খাবার কিনতেই আয়ের অর্ধেকের বেশি ব্যয় হয়ে যায়
অনলাইন ডেস্ক
দেশে এখন মানুষকে খাবারের পেছনেই আয়ের অর্ধেকের বেশি ব্যয় করতে হয়। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষকে মাসিক আয়ের বড় একটি অংশ—গড়ে ৫৫ শতাংশই খরচ করতে হচ্ছে শুধু খাবার কিনতে। চাল, ডাল, তেল-নুন, মাছ-মাংসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যে এই ব্যয় গড় হিসাব হলেও, দরিদ্র পরিবারের জন্য এ খরচ আরও বেশি ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত। বাকি খরচ হয় বাড়িভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াতসহ অন্যান্য খাতে, ফলে আয়ের তুলনায় ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
সংস্থাটির গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্যের পেছনে পরিবারপ্রতি মোট ব্যয়ের ৪৯ দশমিক ৯ শতাংশ খাদ্য কিনতে লাগে। গ্রামে এ হার বেশি। মোট ব্যয়ের ৫৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ। শহরে এ হার ৪৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ। ক্রমবর্ধমান খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় অতিদরিদ্র ১২ শতাংশ পরিবার জরিপের আগের সপ্তাহে কোনো না কোনো বেলা খাদ্য গ্রহণ বাদ দিয়েছে। ৮ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবারে জরিপের এক মাস আগে কোনো কোনো সময় পুরো দিন খাবার ছাড়াই কেটেছে। মানুষের প্রধান উদ্বেগ পণ্যের দাম বৃদ্ধি, আয় কমে যাওয়া, চিকিৎসা ব্যয়, ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা এবং আগামী দিনের ব্যয়। সামাজিক উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে– রাজনৈতিক দলগুলোর অন্তর্কোন্দল, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, মাদকাসক্তি ইত্যাদি।
‘২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে দেশের পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি’ শিরোনামে গবেষণা প্রতিবেদনটি গতকাল সোমবার প্রকাশ করে পিপিআরসি। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এলজিইডি মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান গবেষণার ফল তুলে ধরেন। গবেষণা দলের নেতৃত্বও দেন তিনি। পিপিআরসির জরিপে দারিদ্র্যের বাইরে কর্মসংস্থান, খাদ্য নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন সূচকের অবনতির চিত্র উঠে এসেছে। বলা হয়েছে, তিন বছরের ব্যবধানে দেশে দারিদ্র্যের হার ১৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৮ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে, অতিদারিদ্র্যের হার প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে।
গত ৮ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সময়ে সারাদেশের আট হাজার ৬৭টি খানা বা পরিবারের ওপর পিপিআরসির জরিপ পরিচালিত হয়। এসব খানার সদস্য ৩৩ হাজার ২০৭ জন। সারাদেশে নারী-পুরুষ, গ্রাম-শহর, বয়স ও পেশার ভিন্নতা বিবেচনায় জরিপে অংশকারীদের নির্বাচন করা হয়। অনুষ্ঠানে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দেশে তিন ধরনের সংকটের প্রভাব চলমান। এগুলো হলো– কভিড, মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। কভিডের কারণে কিছু সমস্যা অবশ্য অনেক দেশেই আছে।
তিনি বলেন, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়তে মানুষের জীবনযাত্রার অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। সে বিবেচনা থেকেই নীতি পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকে। প্রায়ই বিভিন্ন আলোচনায় অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা বলা হয়। তবে জনগণের হয়রানির কথা বলা হয় না। অথচ হয়রানির কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি কমে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনীতির পরিকল্পনায় জনমুখী দৃষ্টি থাকা খুবই জরুরি।
হোসেন জিল্লুর বলেন, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বেকারত্বের এক মহাদুর্যোগের বাস্তবতার মধ্যে দেশ রয়েছে। এ বাস্তবতায় কর্মসংস্থান নিয়ে বড় ধরনের চিন্তা করতে হবে। শুধু জিডিপির ওপর আলোচনা সীমাবদ্ধ না রেখে সমতা, ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীনতা ও নাগরিকের কল্যাণ নিয়ে আলোচনা বাড়াতে হবে। অথচ বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও ব্যষ্টিক অর্থনীতির তুলনায় সামষ্টিক অর্থনীতিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
