গান্ধীর যে প্রশ্নগুলোর উত্তর আজও সহজ নয়

কবির আহমেদ

মহাত্মা গান্ধীকে আমরা সাধারণত কয়েকটি পরিচিত ছবির মধ্যেই দেখি—হাতে লাঠি, পরনে ধুতি, মাথা নিচু করে হাঁটছেন; কোথাও অনশন করছেন; কোথাও স্বাধীনতার আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। প্রতিবছর তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করা হয়, অহিংসার কথা বলা হয়, তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়।

বাংলাদেশের সঙ্গে গান্ধীর সম্পর্কের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি নোয়াখালী। ১৯৪৬ সালের নভেম্বরে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় বিপর্যস্ত নোয়াখালীতে তিনি গিয়েছিলেন ৭৭ বছর বয়সে। ৬ নভেম্বর তিনি নোয়াখালীর উদ্দেশে রওনা হন এবং পরদিন চৌমুহনী পৌঁছেন। এরপর আক্রান্ত বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে তিনি মানুষের সঙ্গে কথা বলেন এবং সহিংসতার পরিণতি প্রত্যক্ষ করেন।

সেই সময়ে গান্ধীর নোয়াখালী যাওয়ার সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার মধ্যে প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছিল, তখন গান্ধী আক্রান্ত মানুষের কাছে যাওয়াকে নিজের রাজনৈতিক দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছিলেন। তাঁর কাছে তখন বড় সভা বা রাজনৈতিক ভাষণের চেয়ে মানুষের পাশে সরাসরি উপস্থিত হওয়াই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। সত্য, অহিংসা ও স্বরাজ ছিল গান্ধীর রাজনৈতিক চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

স্বরাজ তাঁর কাছে শুধু ব্রিটিশ শাসনের অবসান নয়; মানুষের মর্যাদা, নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার এবং স্থানীয় সমাজের অংশগ্রহণও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল। ‘গ্রাম স্বরাজ’-এর ধারণায় তিনি এমন একটি সমাজের কথা ভাবতেন, যেখানে মানুষ নিজেদের জীবনকে প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্তে অংশ নেবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় ভূমিকা রাখবে।

নোয়াখালী সফরে এই চিন্তার একটি বাস্তব রূপও দেখা যায়। বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গান্ধী ও তাঁর সহযোগীদের জন্য বিশেষ যাত্রাব্যবস্থা করেছিলেন। গান্ধী তা গ্রহণ করেননি।

সংরক্ষিত বিবরণ অনুযায়ী, তিনি বলেছিলেন, এ ধরনের ব্যবস্থা ‘বড় মানুষদের’ জন্য। গোয়ালন্দে তিনি জানিয়েছিলেন, দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সান্ত্বনা দিতে এবং নিপীড়িত মানুষের চোখের জল মুছতে তিনি নোয়াখালী যাচ্ছেন।

১৩ নভেম্বর তিনি তাঁর সফরসঙ্গীদের আক্রান্ত গ্রামে গিয়ে বসবাস করার আহবান জানান। হিন্দু সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার জন্য সেখানে থেকে নিজেদের এক ধরনের জিম্মি হিসেবে রাখার কথাও বলেন। ১৯৪৭ সালের ২ জানুয়ারি চন্দীপুরে তিনি নোয়াখালীর মাটিতে আর জুতা না পরে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর নোয়াখালী ও তৎকালীন ত্রিপুরা জেলার বিভিন্ন গ্রামে তিনি খালি পায়ে হাঁটেন। এই সিদ্ধান্তকে শুধু ব্যক্তিগত প্রতীকী আচরণ হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য কমে যায়। সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে যাওয়া এবং তাদের নিরাপত্তা ও আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা ছিল তাঁর সফরের মূল উদ্দেশ্য।

এই সফরে সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে গান্ধীর যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ। সোহরাওয়ার্দী ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রিমিয়ার এবং মুসলিম লীগের অন্যতম প্রধান নেতা। ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও গান্ধী তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও বিতর্কের মধ্যেও আলোচনার পথ খোলা রাখার এই প্রবণতা তাঁর রাজনীতির একটি বৈশিষ্ট্য ছিল।

১৯৪৭ সালের আগস্টে কলকাতায় আবার সাম্প্রদায়িক সহিংসতা শুরু হলে গান্ধী নোয়াখালী যাওয়ার পরিকল্পনা স্থগিত করেন। সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে তিনি কলকাতায় থাকার সিদ্ধান্ত নেন। ১৩ আগস্ট তাঁরা বেলেঘাটার হায়দারি মঞ্জিলে ওঠেন। গান্ধী সেখানে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছিলেন। তাঁর এই অবস্থানের প্রভাবকে পরে ‘কলকাতার অলৌকিক ঘটনা’ বলা হয়। ৩১ আগস্ট কলকাতায় সহিংসতা বাড়লে নোয়াখালী যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল হয়। ১ সেপ্টেম্বর গান্ধী অনশন শুরু করেন। ৪ সেপ্টেম্বর ৭৩ ঘণ্টার অনশন শেষে তিনি তা ভাঙেন। সেদিন রাতে অনেকে অস্ত্র নিয়ে এসে তা সমর্পণ করে এবং সহিংসতা বন্ধের অঙ্গীকার করে।

গান্ধীর রাজনীতির এই অধ্যায় আজও প্রাসঙ্গিক। কারণ অহিংসা তাঁর কাছে শুধু একটি নৈতিক বাণী ছিল না; অন্যায় ও সহিংসতার মুখে মানুষের পাশে দাঁড়ানোও ছিল তার অংশ। রাজনৈতিক বিরোধকে কিভাবে আলোচনার মধ্যে রাখা যায়, প্রতিপক্ষকে শত্রুতে পরিণত না করে কিভাবে মতের সংঘাত সামলানো যায়—তাঁর রাজনৈতিকজীবনে এর নানা দৃষ্টান্ত আছে।

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় প্রশ্নগুলো তাই অপ্রাসঙ্গিক নয়। গণপিটুনি, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা এবং পারিবারিক সহিংসতা—সব ক্ষেত্রেই সহিংসতাকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের ২০২৪ সালের নারীর ওপর সহিংসতা জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অতিরিক্ত কিছু সহিংসতার ধরনসহ হিসাব করলে ৭৬ শতাংশ নারী জীবনে অন্তত একবার ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর সহিংসতার শিকার হয়েছেন। আগের ১২ মাসে এই হার ৪৯ শতাংশ। আর স্বামীর কাছ থেকে শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার নারীদের ৬৪ শতাংশ কাউকে বিষয়টি জানায়নি। শিশুদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের বহু-সূচক গুচ্ছ জরিপের ২০২৫ সালের ফল অনুযায়ী, ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৮৫.৭ শতাংশ শিশু জরিপের আগের এক মাসে পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যদের কাছ থেকে শারীরিক শাস্তি বা মানসিক আগ্রাসনের শিকার হয়েছে।

এই তথ্যগুলো আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায় : একটি সমাজে সহিংসতা কিভাবে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হয়? গান্ধীর কাছ থেকে কোনো অতীতকে হুবহু ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন নেই। তাঁর সময়, রাজনীতি ও সমাজের সঙ্গে আজকের বাস্তবতার পার্থক্য অনেক। কিন্তু মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতার প্রশ্নগুলো এখনো প্রাসঙ্গিক। ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি আততায়ীর গুলিতে গান্ধীর মৃত্যু হয়। তাঁর নোয়াখালী সফর দেশভাগ ঠেকাতে পারেনি, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষও শেষ হয়নি। তবু কোনো রাজনৈতিক উদ্যোগের মূল্য শুধু তার তাৎক্ষণিক ফল দিয়ে নির্ধারিত হয় না।

২০২৬ সালের ২ অক্টোবর তাঁর ১৫৭তম জন্মবার্ষিকী পালিত হয়েছে। নোয়াখালীর আক্রান্ত মানুষের কাছে যাওয়া সেই ৭৭ বছর বয়সী মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার হয়তো কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, বরং একটি নৈতিক অবস্থান—সহিংসতার সময় নিরাপদ দূরত্বে না থেকে মানুষের কাছে যাওয়া। নোয়াখালীর মাটিতে হাঁটা গান্ধী তাই শুধু ইতিহাসের একটি ছবি নন। তিনি আমাদের সামনে কয়েকটি প্রশ্ন রেখে যান : ভয়ের সময় আমরা কার পাশে দাঁড়াব? মতপার্থক্যের সময় আমরা কি কথা বলার পথ খোলা রাখব? আর যাদের নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষমতা নেই, তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব কে নেবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তখনো সহজ ছিল না। এখনো নয়।

লেখক : কলাম লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights