাঁরা একসঙ্গে বিভিন্ন স্পোর্টস চ্যানেল, জাতীয় মিডিয়া হাউস, টেলিকম সংস্থা এবং বেশ কয়েকটি ওটিটি (ওটিটি) প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং ডিজিটাল ও টেলিকম টাই-ইনের মতো নতুন আয়ের উৎসগুলো চিহ্নিত করেন, যা আগের কোনো বিশ্বকাপ চক্রে কখনো অন্বেষণ করা হয়নি।

মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান স্পষ্ট জানান, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল বিটিভিকে কোনো ধরনের লোকসানের মুখে না ফেলেই তাঁরা এই চুক্তিটি সম্পন্ন করতে পেরেছেন। অতীতের ‘অস্বচ্ছ’ ও চড়া দামের বাজারকে পাশ কাটিয়ে কীভাবে দেশের টাকা বাঁচানো গেছে, তার বিশদ বিবরণ দেন তিনি।

ইয়াসের বলেন, ‘আমরা যখন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করি, তখন ফিফা বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব নিয়ে একটি অদ্ভুত গোলকধাঁধা তৈরি হয়েছিল। ফিফার কাছ থেকে স্বত্ব কেনা একটি প্রতিষ্ঠান প্রাথমিকভাবে আমাদের কাছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা দাবি করেছিল। এটি ছিল করদাতাদের টাকার ওপর একটি বড় ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা। কিন্তু আমরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলাম—শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের দল, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সৈনিকেরা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় জনগণের টাকার অপচয় বা কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাশত করবে না। ফলস্বরূপ, সেই অযৌক্তিক ক্রয়ের প্রস্তাবটি পাস হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের সরকার একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করছে—যেখানে অন্যায়, দুর্নীতি এবং কর্তৃত্ববাদী মানসিকতার কোনো স্থান নেই। দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই আপসহীন অবস্থান এবং জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার ত্যাগের অনুপ্রেরণা আসে আমাদের নেতা, এ দেশের কোটি তরুণের স্পন্দন, যুবসমাজের অহংকার—মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্ব থেকে। তিনি আমাদের স্পষ্টভাবে শিখিয়েছেন যে যেকোনো মূল্যে জনগণের আমানত রক্ষা করতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনকল্যাণে নিয়োজিত করতে হবে।’

প্রতিমন্ত্রী জানান, অতীতের জটিলতা ভেঙে সরাসরি বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে কথা বলার কারণেই এসেছে এই অভূতপূর্ব সাফল্য। তিনি বলেন, ‘তাঁর নির্দেশনায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এই ফিফা বিষয়ে দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সরাসরি ফিফার সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেয়। এই প্রক্রিয়ায় আমরা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি তাবিথ আউয়ালকে সম্পৃক্ত করি। দিনের পর দিন ম্যারাথন বৈঠক, জটিল আলোচনা এবং কঠোর দরকষাকর্ষির মাধ্যমে আমরা একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছি। কর্তৃত্ববাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের সততা এবং জনগণের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার এটি একটি বড় বিজয়।’

সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের করা এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বিগত সরকারের আমলে হওয়া চুক্তির উদাহরণ টেনে আনেন। তাঁর মতে, আগে যেখানে বিটিভি কোটি কোটি টাকা খরচ করেও কোনো মুনাফা তুলতে পারেনি, এবার সেখানে এক টাকাও লোকসান গুনতে হবে না রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে।

তীব্র যুক্তি দিয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে ইয়াসের বলেন, ‘বিটিভি আরও বেশি ব্যবসা করতে পারত বলতে কী বোঝাচ্ছেন? তারা বিটিভি-কে ২০০ কোটি টাকার প্রস্তাব দিচ্ছিল—তার মানে এই নয় যে তারা এটি ২০০ কোটি টাকায় কিনেছিল। বিষয়টি আপনাদের বুঝিয়ে বলি—এটি আসলে খুব ভালো একটি প্রশ্ন, যদিও আমি এটির উত্তর আপনার প্রত্যাশার চেয়ে ভিন্নভাবে দেব। গতবার বিটিভি ৯৬ কোটি টাকায় স্বত্ব কিনেছিল—বিটিভি কত টাকা লাভ করেছিল? জিরো (শূন্য)। বিগ জিরো। ডাবল জিরো। ট্রিপল জিরো। এবার কি বিটিভি-কে শেষ পর্যন্ত কোনো টাকা দিতে হবে? বিটিভি-র কি কোনো খরচ হবে? না। তাহলে পার্থক্যটা নিজেই বুঝতে পারছেন।’

সহজ একটি উদাহরণ দিয়ে দুর্নীতির চক্রটি ব্যাখ্যা করেন ইয়াসের, ‘২০০ কোটি টাকার প্রস্তাবটি বিটিভির উপার্জনের জন্য ছিল না। তারা বলছিল বিটিভি ২০০ কোটি টাকায় কিনবে—কিন্তু আসল ব্যবসাটা করবে অন্য কেউ। তারা লাভ নিয়ে চলে যেত, আর বিটিভির ঝুলিতে থাকত শূন্য। তা হতে পারে না। বিষয়টি এভাবে ভাবুন, এই ফোনের একটি নির্দিষ্ট মূল্য আছে—ধরুন ১ হাজার টাকা। আপনি এটি যার কাছেই বিক্রি করুন না কেন, এর চেয়ে বেশি পাবেন না। আপনি যদি এটি আমার কাছে ৫০০ টাকায় বিক্রি করেন এবং আমি অন্য কারও কাছে যাই, তারা কি ১ হাজার টাকার বেশি দেবে? সুতরাং, বিটিভিকে দিয়ে ২০০ কোটি টাকায় কিছু কেনানো আর অন্য কেউ ব্যবসা করে লাভ নিয়ে যাওয়া—এতে বিটিভি-র হাত খালিই থাকে। আমরা জনগণের টাকার অপচয় এবং দুর্নীতি বন্ধ করেছি।’

এই যৌথ আলোচনার চূড়ান্ত ফল দাঁড়িয়েছে অত্যন্ত ইতিবাচক। ৩টি জাতীয় টেলিভিশনের সমন্বয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে এখন নিশ্চিত হয়েছে সম্প্রচার স্বত্ব।

প্রতিমন্ত্রী অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে চুক্তির ফাইনাল সংখ্যাটি প্রকাশ করে বলেন, ‘আজ আমি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করছি যে—অতীতে প্রায় ১০০ কোটি টাকা লুটের গন্ধ থাকা প্রাথমিক ২০০ কোটি টাকার দাবির ফাঁদ এড়িয়ে, আমরা অত্যন্ত সাশ্রয়ী ও যুক্তিসঙ্গত মূল্যে ফিফার সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছি।’

তিনি টাকার হিসাব দিয়ে বলেন, ‘একটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এবং বাংলাদেশের নীতিমালা অনুযায়ী, এ বছরের ফুটবল বিশ্বকাপ সম্প্রচারের চূড়ান্ত চুক্তিমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ৩৮.৫ লাখ মার্কিন ডলার—যা বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ৪৭ কোটি টাকা।’

সবচেয়ে স্বস্তির জায়গা হলো, এই ৪৭ কোটি টাকা বিটিভিকে তার নিজের তহবিল থেকে দিতে হচ্ছে না। বিভিন্ন স্পনসরশিপ ও উপ-স্বত্ব বিক্রির মাধ্যমেই এই টাকা উঠে আসবে।

জনগণকে আশ্বস্ত করে ইয়াসের বলেন, ‘জনগণের জন্য সুখবর— এবং আমি আবারও বলছি, জনগণের জন্য সুখবর হলো, বিটিভিকে এই টাকা নিজে দিতে হবে না। এর অর্থ হলো, নীতিমালা অনুযায়ী বিজ্ঞাপন এবং টেলিকম কোম্পানি, স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর কাছে স্বত্ব বিক্রি করে আমরা প্রায় পুরো অর্থই তুলে নিতে সক্ষম হয়েছি। বিটিভি নামমাত্র খরচে ফিফা ২০২৬ সম্প্রচার করবে। এই খরচ শুধু আগের সরকারের আমলের চেয়ে কমই নয়—এটি প্রমাণ করে যে উদ্দেশ্য যদি সৎ হয়, তবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা যে সততা দেখিয়েছি, তা দিয়ে দেশের টাকা বাঁচানো এবং জনগণকে বিশ্বের সেরা সেবা দেওয়া সম্ভব।’

যেকোনো করপোরেট ও পলিসি মেকিংয়ের মাপকাঠিতে এই সমঝোতা ছিল একটি অবিশ্বাস্য ‘মাস্টারস্ট্রোক’। যার হাত ধরে কোনো লোকসান ছাড়াই, সম্পূর্ণ সাশ্রয়ী মূল্যে বাংলাদেশের ড্রয়িংরুম ও ডিজিটাল স্ক্রিনে পৌঁছাতে যাচ্ছে ফুটবলের বিশ্বমঞ্চ। আর এই পুরো দৃশ্যপটের নেপথ্য কারিগর হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করলেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসির খান চৌধুরী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights