ওয়াশিংটনের চিঠির অপেক্ষায় ঢাকা

শাহেদ আলী ইরশাদ
যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের রায়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের পাল্টা শুল্ক (রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ) কাঠামো বাতিল এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে নতুন করে ১৫ শতাংশ সমহারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা এ দুই বিপরীতমুখী সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে বাংলাদেশ সরকার। পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক চিঠির অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের সাম্প্রতিক রায়ের ফলে বাংলাদেশের জন্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি পুনরায় আলোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কারণ আদালত ট্রাম্প প্রশাসনের পাল্টা শুল্ক কাঠামোকে অবৈধ ঘোষণা করেছে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিল। এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আদালতের রায় সত্ত্বেও সব দেশের জন্য ১৫ শতাংশ সমহারে শুল্ক নির্ধারণের ঘোষণা দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক আদালতের রায়ের প্রসঙ্গ টেনে বাণিজ্য সচিব মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, আদালতের রায়ের পর যুক্তরাষ্ট্র সব বাণিজ্য অংশীদারের জন্য ১৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করতে পারে। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি পায়নি। তিনি জানান, গত আগস্টে আরোপিত ২০ শতাংশ শুল্ক এখনো বহাল রয়েছে এবং নতুন চুক্তির আওতায় প্রস্তাবিত ১৯ শতাংশ শুল্কহার এখনো কার্যকর হয়নি। চুক্তির বর্তমান অবস্থান সম্পর্কেও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের অপেক্ষায় রয়েছে সরকার, যা আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। বাণিজ্য সচিব বলেন, পরবর্তী পরিস্থিতি জানতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখবে। স্পারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, এ পর্যন্ত সব দেশকে ১৫ শতাংশ সমহারে শুল্ক মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুনরায় আলোচনা করে দেশের জন্য আরও অনুকূল শুল্কহার নিশ্চিত করতে পারবে, যা রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়াতে সহায়ক হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারাস অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে অন্তর্বর্তী সরকারের করা শুল্ক চুক্তির সময় নির্বাচন নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, সময়োচিত নয় এমন সিদ্ধান্ত অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। চুক্তিটি সই না হলে আমাদের আলোচনার সুযোগ আরও বেশি থাকত। এখন আমরা অনিশ্চিত অবস্থায় পড়েছি। অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু ব্যক্তি নিজস্ব^ার্থে এ চুক্তি করেছেন এমন অভিযোগ করে তিনি বলেন, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক সংক্রান্ত এ অস্থিরতা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, সরকারের উচিত চুক্তিটি বাতিল বা পুনর্বিবেচনার সম্ভাব্য পথ খোঁজা। বাণিজ্য চুক্তি আদর্শভাবে এইচএস কোডভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন, যাতে শুল্ক ও কাস্টম সুবিধা স্পষ্ট থাকে। পাল্টা শুল্ক চুক্তিতে স্বভাবগতভাবেই অনিশ্চয়তা থাকে। এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নতুন ১৫ শতাংশ সমহারে শুল্ক সব দেশের জন্য প্রযোজ্য হলে বাংলাদেশ বিশেষ কোনো সুবিধা পাবে না, আবার আলাদা কোনো ক্ষতির মুখেও পড়বে না। তিনি বলেন, আগের পাল্টা শুল্ক কাঠামোয় শুল্কহার ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামানোর ভিত্তিতেই চুক্তিটি হয়েছিল। পাল্টা কাঠামো বাতিল হয়ে যাওয়ায় এ চুক্তির কার্যকারিতাও আর থাকছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, যেহেতু চুক্তিটি এখনো কার্যকর হয়নি, সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরু করা উচিত ছিল এবং নির্বাচনের ঠিক আগে তড়িঘড়ি করে চুক্তি সই করা ঠিক হয়নি। তিনি আরও বলেন, সাধারণত এ ধরনের চুক্তির কার্যকর তারিখ ও নোট বিনিময়ের মধ্যে ৬০ দিনের সময় থাকে। এই সময়কে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে কৌশলগতভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্ট্রিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক বলেন, এ ধরনের সব চুক্তিই সংসদে অনুমোদনের প্রয়োজন রয়েছে। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসও পাল্টা শুল্ক অংশটি অনুমোদন নাও দিতে পারে। বাংলাদেশ কি এই চুক্তি উপেক্ষা করতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি আইনি ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল। তিনি সতর্ক করে বলেন, ভুল অবস্থান নিলে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তিনি আরও জানান, মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট রায়ে বলেছেন প্রেসিডেন্টের একতরফাভাবে শুল্ক আরোপের ক্ষমতা নেই। তবে রায় অনুযায়ী, বিদ্যমান শুল্ক ১৫০ দিন পর্যন্ত বহাল থাকতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights