ঘাড় ‘মটকানোর’ অভ্যাস হতে পারে মারাত্মক আত্মঘাতী

অনলাইন ডেস্ক
সারাদিন কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে বসে কাজ করা কিংবা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঝুঁকে মোবাইল ব্যবহারের ফলে ঘাড়ে ক্লান্তি ও আড়ষ্টতা অনুভব করা অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি ঘটনা। এই অস্বস্তি দূর করতে অনেকেই ঘাড় ডানে-বামে সজোরে ঘুরিয়ে ফুটকানো বা ‘মটকানো’র চেষ্টা করেন। সাধারণ একটি শব্দ বা পপের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক স্বস্তি মিললেও চিকিৎসকরা বলছেন এই ক্ষণিকের স্বস্তি ডেকে আনতে পারে বড় ধরনের কোনো বিপর্যয়। নিয়মিত ও সজোরে ঘাড় মটকানোর অভ্যাস একসময় স্ট্রোকের মতো প্রাণঘাতী স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞ স্নায়ুরোগ চিকিৎসকদের মতে, মাঝেমধ্যে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে ঘাড় থেকে শব্দ বের হওয়া ক্ষতিকর না হলেও অস্বস্তি দূর করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে বার বার ঘাড় মোচড়ানো একটি বিপজ্জনক অভ্যাসে পরিণত হতে পারে। এ ধরনের অভ্যাস মূলত মূল সমস্যাটিকে দূর করে না বরং কোনো বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিকে আড়াল করে ফেলে। আধুনিক জীবনযাত্রায় দীর্ঘক্ষণ ভুল ভঙ্গিতে বসে থাকা, একটানা ল্যাপটপ বা স্মার্টফোন ব্যবহারে ঘাড়ের পেশির ওপর যে বাড়তি চাপ তৈরি হয়, তা থেকেই মানুষ এই অনৈচ্ছিক স্বস্তির পথ খোঁজে। তবে চিকিৎসকদের মূল পরামর্শ হলো, এটি ঘাড়ের সুনির্দিষ্ট পেশি বা জোড়ার অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানের কোনো সঠিক পদ্ধতি নয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ঘাড় শুধু মাথার ভার বহন করে না, এটি মস্তিষ্ক ও শরীরের বাকি অংশের সংযোগস্থল হিসেবে কাজ করে। ঘাড়ের ভেতর দিয়ে ওপরের স্পাইনাল কর্ড বা মেরুরজ্জু এবং ভার্টিব্রাল আর্টারি বা ধমনী প্রবাহিত হয়েছে, যা মস্তিষ্কের পেছনের অংশে সরাসরি রক্ত সরবরাহ বজায় রাখে। মস্তিষ্ক কীভাবে দেহের ভারসাম্য, অঙ্গ সঞ্চালন ও সমন্বয় রক্ষা করবে, তা অনেকাংশেই এই অংশের রক্তসঞ্চালনের ওপর নির্ভর করে। ফলে ঘাড় জোরপূর্বক মোচড়ানোর ফলে যদি ওই ধমনীর দেওয়ালে কোনো আঘাত বা সূক্ষ্ম ছিদ্র তৈরি হয়, তবে তাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘ভার্টিব্রাল আর্টারি ডিসেকশন’ বলা হয়। এর ফলে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে স্ট্রোক বা স্থায়ী স্নায়বিক ক্ষতির আশঙ্কা বহুলাংশে বেড়ে যায়।

এ ছাড়া না জেনেশুনে ঘন ঘন ঘাড় মোচড়ালে মেরুদণ্ডের স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বা স্নায়ু চেপে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। অনেক সময় রোগী ঘাড়ে ব্যথার সাথে মাথা ঘোরার অনুভূতিকে সাধারণ মানসিক চাপ বা কানের সমস্যা বলে ভেবে নেন। কিন্তু ঘাড় ঘোরানোর পর যদি মাথা ঘোরা বা ভারসাম্যহীনতার মতো লক্ষণ প্রকাশ পায়, তবে তা সরাসরি মস্তিষ্কের রক্তসংবহন বা স্নায়বিক জটিলতার ইঙ্গিত দেয়। এই ধরনের উপসর্গ অবহেলা করা একেবারেই অনুচিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘাড় মটকানোর অভ্যাসের পাশাপাশি কিছু সুনির্দিষ্ট উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। যেমন, আচমকা তীব্র মাথা ঘোরা, অস্বাভাবিক ও প্রচণ্ড মাথাব্যথা, দৃষ্টিশক্তির ঝাপসা ভাব বা একটি জিনিস দুটো দেখা, কথা জড়িয়ে যাওয়া এবং হাঁটাচলা করতে গিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখতে না পারা। এ ছাড়া হাত বা পায়ে হঠাৎ দুর্বলতা কিংবা অবশ ভাব অনুভব করা, আঙুলে দীর্ঘস্থায়ী ঝিঁঝি ধরা, হাত দিয়ে কোনো জিনিস ধরতে অসুবিধা হওয়া এবং খাবার গিলতে সমস্যা হওয়া কিংবা মুখে অসাড়তা দেখা দিলে কোনোভাবেই দেরি করা যাবে না।

সুতরাং, ক্ষণিক স্বস্তির জন্য নিজের ঘাড়ে অস্বাভাবিক চাপ দেওয়া বন্ধ করতে হবে। ঘাড়ের মাংসপেশির জড়তা কমাতে সঠিক ভঙ্গিতে বসা, নিয়মিত বিরতি নেওয়া এবং হালকা ব্যায়ামের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী ঘাড়ের ব্যথা বা আড়ষ্টতার ক্ষেত্রে নিজে থেকে ঘাড় না মটকিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিরাপদ চিকিৎসা নেওয়াই শ্রেয়।

সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights