গবেষণা ও উদ্ভাবনে তলানিতে দেশ

সাইফ ইমন

দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের সংখ্যা বাড়লেও সে অনুপাতে বাড়ছে না গবেষণা ও উদ্ভাবন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণার পরিবেশ, অর্থায়ন ও আধুনিক গবেষণার উপযোগিতা নিয়ে রয়েছে প্রতিবন্ধকতা। পাশাপাশি গবেষণার ফল বাস্তব জীবনে প্রয়োগের ক্ষেত্রে রয়েছে নানান সীমাবদ্ধতা। ফলে মেধাবী শিক্ষার্থী ও গবেষক তৈরি হলেও তাঁদের অনেকেই দেশি সমস্যাকেন্দ্রিক গবেষণায় যুক্ত হতে পারছেন না। এ ছাড়া বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই গবেষণার ফলও আটকে থাকছে একাডেমিক পরিসরে। অভিযোগ রয়েছে অনুপযোগী বিষয় নিয়ে গবেষণার। কার্যত যার মাধ্যমে দেশ উপকৃত হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক উদ্ভাবন সূচকের চিত্রেও এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স (জিআইআই) ২০২৫-এ ১৩৯টি অর্থনীতির মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৬তম। আগের বছরও একই অবস্থানে ছিল দেশটি। অথচ ২০২২ সালে ১৪ ধাপ এগিয়ে বাংলাদেশ ১০২তম অবস্থানে উঠেছিল। পরের বছরই আবার পিছিয়ে ১০৫ এবং ২০২৪ সালে ১০৬তম অবস্থানে নেমে আসে। জাতিসংঘের বিশেষায়িত বিশ্ব মেধাস্বত্ব সংস্থা ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি অর্গানাইজেশন (ডব্লিউআইপিও) প্রকাশিত জিআইআই প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২১ পয়েন্ট নিয়ে নিম্নমধ্যম আয়ের ৩৭টি অর্থনীতির মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৯তম। মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ১০টি অর্থনীতির মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম। একই সূচকে ভারত ৩৮তম, পাকিস্তান ৯৯তম এবং শ্রীলঙ্কা ৯৩তম অবস্থানে রয়েছে। গবেষণা ও উদ্ভাবনের বাস্তব চিত্র বোঝার অন্যতম সূচক পেটেন্ট। এ ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর ব্যবধান বড়। গত বছর প্রযুক্তিগত গবেষণায় ভারতে ৫০ হাজারের বেশি এবং পাকিস্তানে ৫ হাজারের বেশি পেটেন্ট হলেও বাংলাদেশ থেকে গবেষণালব্ধ পেটেন্টের সংখ্যা ১০ থেকে ১২টির মতো বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘উন্নত দেশগুলো গবেষণায় বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। বাংলাদেশ থেকেও অনেকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে গবেষণার সুযোগ পেলেও দেশের বাস্তব সমস্যা ও প্রয়োজন কেন্দ্র করে তা প্রয়োগের প্রবণতা কম। ফলে দেশের জন্য কার্যকর গবেষণা ও উদ্ভাবনের সংখ্যা প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ছে না।’ অধ্যাপক সিদ্দিক-ই-রব্বানীর মতে গবেষণার ফল মানুষের কাছে পৌঁছাতে হলে সেটিকে বাণিজ্যিক পর্যায়ে নিতে হয়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে গবেষণার ফল বাণিজ্যিকীকরণের প্রক্রিয়াটি বেশ দুর্বল। গবেষকরা নতুন কিছু আবিষ্কার করলেও সেটিকে পণ্য বা প্রযুক্তিতে রূপ দিতে গিয়ে নানান প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের উদ্ভাবন খাত এগিয়ে নিতে হলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প নেই। এক বছরের প্রকল্প বা স্বল্পমেয়াদি বরাদ্দ দিয়ে বড় ধরনের গবেষণা ও উদ্ভাবন সম্ভব নয়। গবেষকদের এমন একটি পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে তাঁরা দীর্ঘ সময় একটি সমস্যা নিয়ে কাজ করতে পারেন।’

অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটির বাংলাদেশি গবেষক ড. আবু আলী ইবনে সিনা বলেন, ‘উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় দেশের পিছিয়ে থাকার পেছনে শিক্ষকও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বিষয়ভিত্তিক গবেষণার পাশাপাশি বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের মধ্যে সমন্বিত গবেষণার সুযোগও সীমিত।’ তাঁর মতে দীর্ঘদিন চলে আসা নানান অনিয়ম, শিক্ষার মানের অবনতি এবং শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার পরিবর্তে দলীয় বা প্রশাসনিক আনুগত্যকে গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ গবেষণার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।’

ড. আবু আলী ইবনে সিনা বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ এখন বিসিএসসহ সরকারি চাকরিকে ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখছে। গবেষণাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছে না। তাই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকেই গবেষণার প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি গবেষকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।’ গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ তৈরি করা না গেলে উদ্ভাবন অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারবে না। গবেষকরা যে প্রযুক্তি বা পণ্য উদ্ভাবন করছেন, তার বাজার সম্ভাবনা যাচাই, পেটেন্ট করা এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার জন্য আলাদা সহযোগিতা প্রয়োজন।

তাঁদের মতে শুধু আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান উন্নত করাই লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। গবেষণার মাধ্যমে দেশের বাস্তব সমস্যার সমাধান, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং সেই উদ্ভাবন সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই হতে হবে মূল লক্ষ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights