এপার থেকে পাচার হচ্ছে মানুষ ওপার থেকে আসছে মাদক

নজরুল মৃধা, রংপুর

কুুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার কচাকাটা থানার সোভাকুটি এলাকার মো. হাফেজ উদ্দিনের ছেলে মোজাফ্ফর হোসেনকে (২২) স্থানীয় এক ব্যক্তি (দালাল চক্রের সদস্য) প্রলোভন দেখায় তাকে (মোজাফফ্্র) ভারতে নিয়ে যাবে। সেখানে খুব কম দামে গরু কিনে দেবে। ওই গরু বাংলাদেশে বিক্রি করলে দ্বিগুণ লাভ হবে। দালালের প্রলোভনে পড়ে ভারতের আসামে যান। সেখানে যাওয়ার পর আসাম পুলিশের হাতে ধরা পড়লে গোয়ালপাড়া জেলে মোজাফ্ফর হোসেনকে রাখা হয়। ৩৩ মাস কারাভোগের পর ১৮ সেপ্টেম্বর ভারতীয় বিএসএফ কুড়িগ্রাম বিজিবির কাছে তাকে হস্তান্তর করে। পরে তাকে তার বড় ভাই রুহুল আমিনের জিম্মায় দেওয়া হয়।

মোজাফ্ফর বলেন, তিনি খপ্পরে পড়ে গরু আনতে ভারতে গিয়ে আটকা পড়েন। তার মতো তার উপজেলায় একাধিক ব্যক্তি গরু আনতে, অথবা কাজের সন্ধানে ভারতে যান করেন। সেখানে কাউকে জোর করে ইটভাটার শ্রমিক, দর্জি শ্রমিক হিসেবে কাছে লাগানো হয়। অনেকে আবার পুলিশের হাতে ধরা পড়ে জেলে যান। তিনি বলেন কচাকাটা থানার আবদুল জলিল (২৯) নামে একজন ভারতে ধরা পড়ার পরে জেল খেটে বাংলাদেশে এসেছেন। তিনিও দালালের মাধ্যমে গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

শুধু মোজাফফ্্র নন, রংপুর বিভাগের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত তরুণ-তরুণী দালারের খপ্পরে পড়ে ভারতে পাচারের শিকার হন। বাংলাদেশ প্রতিদিনের অনুসন্ধানে এ ধরনের অনেক ব্যক্তির হদিস পাওয়া গেছে যারা ভারতে পাচার হয়ে আটকা পড়েছেন। আবার এই দালাই চক্রই মানুষ পাচারের বিনিময়ে নিয়ে আসছে মাদক। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রংপুর বিভাগের শতাধিক স্পট দিয়ে ফেনসিডিল, এস্কাফ, গাঁজা, ইয়াবাসহ বিভিন্ন প্রকার মাদক দেশে আসছে। আর তার প্রধান টার্গেট তরুণ-কিশোররা। এ অবস্থায় চিন্তিত হয়ে পড়েছে এ অঞ্চলের মানুষ।

অনুসন্ধানে পাচার হওয়া আরেকজনের পরিচয় জানা গেছে। তিনি ঢাকার ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা। ২৫ বছরের ওই গৃহবধূ ভালো চাকরির প্রলোভনে ভারতে গিয়েছিলেন। আসামে ২৮ মাস কারাভোগের পর তাকে বিএসএফ কুড়িগ্রামে বিজিবির কাছে হস্তান্তর করে। পরে তাকে নাগেশ্বরী থানায় হস্তান্তর করা হলে সেখানে তাকে দেবর ইমন আহমেদ জিম্মায় দেওয়া হয়। ইমন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কী কারণে ভারত গিয়েছিলেন এসব না জানাই ভালো। ওই তিক্ত অভিজ্ঞাতা প্রকাশ করা ঠিক না। আসামের গোয়ালপাড়া জেলে ভাবি রয়েছেন এমন খবর পেয়ে পাাসপোর্ট করে তার সঙ্গে জেলখানায় দেখা করেছি। এর পর আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তাকে ফিরিয়ে আনতে ৩ লাখ টাকার বেশি খরচ হয়েছে। ইমন আহমেদ আরও বলেন, আসামের জেলে ঢাকার যাত্রাবাড়ীর সুফিয়া বেগম নামে আরেকজন নারী রয়েছেন। পারলে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনুন।

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার সীমান্তবর্তী গোতামারি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মুনাব্বিরুল ইসলাম মনা বলেন, এক সময় দালালদের চক্করে পরে প্রচুর বাংলাদেশি ভালো চাকরির লোভে ভারতে যেত। তাদের অনেকে পুলিশের হাতে আটক হয়ে জেল খাটত। তিনি জেনেছেন, অনেক নারীকে ভারতে থেকে এই দালাল চক্র অন্য দেশে পাচার করত। তিনি আরও বলেন, এক সময় তার ইউনিয়ন থেকেও মানুষ যেত। তবে এখন সেই প্রবণতা কিছুুটা কমেছে।

রংপুর বিজিবি সেক্টর কমান্ডার কর্নেল রুবায়েত বলেন, প্রতি বছর বিভিন্ন প্রলোভনে পড়ে নারী, শিশু, পুরুষ পাচার হচ্ছে। এদের অনেকে ধরা পড়ে জেলে থাকেন। রাষ্টীয় পর্যায়ে আলোচনা হলে আটক কিংবা জেলে থাকার বিষয়টি প্রকাশ পায়। কী পরিমাণ মানুষ ভারতীয় জেলে রয়েছেন-এমন প্রশ্নর উত্তরে তিনি বলেন, এসব তথ্য জোগার করা সময়ের ব্যাপার।

গত ১৬ সেপ্টেম্বর বেনাপোল দিয়ে ভারতে কারাভোগ শেষে বিশেষ ট্রাভেল পারমিটের মাধ্যমে পাচার হওয়া ১৮ বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। ফেরত আসা বাংলাদেশিদের বাড়ি যশোর, খুলনা, পঞ্চগড়, সাতক্ষীরা, ঠাকুরগাঁও, গোপালগঞ্জ, বরিশাল, নরসিংদী, চট্টগ্রাম, দিনাজপুর ও লালমনিরহাটের বিভিন্ন এলাকায়। এভাবেই প্রতিনিয়ত পাচার হচ্ছে নারী, শিশু ও পুরুষ। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তি বলেন, মাদক নির্মূলে পুলিশ জিরো টলারেন্স ভূমিকা পালন করছে। মাদক সেবনকারী ও ব্যবসায়ী কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights