কাঁঠালের খোসা থেকে পরিবেশবান্ধব চামড়া

সাইফ ইমন
পরিবেশবান্ধব শিল্প উপকরণের দিকে ঝুঁকছে বিশ্ব। কৃষিজ বর্জ্যকে মূল্যবান শিল্পপণ্যে রূপান্তরের গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা হিসেবে উঠে এসেছে বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল। এর খোসা, আঁশ ও বোঁটা থেকে পরিবেশবান্ধব ‘বায়ো-লেদার’ বা ভেগান চামড়া তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে দেশবিদেশে গবেষণা চলছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ প্রযুক্তি সফলভাবে বাণিজ্যিক পর্যায়ে প্রয়োগ করা গেলে দেশের চামড়া ও ফ্যাশন শিল্পে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। বিশ্বজুড়ে প্রাণীর চামড়ার বিকল্প হিসেবে ভেগান লেদারের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। জুতা, ব্যাগ, পোশাক ও আসবাবশিল্পে পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহারে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো গুরুত্ব দিচ্ছে। এ বাস্তবতায় কাঁঠালের মতো সহজলভ্য কৃষিপণ্য বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় কাঁচামাল হতে পারে। সম্প্রতি আহসানউল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির মেকানিক্যাল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একদল গবেষক কাঁঠালের খোসা থেকে সেলুলোজ আহরণ করে বায়োডিগ্রেডেবল কম্পোজিট ফিল্ম তৈরিতে সফল হয়েছে। গবেষণার নেতৃত্ব দেন শাহ মো. আশিকুজ্জামান নিপু। তার সঙ্গে ছিলেন আকিব রহমান ও মো. শামসুল আলম। অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের গবেষক ও প্রযুক্তিবিদ ড. আবু আলী ইবনে সিনা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিশ্বে এখন কৃত্রিম প্লাস্টিকভিত্তিক বিকল্পের পরিবর্তে উদ্ভিজ উৎস থেকে পরিবেশবান্ধব বায়ো-লেদার তৈরির প্রবণতা বাড়ছে। বাংলাদেশের কাঁঠালের খোসা ও আঁশ এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় কাঁচামাল হতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যে ফলের বর্জ্য থেকে ভেগান লেদার উৎপাদন শুরু হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের ফ্রুটলেদার রটারডাম আম ও আপেলের বর্জ্য ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে বায়ো-লেদার তৈরি করছে। ভারতের কেরালা ও কর্ণাটকের গবেষকরাও কাঁঠালের খোসার সেলুলোজ নিয়ে কাজ করছেন। যদিও কাঁঠালের খোসা থেকে পরিবেশবান্ধব চামড়ার উৎপাদন এখনো পরীক্ষামূলক ও সীমিত পর্যায়েই রয়েছে। গবেষক শাহ মো. আশিকুজ্জামান নিপু তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেন, ব্লিচিং ও ক্ষারীয় প্রক্রিয়ায় কাঁঠালের খোসা থেকে প্রায় ২৮ শতাংশ সেলুলোজ আহরণ করা সম্ভব হয়েছে। এই সেলুলোজ দিয়ে জৈবভাবে অবক্ষয়যোগ্য (বায়োডিগ্রেডেবল) প্যাকেজিং ফিল্ম তৈরি করা যায়, যা ভবিষ্যতে প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ের টেকসই বিকল্প হতে পারে। প্রযুক্তিবিদ অধ্যাপক ড. খন্দকার সিদ্দিক-ই-রাব্বানী বলেন, কাঁঠালের বর্জ্যকে মূল্যবান শিল্পপণ্যে রূপান্তর করা গেলে তা শিল্প, বাণিজ্য ও রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে। এজন্য গবেষণায় বিনিয়োগ, শিল্পোদ্যোক্তা এবং সরকারি নীতিগত সহায়তা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমন্বিত গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও শিল্পায়নের মাধ্যমে কাঁঠালের খোসা থেকে তৈরি ভেগান লেদার ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য নতুন রপ্তানি পণ্য হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি গ্রামীণ পর্যায়ে গড়ে উঠতে পারে নতুন উদ্যোক্তা, সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান এবং কৃষিজ বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও হবে আরও কার্যকর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights