কোন দোষে তলানিতে বিদেশি বিনিয়োগ?

কোনো দেশে দেশি বিনিয়োগে ভাটা পড়লে বিদেশি বিনিয়োগে উজান আসে না। অর্থনীতির স্বাভাবিক এ তত্ত্বের টাটকা দৃষ্টান্ত ঘটল বাংলাদেশে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, কমতে কমতে বিদেশি বিনিয়োগ গেল পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে এসে ঠেকেছে। ২০২৪ সালে দেশে মোট এফডিআই এসেছে ১.২৭ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১৩.২৫ শতাংশ কম।

এর আগে, ২০২৩ সালে এই অঙ্ক ছিল ১.৪৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার কমেছে এফডিআই। এর কারণ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য যা, দেশিদের জন্যও তা-ই। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ডলারসংকট, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি সব বিনিয়োগকারীর জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। দেশি-বিদেশি, সরকারি-বেসরকারি সব বিনিয়োগকারীই চায় পুঁজি খাটানোর পরিবেশ ও পুঁজি ওঠানোর নিশ্চয়তা। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ব্যবসার মুনাফা নিজ দেশে ফেরত নেওয়ার গ্যারান্টি না পেলে আসবেন না। এলেও না পোষালে চলে যেতে পারেন। বিদেশি বিনিয়োগ তলানিতে পৌঁছার ফের এখানেই।

দেশিদের বিপদ আরেকটু বেশি। তাদের কেটে পড়ার সুযোগ নেই। তারা পুঁজি খুইয়ে ফুঁসতে পারেন, কাঁদতে পারেন। কেটে পড়তে পারেন না। বিদেশি বিনিয়োগ তলানিতে পৌঁছার তথ্যটা এমন সময়ে প্রকাশ পেল, যখন মাত্র কদিন আগে ঢাকায় সগৌরবে একটি বিনিয়োগ সম্মেলন হয়ে গেল। বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি-বিডা এবং বাংলাদেশ ইকোনমিক জোনস অথরিটি-বেজার আয়োজনে এ ‘ইনভেস্টমেন্ট সামিট নিয়ে উচ্চাশা অনেকের। ৫০টি দেশের ৪১৫ জন বিদেশি প্রতিনিধি শুধু অংশই নেননি, বিনিয়োগের আকর্ষণীয় বার্তাও দিয়েছেন।

সামিটের পর বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা যাচাই করেন। এতে সময় লাগবে। সব কিছু অনুকূলে থাকলে বিনিয়োগ আসতে বছরখানেক সময় লাগবে। তা মাথায় রেখেই অপেক্ষা ছিল বিদেশি বিনিয়োগের চুক্তিনামার। কিন্তু এলো বিনিয়োগের মাথা ফাটানো খরার তথ্য। কেন এমনটি হলো? দেশি বিনিয়োগেরও কি ইতিবাচক কোনো খবর আছে? বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগে অনাগ্রহী ছিলেন, এমন নয়। আগ্রহ আগেও ছিল। সেই আগ্রহের বাস্তবায়ন ঘটানো যায়নি। বিভিন্ন সময়ের ওয়াদা ও আশাবাদ অনুয়ায়ী দেশে অনেক বিনিয়োগ আসার কথা। অথচ কম্বোডিয়ার চেয়েও কম বিনিয়োগ আসছে। ভিয়েতনামের সঙ্গে তুলনা করার এখন সুযোগই নেই। দোষ দেওয়া হচ্ছে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিবেশের। দেশের বিদ্যমান পরিবেশ তো দেশি আর বিদেশি উভয়ের জন্য একই।

কথায় কথায় উদাহরণ হিসেবে আসে শ্রীলঙ্কার কথা। কারণ সেখানেও একটা গণ-অভ্যুত্থান ঘটেছিল। কিন্তু শ্রীলঙ্কায় একটা ফের ছিল। ক্ষমতাসীনরা পালিয়ে গেলেও কিছুদিন পর সেনাপ্রধানের ডাকে দেশে ফেরে। ফিরেই তারা ক্ষমতা ফেরত চায়নি। রাজাপক্ষে খেমটি ধরেননি। নমনীয়-কমনীয় হন। সব রাজনৈতিক শক্তি, ব্যবসায়ী ও সেনাবাহিনীসহ রাষ্ট্র পরিচালনায় সম্পর্কিতরা অন্তর্বর্তী রনিল বিক্রমাসিংহ সরকারকে সমর্থন দিয়ে দেশ পুনর্গঠন কাজে নেমে পড়ে। সরকারও সবার সমর্থনে দেশকে দ্রুত মূল ট্র্যাকে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। মূল্যস্ফীতি ৭৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার ম্যাজিক দেখায়।
গণ-অভ্যুত্থানের কমিটমেন্ট অনুযায়ী দেশের অভ্যন্তরে থাকা লুটের টাকা বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রের কাজে লাগায়। আর দুই বছরের মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। আশির দশক-পরবর্তী ভিয়েতনাম, চীন, মেক্সিকো ও ভারতের মতো দেশ অর্থনৈতিকভাবে বিকাশ লাভ করে। সে সময় দেশগুলো উৎপাদন খাতে এফডিআই আকর্ষণ করতে পেরেছিল। মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূলেও রয়েছে এফডিআই। দেশটিতে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের বহুজাতিক কম্পানিগুলো প্রচুর বিনিয়োগ করেছে। থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের ক্ষেত্রেও একই। অথচ বাংলাদেশে ব্যতিক্রম। কাজের চেয়ে কথা বেশি।

আমাদের এখানে চিত্র ভিন্ন। রাজনৈতিক দলগুলোর চাহিদার মধ্যে বৈপরীত্য। টানাপড়েন সবদিকে। ২০২৪ সালে অর্থনীতির বড় আঘাত ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে উৎপাদনমুখী শিল্পে। এটা মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে বিনিয়োগকারীদের আস্থায়। ফলে দেশে বিদায়ি বছরে বিনিয়োগ না বেড়ে বরং কমেছে। বিদেশি বিনিয়োগও ঋণাত্মক। চলতি বছরেও দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ অস্থিতিশীল থাকলে বিনিয়োগ প্রবাহে আরো বাধা আসবে। দেশি-বিদেশি কোনো বিনিয়োগই কখনো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে হয় না।

অনেক সীমাবদ্ধতার পরও দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্র রয়েছে। কিন্তু যথেষ্ট সুযোগ নেই। রয়েছে বাধার পাহাড়। তা দেশি-বিদেশি উভয়ের জন্যই। গ্যাস, বিদ্যুৎ, অবকাঠামোগত সমস্যা, প্রশাসনিক জটিলতা, বন্যা, সিডর, আইলার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়েও রাজনৈতিক অস্থিরতা সবাইকে বেশি ভোগাচ্ছে। কর, ভ্যাট, ঘন ঘন নীতির পরিবর্তন, ঘুষ, দুর্নীতি তো আছেই। সেই সঙ্গে প্রশাসনিক অদক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অক্ষমতাও বড় কারণ। বিনিয়োগ আকর্ষণে বন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থায় সহজীকরণ নেই। রাজনৈতিক ঢামাডোলে সামপ্রতিক সময়ে বিদেশি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ বার্তা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও গেছে।

বিনিয়োগ সম্মেলন চালাকালে একদিকে বিদেশিদের নিজ নিজ ব্র্যান্ড নিয়ে বাংলাদেশে আসতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে বাটা, কোকাকোলা বা কেএফসি-জাতীয় বিদেশি ব্র্যান্ডের দোকানে ভাঙচুর হয়েছে। এটিও ছিল নগদের ওপর একটি মন্দ বার্তা। ঢাকায় নিযুক্ত দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত পার্ক ইয়াং-সিক কিছুদিন আগে তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেছেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে প্রভাব ফেলছে। ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ থামিয়ে রেখেছেন। পার্ক ইয়াং-সিক এ কথাও বলেছেন, বঙ্গোপসাগর উপকূলে থাকা এবং নবম শীর্ষ ভোক্তা বাজার হওয়ায় বাংলাদেশে বিনিয়োগ আসবে বলে বিদেশিরা ‘লিপ সার্ভিস’ দেয়, সেটাতে অত মনোযোগ দেওয়ার দরকার নেই। স্থানীয় পুঁজির দারিদ্র্য কমাতে কিংবা প্রযুক্তি হস্তান্তরের নিমিত্তে বিশ্বের সব দেশের সরকারই বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করে থাকে। বিনিয়োগ পাওয়ার খাতিরে নানা সুবিধাও দেয়। বিনিয়োগ থেকে আসে নিয়োগ তথা কর্মসংস্থান, বাড়ে রাজস্ব আয়, কমে দারিদ্র্য।

২০২০ সালে বাংলাদেশে মহামারি করোনার আঘাতের আগেই চীনসহ বিশ্বের অনেক দেশ আক্রান্ত হয়। এতে বিশ্বজুড়েই ব্যবসা-বাণিজ্যে এক ধরনের স্থবিরতা নেমে আসে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে। বাংলাদেশেও নিট এফডিআইয়ে বড় ধাক্কা আসে। করোনার ধাক্কার পর ২০২১ সালে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছিল। আবার ২০২২ সাল থেকে টানা পতনের ধারা নামে। নানা ঘটনার পরিক্রমায় দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিনিয়োগকে শুধু বাধাগ্রস্তই করেছে। নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকার এলে স্থিতিশীলতা ফিরবে বলে একটি আশাবাদ ঘুরছে। সেই প্রস্তুতি এখন থেকেই নিতে হবে। এর আগ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যবসা-বিনিয়োগ অঙ্গনে করার অনেক কিছু রয়েছে। নিজের বিশ্বজোড়া যশ-খ্যাতিতে দেশের বিজনেস কমিউনিটিকে রাজনীতিতে না জড়ানোর কাজটির ভিত্তি গড়তে পারেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তাদের যেন ভবিষ্যতে রাজনৈতিক কোনো দল বা মহল রাজনীতির উপাদান বানাতে না পারে। শুধুই ব্যবসা-বিনিয়োগে মগ্ন থাকতে দেয়। তেমন একটি ভিত্তি রচনা করে সেই গ্যারান্টার হয়ে নতুন ইতিহাস গড়তে পারেন তিনি।

গত কয়েক দশকে আমাদের অর্থনীতিতে অগ্রগতি হলেও সে অনুযায়ী কেন সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা যায়নি, তা তদন্ত হওয়া দরকার। বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কী মাত্রায় রাজনীতির ছকে ফেলা হয়েছে, এরও একটি বিহিত হওয়া চাই। ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তারা আদতে তাদের গণ্ডিতে থাকতে চান। ব্যবসা করতে এসে মানইজ্জত খোয়াতে চান না। প্রয়োজনে ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে সম্মান বাঁচাতে চান। কিন্তু সেটা হতে দেন না রাজনৈতিক নেতৃত্ব। মানসম্মান নিয়ে ব্যবসা করতে দেন না। রাজনীতিমুক্তও রাখেন না। প্রধান উপদেষ্টা এবং তাঁর পরিষদ সদস্যদের তা একদম না জানার কথা নয়। তাঁরা দেশের বিভিন্ন সেক্টরের সঙ্গে কথা বলছেন। দফায় দফায়ও বসছেন। চাইলে বিজনেস কমিউনিটির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিকভাবে বসতে পারেন, শুনতে পারেন তাঁদের হৃদয়ের রক্তক্ষরণের কথা। জানতে পারেন বিনিয়োগ বাড়াতে তাঁদের অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনার কথা।

দেশি বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের দুয়ারে কড়া নাড়তে বিদেশিদের চেয়ে অভিজ্ঞতায় খাটো নন। নিজেদের শ্রম, ঘাম, মেধা, অর্থ ব্যয় করে শুধু দেশে নয়, বিদেশেও শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাদের অনেকের। অভিজ্ঞতার সঙ্গে নানা দেশে সুনামও রয়েছে তাঁদের। মনোবেদনা এবং বিনিয়োগকৃত পুঁজি কোন দশায় গেলে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের কেউ ব্যবসা ছেড়ে দেওয়ার সম্মানজনক পথ খোঁজার পথিক হন, ভাবা যায়? সরকারি পর্যায়ে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, জাতীয় কোষাগার লুট ও ক্ষমতার অপব্যবহার সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতির শিরা-উপশিরায় রক্ত সঞ্চালনে প্রবৃদ্ধির যোগানদাতারা কেন এমন নিপাতনে সিদ্ধ হবেন?

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট, ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights