করের বোঝা নয়, বাজেট হতে হবে ব্যবসা-বিনিয়োগবান্ধব
ফারুক মেহেদী
বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি অনিবার্য এক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। একদিকে অভ্যন্তরীণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ডলার সংকট; অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে। এমন এক সময়ে আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে, যখন মার্কিন-ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের ফলে জ্বালানি তেলের বাজার অস্থির এবং প্রবাস আয়ের প্রবাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিসহ মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো সংঘাতের কবলে পড়ায় জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে পরিবহন খাত ও শিল্প উৎপাদনে।
লোডশেডিং এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির ফলে তৈরি পোশাকসহ প্রধান রপ্তানি খাতগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাচ্ছে। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট প্রণয়ন করা সরকারের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চলতি অর্থবছরে বাজেটের আকার প্রায় আট লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এনবিআরের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ কোটি টাকা।
এরই মধ্যে অর্থবছরের আট মাসে রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ঘাটতি ছাড়াতে পারে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। আগামী বাজেটের আকার এবার আট লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। আকার বেড়ে যাওয়া মানে এখানে আয় ও ব্যয়ের অঙ্ক বাড়বে।
ফলে তহবিল সংস্থানে সরকার কর বাড়াতে পারে বা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে, বিশেষ করে কর-রাজস্ব থেকে আরো বেশি হারে আয় করার পরিকল্পনা করবে। এতে মানুষের ওপর করের বোঝা বাড়বে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, বেশির ভাগ ব্যবসায়ী তাঁদের উৎপাদন সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছেন এবং তাঁদের মুনাফায় টান পড়েছে। এর ফলে ব্যক্তি কর, করপোরেট কর, আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট আদায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে পিছিয়ে পড়ছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির পাশাপাশি বিদ্যমান অবস্থা চলতে থাকলে আগামী অর্থবছরেও কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আয় করা কঠিন হবে।
আর বড় বাজেটের খরচ মেটাতে গিয়ে সরকার যদি পুনরায় সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে দেয়, তবে তা হবে হিতে বিপরীত। বর্তমানে দেশে মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে, আর খাদ্য মূল্যস্ফীতি অনেক ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। মানুষের প্রকৃত আয় না বাড়ায় ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। এই অবস্থায় পরোক্ষ কর বা ভ্যাট বৃদ্ধি করলে তা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বাড়িয়ে দেবে, যা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
বাজেটের বিশাল ঘাটতি মেটানোর জন্য সরকারের সামনে প্রধান উৎস হলো অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা এবং বিদেশি ঋণ। তবে বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণের সুদহার আইএমএফের শর্তানুযায়ী বাজারভিত্তিক করার ফলে তা ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত উঠে গেছে। উচ্চ সুদহারের কারণে বিনিয়োগে এক ধরনের স্থবিরতা কাজ করছে। ব্যবসায়ীরা নতুন করে ঋণ নিয়ে শিল্প সম্প্রসারণে সাহস পাচ্ছেন না। কারণ উচ্চ উৎপাদন খরচ এবং চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে তাত্ত্বিকভাবে সুদহার কমানো উচিত হলেও বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করতে হচ্ছে। ফলে বিনিয়োগ বনাম মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের এই দ্বন্দ্বে সুদহার দ্রুত কমানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য বিশেষ ছাড় বা পুনরর্থায়ন স্কিম বাজেটে রাখা জরুরি হয়ে পড়েছে।
সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করা রাজনৈতিকভাবে অপরিহার্য। কিন্তু অর্থের সংস্থান করতে গিয়ে যদি অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় কমানো না হয়, তবে এই দায় শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণের ওপরই পড়বে। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর ক্ষেত্রে নতুন করদাতা খোঁজা এবং কর ফাঁকি রোধে জোর না দিয়ে যদি বিদ্যমান করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ দেওয়া হয়, তবে তা ব্যবসা-বাণিজ্যকে আরো সংকুচিত করবে। তাই আগামী বাজেটে রাজস্ব আদায়ের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত ব্যয় সংকোচনে। বিশেষ করে এডিপি বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো স্থগিত রেখে সামাজিক সুরক্ষা ও কৃষি ভর্তুকিতে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন।
বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের ঘুরে দাঁড়াতে হলে আসন্ন বাজেটে এমন একটি কর ও শুল্ক নীতি প্রয়োজন, যা কেবল রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য পূরণ করবে না, বরং শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগকে সুরক্ষা দেবে। এখনকার প্রধান সমস্যা হলো উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং ডলার সংকটের কারণে কাঁচামাল আমদানিতে জটিলতা। এই প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী বাজেটে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট সংস্কার থাকা উচিত বলে মনে করা হচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানিতে আগাম কর এবং অগ্রিম আয়কর ব্যবস্থার আমূল সংস্কার। বর্তমানে কাঁচামাল আমদানির সময় বড় অঙ্কের টাকা কর হিসেবে আটকে যায়, যা অনেক ক্ষেত্রে রিফান্ড পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। এতে ব্যবসায়ীদের চলতি মূলধনের সংকটে পড়তে হয়। সংকটকালীন এই বাজেটে যদি কাঁচামালের ওপর এই অগ্রিম করহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়, তবে ব্যবসায়ীদের হাতে নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়বে। এ ছাড়া মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক রেয়াত আরো সহজতর করা উচিত, যাতে নতুন বিনিয়োগ বা পুরনো কারখানার আধুনিকায়ন ব্যাহত না হয়।
করপোরেট করের ক্ষেত্রেও একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং স্থিতিশীল কাঠামো প্রয়োজন। যদি তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কম্পানির করহারে অন্তত ২.৫ শতাংশ ছাড় দেওয়া যায়, তবে ব্যবসায়ীরা কিছুটা স্বস্তি পাবেন। তবে কেবল করহার কমালেই হবে না, বরং কর প্রদানের প্রক্রিয়া পুরোপুরি ডিজিটাল বা অটোমেটেড করা জরুরি। কর কর্মকর্তাদের সরাসরি হস্তক্ষেপ কমলে ব্যবসায়ীদের হয়রানি কমবে এবং ব্যবসার খরচ হ্রাস পাবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো এবং সহজ শর্তে ভ্যাট প্রদানের সুযোগ রাখা উচিত, যাতে তারা মহামারির পরবর্তী ধাক্কা এবং যুদ্ধের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারে।
বর্তমান বাজার পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে ভ্যাটের একাধিক স্তরের পরিবর্তে একটি সহনীয় ও সমন্বিত হার থাকা উচিত। বিলাসদ্রব্যের ওপর উচ্চশুল্ক বজায় রাখলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য এবং শিল্পের অপরিহার্য উপকরণের ওপর কর ও শুল্কের চাপ কমানো দরকার। যদি সরকার করহার না বাড়িয়ে করের জাল বা আওতা বিস্তৃত করার দিকে মন দেয়, তবে সৎ ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন এবং অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে। সংকটের এই সময়ে ‘চাপিয়ে দেওয়া কর’ নয়, বরং ‘সহায়ক করনীতি’ ব্যবসায়ীদের ঘুরে দাঁড়ানোর মূলশক্তি হতে পারে।
বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে কর অবকাশ সুবিধা বা ট্যাক্স হলিডে নিয়ে হুট করে কোনো কঠোর সিদ্ধান্তে যাওয়া দেশের শিল্পায়নের গতিকে থামিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে যেখানে মার্কিন-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক বিনিয়োগ পরিস্থিতি এমনিতেই টালমাটাল, সেখানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে এই সুবিধাটি একেবারে তুলে না দিয়ে বরং পর্যায়ক্রমে বা ধাপে ধাপে কমিয়ে আনা অনেক বেশি যুক্তিসংগত হবে। একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়ে যদি প্রতিবছর এই সুবিধার হার কিছুটা কমানো হয়, তবে ব্যবসায়ীরা আগে থেকেই মানসিক ও আর্থিক প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে এটি নিশ্চিত করা জরুরি যে কর অবকাশের সুবিধাটি যেন কেবল নির্দিষ্ট কিছু খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে ভূমিকা রাখে এমন শিল্পে অগ্রাধিকার পায়।
কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং মানুষের প্রকৃত আয় বাড়ানোর জন্য আগামী বাজেটে গতানুগতিক ধারার বাইরে এসে কিছু সাহসী পদক্ষেপ প্রয়োজন। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়ের সীমা বর্তমানের চেয়ে অনেকটা বাড়িয়ে দেওয়া উচিত, যাতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির হাতে বাড়তি কিছু টাকা থাকে। মানুষের হাতে খরচ করার মতো অর্থ থাকলে তা বাজারে চাহিদার সৃষ্টি করবে, যা পরোক্ষভাবে বিনিয়োগ ও উৎপাদন প্রক্রিয়াকে সচল রাখবে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এসএমই খাতের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা এবং বিশেষ করে কৃষিভিত্তিক শিল্পে প্রণোদনা দিলে গ্রাম ও শহর উভয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। কারিগরি শিক্ষার প্রসার এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে, যাতে তরুণসমাজ কেবল ডিগ্রিনির্ভর না হয়ে সরাসরি উৎপাদনশীল কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
সরকারের ক্রমবর্ধমান ঋণনির্ভরতা কমানোর জন্য রাজস্ব আদায়ের পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন আনা এখন সময়ের দাবি। করহার বাড়িয়ে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি না করে বরং করের আওতা বা নেট ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করতে হবে, যদিও এক কোটি ২৮ লাখ টিআইএনধারীর মাত্র ৫০ লাখ রিটার্ন দেন। বাকিদের ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সেটি এনবিআর দক্ষতার সঙ্গে করতে পারছে না। দেশে লাখ লাখ মানুষ করযোগ্য আয় করলেও বড় একটি অংশ এখনো করজালের বাইরে রয়ে গেছে, যাদের প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার মাধ্যমে করের আওতায় আনা সম্ভব। অপ্রয়োজনীয় আমদানিতে লাগাম টেনে ধরা এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ বা এফডিআই আকর্ষণে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে আনতে পারলে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা অনেকাংশে কমে আসবে। সামগ্রিকভাবে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং অপচয় রোধ করার মাধ্যমেই সরকার অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে বাজেটের বড় অংশ জোগান দিতে সক্ষম হবে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও বার্তাপ্রধান, কালের কণ্ঠ
