কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাতে ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের পরিকল্পনা, ফিরবে কি সেই অর্থ
অনলাইন ডেস্ক
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বদলে দিতে পারে বিশ্ব অর্থনীতির চেহারা- এই বিশ্বাসে এখন ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ঢালছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীরা। ডেটা সেন্টার, চিপ, বিদ্যুৎ ও কম্পিউটিং অবকাঠামো তৈরিতে বিনিয়োগের এই দৌড় ইতোমধ্যে রেলপথ কিংবা ইন্টারনেটের মতো আগের বড় প্রযুক্তি বিপ্লবগুলোর বিনিয়োগকেও ছাড়িয়ে গেছে।
কিন্তু এই বিপুল অর্থের বিপরীতে বড় হয়ে উঠছে আরেকটি প্রশ্ন- এআই যে হারে মুনাফা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে, সেই অর্থ কি সময়মতো ফিরবে? রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শুধু ডেটা সেন্টারেই বিশ্বজুড়ে মোট বিনিয়োগ ২০৫০ সাল নাগাদ ৩০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। পিডাব্লিউসি এর এই পূর্বাভাস অনুযায়ী, অঙ্কটি প্রায় যুক্তরাষ্ট্রের মোট বকেয়া ট্রেজারি ঋণের সমান। মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পরও এই ব্যয় রেলপথ ও ডটকম বুমের সময়কার বিনিয়োগকে ছাড়িয়ে যাবে।
এআই দৌড়ে অর্থ ঢালার মাত্রা বোঝাতে অ্যানথ্রপিক উদাহরণই যথেষ্ট। কোম্পানিটি আগামী কয়েক বছরে প্রায় ৫১৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা করছে- যা ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির আয়ের ১০০ গুণেরও বেশি। বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা, এআই শুধু একটি নতুন প্রযুক্তি নয়; বরং বাষ্পীয় ইঞ্জিন বা শিল্পবিপ্লবের মতোই অর্থনীতির কাঠামো পাল্টে দিতে পারে।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, সেই বিপুল পরিবর্তনের অর্থনৈতিক প্রমাণ এখনো প্রত্যাশার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র এআই উন্নয়নে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি হলেও দেশটির সামগ্রিক উৎপাদনশীলতায় এখনো সেই মাত্রার উল্লম্ফন দেখা যায়নি। জেপিঁ মরগ্যান আগস্টে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপকভিত্তিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এখনো ‘অধরা’। ফলে এআই কোম্পানিগুলোর আকাশছোঁয়া মূল্যায়ন কতটা টেকসই, তা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে।
বেইন এন্ড কোম্পানি-এর এক গবেষণাও একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছে। তাদের হিসাবে, বর্তমানে বিদ্যমান বাজার থেকে পাওয়া আয় দিয়ে এআই অবকাঠামোয় যে বিপুল অর্থ ঢালা হচ্ছে, তার পুরোটা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। অর্থাৎ বিনিয়োগের ঘাটতি পূরণ করতে এআই-নির্ভর রোবট, নতুন ধরনের ব্যাটারি, সেমিকন্ডাক্টরসহ সম্পূর্ণ নতুন বাজার তৈরি করতে হবে। প্রশ্ন হলো, সেই নতুন বাজারগুলো কি অবকাঠামো নির্মাণের খরচের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যথেষ্ট দ্রুত তৈরি হবে?
এই হিসাবের চাপ সরাসরি পড়ছে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর। গুগল, আমাজন ও মাইক্রোসফট এর মতো এআই অবকাঠামো নির্মাণে এগিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগামী পাঁচ বছরে ৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি নতুন রাজস্ব তৈরি করতে হতে পারে, যাতে বর্তমান গতিতে অবকাঠামো নির্মাণের অর্থ জোগানো যায়। অর্থাৎ এআইতৈরি করাই এখন আর মূল চ্যালেঞ্জ নয়, সেই এআই থেকে বিপুল নতুন আয় তৈরি করাটাই হয়ে উঠছে বড় পরীক্ষা।
এআই চিপ নির্মাতা এনভিডিয়া-কে ঘিরে জেপি মরগ্যান এর হিসাবও বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান মূল্যায়নকে যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশীলতা আগামী ১০ বছর প্রতিবছর ৩ থেকে ৫ শতাংশ হারে বাড়তে হবে। অথচ মার্কিন কংগ্রেসের বাজেট দপ্তরের ভিত্তিমূলক পূর্বাভাসে একই সময়ে বার্ষিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই ২০২৫ থেকে ২০৩২ সাল পর্যন্ত এআই খাতে বিনিয়োগ প্রায় ৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে হিসাব করেছেন কলাম্বিয়া বিজনেস স্কুলের অর্থনীতিবিদ স্টিজন ভ্যান নিউইনবার্গ। তাঁর হিসাবে, এই বিনিয়োগে ১০ শতাংশ রিটার্ন পেতে ২০৩২ সালের মধ্যে মার্কিন এআই খাতকে বছরে প্রায় ৩ দশমিক ৫৫ ট্রিলিয়ন ডলার রাজস্ব তৈরি করতে হবে। বর্তমানে সেই আয়ের পরিমাণ এর তুলনায় অনেক কম।
আরেকটি ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে ঋণনির্ভর বিনিয়োগ থেকে। এআই অবকাঠামোর বড় অংশ অর্থায়ন করা হচ্ছে ধার করা অর্থে। ফলে চাহিদা সামান্য কমে গেলে, কোনো প্রকল্পে বিলম্ব হলে কিংবা অবকাঠামোর মূল্য কমে গেলে ক্ষতির পরিমাণ অনেক বড় হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ এআই-এর ভবিষ্যৎ যতটা প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে, ততটাই নির্ভর করছে অর্থের প্রবাহ অব্যাহত রাখার সক্ষমতার ওপর।
তবে এআই খাতের নেতারা এখনো অত্যন্ত আশাবাদী। তাদের বড় প্রত্যাশার একটি জায়গা হলো ‘recursive self-improvement’- এআই নিজেই নিজের সক্ষমতা উন্নত করতে পারলে প্রযুক্তির অগ্রগতি আরও দ্রুত হতে পারে। গুগল ডিপমাইন্ড’র কৌশলগত নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত জাসজিত সেখন এটিকে এআই বিনিয়োগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সফল হলে এর মাধ্যমে উৎপাদনশীলতায় অভূতপূর্ব উল্লম্ফন ঘটতে পারে। একই সঙ্গে এমন দ্রুতগতির এআই উন্নয়ন মানবজাতির জন্য বড় ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
তবে অর্থনীতির বাস্তবতা প্রযুক্তির উচ্চাকাঙ্ক্ষার চেয়ে ধীর হতে পারে। যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ডায়ান কইলের মতে, অতীতের বড় প্রযুক্তিগত বিপ্লবগুলোর উৎপাদনশীলতার সুফল অর্থনীতিতে পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়তে প্রায় ১০ থেকে ৫০ বছর পর্যন্ত সময় লেগেছে। কিন্তু বর্তমান এআই বিনিয়োগের বড় অংশের অর্থায়ন হচ্ছে এমন ব্যবস্থায়, যেখানে ঋণ পরিশোধ ও বিনিয়োগে রিটার্ন পাওয়ার সময়সীমা অনেক কম।
এআই এর প্রভাব ইতোমধ্যে শ্রমবাজারেও দেখা দিতে শুরু করেছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের হিসাবে, এআই প্রভাবিত খাতে ২২ থেকে ২৫ বছর বয়সী কর্মীদের কর্মসংস্থান এআই এর জন্য তুলনামূলক কঠিন কাজের খাতের কর্মীদের তুলনায় ১৯ শতাংশ কম। বিশেষ করে হিসাবরক্ষণ ও প্যারালিগ্যালের মতো প্রাথমিক পর্যায়ের সাদা-কলার চাকরিতে এর প্রভাব বেশি দেখা যাচ্ছে।
তবু ইতিহাস এআই- নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার পাশাপাশি কিছুটা আশাবাদের কারণও দেয়। ১৮৭৩ সালের আর্থিক আতঙ্কে বহু রেল কোম্পানি ও বিনিয়োগকারী ধ্বংস হলেও রেলপথ হারিয়ে যায়নি; বরং পরবর্তী অর্থনৈতিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হয়ে উঠেছে। নব্বইয়ের দশকের ডটকম বুদবুদ ফেটে যাওয়ার পরও ইন্টারনেটের বিস্তার থামেনি। এআই নিয়েও হয়তো একই ঘটনা ঘটতে পারে। বর্তমান বিনিয়োগের কিছু অংশ ব্যর্থ হবে, কিছু কোম্পানি হারিয়ে যাবে, মূল্যায়ন কমে যেতে পারে- কিন্তু তৈরি হয়ে যাওয়া অবকাঠামো থেকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুফল আসতে পারে।
শেষ পর্যন্ত তাই এআই বিপ্লবের সাফল্যের প্রশ্ন শুধু এই নয় যে প্রযুক্তিটি মানুষকে কতটা বিস্মিত করতে পারবে। আসল পরীক্ষা হবে- বিপুল অর্থ ঢালার পর সেই প্রযুক্তি কত দ্রুত বাস্তব অর্থনীতিতে উৎপাদনশীলতা, নতুন বাজার ও আয় তৈরি করতে পারে। এআই হয়তো বিশ্ব বদলে দেবে; কিন্তু সেই পরিবর্তন আসার আগ পর্যন্ত ট্রিলিয়ন ডলারের এই দৌড়ের অর্থের জোগান কতদিন টিকে থাকে, সেটিই হতে পারে প্রযুক্তি বিপ্লবটির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
তথ্য সূত্র : রয়টার্স।
