এলাকায় ব্যস্ত মন্ত্রী-এমপিরা
শফিউল আলম দোলন
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে স্ব-স্ব নির্বাচনি এলাকায় জনস্বার্থে নানা কার্যক্রম গ্রহণ করেছেন বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্যরা। বর্তমানে অধিকাংশ সংসদ সদস্যই নিজেদের এলাকায় গৃহীত কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। সম্প্রতি বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় সংসদ সদস্যদের প্রতিটি এলাকায় চাঁদাবাজি, দখলদারি বন্ধসহ সার্বিক আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে শক্ত অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দলীয় চেয়ারম্যানের নির্দেশের পরই পর্যায়ক্রমে এলাকায় চলে গেছেন তাঁরা। এলাকায় এখন ব্যাপক কর্মব্যস্ততায় দিন কাটাচ্ছেন সংসদ সদস্যরা। দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি সরকার ও দেশবিরোধী চক্রান্তকারীদের নাশকতার ছক যেন কোনোভাবেই বাস্তবায়নে কোথাও মব সৃষ্টি না করতে পারে, সে ব্যাপারে সতর্ক অবস্থায় রয়েছেন তাঁরা। দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থানরত মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরই মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় যাতায়াত বাড়িয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে দুর্গাপূজার ছুটিতে অধিকাংশ সংসদ সদস্যই এখন এলাকায় অবস্থান করছেন। হিন্দু সম্প্রদায় যাতে নির্বিঘ্নে শারদীয় দুর্গোৎসব উদ্যাপন করতে পারে সে ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে দলীয় নেতা-কর্মীদের নির্দেশনা দিচ্ছেন। একই সঙ্গে মন্ত্রী-এমপিরাও পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শুরু করেছেন। কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের এমপি ও প্রতিমন্ত্রী শরিফুল আলম, কিশোরগঞ্জ-১ আসনের মো. মাজহারুল ইসলাম, সিরাজগঞ্জ-৫ আসনের আমিরুল ইসলাম আলীম, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের মাসুদুজ্জামান, রাজশাহী-৩ আসনের মোহাম্মদ শফিকুল হক মিলন, রাজশাহী-৫ আসনের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, সিলেট-২ আসনের তাহসিনা রুশদির লুনা, ফরিদপুর-৪ আসনের এমপি শহিদুল ইসলাম বাবুল প্রমুখ কর্মব্যস্ততায় সময় কাটাচ্ছেন।
দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (ঢাকা বিভাগ) ও মুন্সিগঞ্জ-২ আসনের এমপি অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম আজাদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমান আমাদের কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী কোনো নেতা-কর্মী, এমপি-মন্ত্রী অপকর্মে জড়ালে তাঁকে বা তাঁদের কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। প্রতিটি এলাকা সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত করা হবে। আমরা আমাদের নেতার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালনের চেষ্টা করছি।’ ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও) আসনের এমপি আখতারুজ্জামান বাচ্চু বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সামগ্রিকভাবে দেশের আইনশৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় দলের প্রত্যেক সংসদ সদস্যকে নিজ নিজ এলাকায় জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে শক্ত অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেন। এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি ফ্যাসিস্টদের দোসর ও গুপ্ত-সুপ্তরা যাতে কোনোরকমের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করতে পারে সে ব্যাপারে কঠোর দৃষ্টি রাখতে হবে। গত আট মাসে সরকার অনেক জনবান্ধব কাজ করেছে, সেগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। আমরা সেই নির্দেশনাগুলো পালনের চেষ্টা করছি। তা ছাড়া এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা উদ্যাপনে আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করছি। আর কোনো মব সৃষ্টিকারী অথবা দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বা চক্রান্তকারীর স্থান হবে না আমার নির্বাচনি এলাকায়।’ সংসদীয় দলের সভায় দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলার অবনতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। দলের নেতা-কর্মী ও সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের কঠোর বার্তা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘কোনো নেতা-কর্মী, এমপি-মন্ত্রী অপকর্মে জড়ালে তাঁকে বা তাঁদের বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। প্রতিটি এলাকা সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত করতে হবে।’ এ ছাড়া ডেঙ্গু প্রতিরোধে এলাকায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, হিন্দুধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে উদ্যাপন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের পাশাপাশি যেকোনো মূল্যে দলীয় ঐক্য বজায় রাখার নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। সর্বোপরি ফ্যাসিস্টদের দোসর ও গুপ্ত-সুপ্তরা এক হয়ে দেশ ও সরকারের বিরুদ্ধে যেসব ষড়যন্ত্র করছে, তার বিরুদ্ধে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে শক্ত অবস্থান গ্রহণেরও নির্দেশ দেন বিএনপি প্রধান। জানা যায়, স্থানীয় নির্বাচন কেন্দ্র করে এখন থেকে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী বাছাই করার পাশাপাশি নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়ার ব্যাপারেও বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী। তবে স্বৈরাচারের কোনো দোসর বা সমর্থককে যেন কিছুতেই প্রার্থী না করা হয়। এ ছাড়া দুর্গাপূজাসহ সব সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশে থাকার পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী। ‘একটি মহল দেশের বিশেষ বিশেষ জায়গায় সহিংসতা ও মব তৈরি করছে’ অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এভাবে তারা বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়।’ এ ব্যাপারে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সব এমপিকে এলাকায় ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এদের সম্পর্কে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে প্রত্যেক এমপিকে। কারণ এরা সুযোগ পেলে যেকোনো সময় যেকোনো স্থানে বড় ধরনের অঘটন ঘটাতে পারে।’ প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় হাইকমান্ডের এমন বার্তা পাওয়ার পরই রাজধানী ছাড়েন বেশির ভাগ সংসদ সদস্য।
কুমিল্লা-২ আসনের এমপি অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাদের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে নিজ নিজ এলাকার সমস্যা সমাধানে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আপনারা জনগণের সঙ্গে থাকুন, জনগণের সঙ্গে কাজ করুন, জনগণের জন্য কাজ করুন; যাতে জনগণ সন্তুষ্ট থাকে। দলের সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করারও তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আমরা নিজ নিজ এলাকায় সেভাবেই কাজ করার চেষ্টা করছি।’
জানা যায়, আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনসহ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সারা দেশে দলীয় প্রতিনিধিদের বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। সাম্প্রতিক সময়ে দলের কতিপয় নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে দখল, চাঁদাবাজি ও অনিয়মের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নিয়ে নির্বাচনি এলাকায় ফিরে যান সংসদ সদস্যরা।
শৃঙ্খলা রক্ষায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি : দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও দলীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক নানা শৃঙ্খলাবিরোধী অভিযোগ সম্পর্কে কঠোর অবস্থান নেন বিএনপি হাইকমান্ড ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশেষ করে রাজধানীর মিরপুরে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রাড্ডায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ (মিষ্টি) পদত্যাগ করেন। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত চলছে। এর মধ্য দিয়ে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে দখল, চাঁদাবাজি ও সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কঠোর বার্তা ইতোমধ্যে দলীয়ভাবে দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় নির্বাচন ও দলের অভ্যন্তরীণ অবস্থা : স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ নির্বাচন ক্ষমতাসীন বিএনপির জন্য বৃহৎ এক সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ। জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন ঘিরে তৃণমূলের প্রত্যাশা ও ক্ষোভ সামলানো, সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রহণযোগ্য প্রার্থী বাছাই-এসবই বিএনপির জন্য কঠিন পরীক্ষা।
চাঁদাবাজি রোধে নতুন আইনের চিন্তা সরকারের : চাঁদাবাজির শিকার হলেও অনেকে ভয়ে মামলা করতে চান না। এ সুযোগে চাঁদাবাজরা পার পেয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে চাঁদাবাজি প্রতিরোধে ফৌজদারি দণ্ডবিধি সংশোধন অথবা পৃথক নতুন আইন করার চিন্তা করছে সরকার। নতুন আইনি ব্যবস্থায় ভুক্তভোগী মামলা করতে না চাইলেও পুলিশ যেন বাদী হয়ে ব্যবস্থা নিতে পারে, সে সুযোগ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী সংসদ অধিবেশনের বাইরে মন্ত্রী-এমপিদের নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় গিয়ে তৃণমূলের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা এবং স্থানীয় মানুষের অভাব-অভিযোগ শ্রবণ এবং সেসব সমস্যা সমাধানের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার নির্দেশনা দেন বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।
