কক্সবাজারে এখনো পানিবন্দি লাখো মানুষ, প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ২৯
হাসানুর রশীদ, কক্সবাজার
কক্সবাজারে টানা কয়েক দিনের ভারি বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যা ও পাহাড়ধসে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছে বেশ কয়েকজন। এ নিয়ে চলমান দুর্যোগে কক্সবাজারে পাঁচদিনে বন্যা ও পাহাড়ধসে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯ জনে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে, চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরি উপজেলায় বন্যার পানি যেন স্থির হয়ে আছে। ফলে থমকে আছে মানুষের জীবনযাত্রা। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দুর্ভোগ। প্রায় দশ লাখ মানুষের নিরাপদ পানি নাই, খাবার নাই। পয়ঃনিষ্কাশনের নূন্যতম স্বাস্থ্যসম্মত মাধ্যমটাও পানিতে তলিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা।
টানা এক সপ্তাহের ভারি বর্ষণের পর শনিবার বৃষ্টি কিছুটা কমলেও রবিবার (১২ জুলাই) ভোররাত থেকে আবারও শুরু হয়েছে ভারি বৃষ্টিপাত। এতে কক্সবাজারের বন্যাদুর্গত এলাকাগুলোতে নতুন করে দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। যেসব এলাকায় বন্যার পানি কিছুটা নেমে গিয়েছিল, সেখানে আবারও পানি বাড়তে শুরু করেছে। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট।
চকরিয়া উপজেলার বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া আবদুল্লাহ মারুফের এক স্টাটাসে যেন কক্সবাজারের বন্যা পরিস্থিতি ফুটে উঠেছে। তিনি লিখেন, আমার ঘরে এর আগেও দুয়েকবার পানি ঢুকেছে। রাতে ঢুকলে সকালে, সকালে ঢুকলে রাতের মধ্যে নেমে যায়। কিন্তু এবারে গত প্রায় পাঁচদিন ধরে আমরা পানিবন্দি। ঘরের মূল মেঝে ভাসছে চার দিন ধরে। কিছুক্ষণ নামতে শুরু করলে একটু পরে দ্বিগুণ বেড়ে যাচ্ছে। আগে বহুবার বন্যা হয়েছে। কিন্তু এবারেরটা ব্যতিক্রম। এমন দীর্ঘস্থায়ী বন্যা নিকট অতীতে হয় নাই। ক্ষয়-ক্ষতি এবং প্রাণহানিও এবারে নজিরবিহীন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়টা হলো এখনো পানি স্থায়ীভাবে নেমে যাওয়ার লক্ষণ নাই। এই একটু কমলে, একটু পর আবারও বেড়ে যাচ্ছে।
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম জানান, শনিবার রাতে উপজেলার সদর ইউনিয়নের বলিরপাড়া এলাকায় বন্যার পানিতে ডুবে ১৯ মাস বয়সী মুশফিকুর রহিম নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। সে ওই এলাকার প্রবাসী নাছির উদ্দীনের ছেলে।
শিশুটির ঘরে হাঁটুসমান এবং উঠানে কোমরসমান পানি জমে ছিল। এসময় শিশুটিকে ঘরে রেখে বাইরে কাজ করছিলেন তার মা। একপর্যায়ে সবার অগোচরে শিশুটি পানিতে পড়ে স্রোতে ভেসে যায়। পরে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা অনেক খোঁজা-খুঁজির পর ঘর থেকে প্রায় ১২০ ফুট দূরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এদিকে, চকরিয়া উপজেলার কৈয়ারবিল ইউনিয়নের জলদাসপাড়ার সুজিত দাস (১২) বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে নিখোঁজ রয়েছে। সুজিত চকরিয়ার জলদাসপাড়ার তুফান দাসের ছেলে।
বন্যা পরিস্থিতি সম্পর্কে ইউএনও রফিকুল ইসলাম বলেন, পেকুয়া উপজেলার সার্বিক পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও অনেক এলাকায় এখনো পানি রয়েছে।
শনিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে কক্সবাজার শহরের পূর্ব কলাতলীর ঝরঝরিপাড়ায় পাহাড়ধসে রোজিনা বেগম (৪০) নামে এক গৃহবধূ নিহত হন। তিনি ওই এলাকার আব্দুল মজিদের স্ত্রী।
এদিকে, ৮ জুলাই রামু উপজেলায় ঈদগড়ে ঢলের পানিতে নিখোঁজ হওয়া সাজিদুল ইসলাম সাজিদের (১৩) মরদেহ ঈদগাঁও উপজেলার ফুলেশ্বরী নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। সে রামু উপজেলায় ঈদগড় ইউনিয়নের হাসনাকাটার নুরুল ইসলামের ছেলে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে কক্সবাজারসহ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আরও কয়েকদিন মাঝারি থেকে ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। অতিভারি বৃষ্টিপাতের কারণে পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি থাকায় সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে সতর্কতা বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
জেলা প্রশাসনের ত্রাণ ও পুর্ণবাসন কর্মকর্তা আজাদ রহমান জানান, কক্সবাজারে বন্যার চরম অবনতি ঘটেছে। সরকারের পক্ষ থেকে ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। ইতিমধ্যে নগদ ৩০ লাখ টাকা এবং ৪০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
