চলছে না গাড়ি জ্বলছে না চুলা
জিন্নাতুন নূর
মহেশখালীর ভাসমান একটি এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) কারিগরি ত্রুটির কারণে বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এর প্রভাবে ঢাকাসহ সারা দেশে তীব্র গ্যাসসংকট দেখা দিয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসাবাড়িতে গ্যাসের চুলা এখন মিটমিট করে জ্বলছে। আর নগরীর সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ এতই কম যে কোনো কোনোটি বন্ধ রাখা হয়েছে আবার কিছু স্টেশন বিপজ্জনকভাবে ৬০ পিএসআই চাপের নিচে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহনে গ্যাস দিচ্ছে। প্রাকৃতিক গ্যাসচালিত হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতেও গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় বিক্রি কমেছে। আর গ্যাসচালিত যানবাহনগুলোর ট্রিপ কমে যাওয়ায় চালকদের আয় কমে গিয়েছে।
আবাসিকে মিটমিট করে জ্বলছে চুলা : মিরপুরের রূপনগর এলাকার গৃহিণী শারমিন আক্তার গতকাল সকালের নাস্তা বানাতে গিয়ে দেখেন তার অটোমেটিক গ্যাসের চুলাটি জ্বলছে না। কয়েকবার চেষ্টার পর লাইটার কাছে নিয়ে চুলা জ্বালানোর চেষ্টা করায় আগুন ধরলেও তা মিটমিট করে জ্বলে। কিন্তু এত অল্প তাপে পানি সামান্য গরম করতেও আধাঘণ্টার বেশি লাগছিল। পরে দোকান থেকে পাউরুটি-কলা এনে নাস্তা সারলেও দুপুরে তিনি বাসার বারান্দায় মাটির চুলায় পুরোনো কাগজ পুড়িয়ে কোনো রকম ডাল-ভাত রাঁধেন। মিরপুর সি-ব্লকের বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, গত এক মাস ধরেই গ্যাসের সমস্যায় ভুগছি। কিন্তু গত দুই-তিন দিন ধরে চুলা জ্বলছেই না। সকাল ৭টার পর গ্যাসের চাপ একেবারেই চলে যায়। সারা দিনই কোনো চাপ থাকে না। রাত ১১টার পর কিছুটা চাপ পেলেও মিটমিট করে চুলা জ্বলে। তিনি বলেন, উপায় না থাকায় এখন রাইস কুকার ও ইলেকট্রিক চুলা দিয়ে কাজ সারছি কিন্তু এতে মাসের বৈদ্যুতিক খরচ বেড়ে গিয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গ্যাস সংকটের কারণে রাজধানীর পুরান ঢাকা, হাজারীবাগ, জিগাতলা, রায়েরবাজার, বাড্ডা, খিলগাঁও, মালিবাগ, যাত্রাবাড়ী, নয়াপল্টন, মোহাম্মদপুর, পল্লবীসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা চরম ভোগান্তির মধ্যে আছেন। গ্যাসের দাবিতে অনেক এলাকায় মানববন্ধনও অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
ঝুঁকি নিয়ে চলছে সিএনজি স্টেশন, দীর্ঘ লাইন : গ্যাস সংকটে রাজধানীর সিএনজি স্টেশনগুলোও এখন ঝুঁকি নিয়ে চলছে। সাধারণত গ্যাসের চাপ ৬০ পিএসআই-এর নিচে নামলে সিএনজি স্টেশনে সরাসরি বিস্ফোরণের ঝুঁকি না থাকলেও টেকনিক্যাল ও অপারেশনাল কিছু ঝুঁকি তৈরি হয়। আবার পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না পেয়ে কম্প্রেসার অতিরিক্ত সময় ধরে চললে এর তাপমাত্রা এবং ভ্রাইবেশন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় যা সিলিন্ডার বা গাড়ির যন্ত্রাংশের ক্ষতি করে। আবার কম চাপে বারবার মেশিন চালু-বন্ধ করলে ভালভ, গ্যাসকেট এবং পাইপলাইনের জোড়ায় অতিরিক্ত চাপ পড়ে গ্যাস লিক হওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়। এ অবস্থায় ঢাকার অনেক সিএনজি স্টেশন এখন ৬০ পিএসআই-এর নিচে চাপ নিয়ে চলছে।
মিরপুর-১২ নম্বরের ইন্ট্রাকো সিএনজি অ্যান্ড ফিলিং স্টেশনের বিক্রয় কর্মকর্তা মো. আশিক গতকাল দুপুরে বলেন, আমাদের ৬টি নজেলে এখন ৪৫ থেকে ৫০ পিএসআই চাপে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। গ্যাস না থাকলে স্টেশন বন্ধও রাখতে হচ্ছে। গত বুধবার ৩টা থেকে ৯টা পর্যন্ত স্টেশন বন্ধ ছিল। রাতে চাপ সামান্য বাড়ে। গত তিন দিন ধরে চাপ একেবারেই কম।
এ স্টেশন থেকে কিছুটা সামনেই অবস্থিত সিরামিক ওয়ার্কস সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গতকাল ৩ ঘণ্টা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস নিতে পারেননি উত্তরার প্রাইভেট গাড়িচালক মো. মফিজ। তিনি বলেন, আগে ১ হাজার টাকা গ্যাস নিতে পারলেও এখন সর্বোচ্চ ২০০ টাকার গ্যাস পাচ্ছেন। এ স্টেশনের ক্যাশিয়ার বদরুল হাসান জানান, গতকাল দুপুরে গ্যাসের চাপ ছিল ৭৫ পিএসআই। গ্যাসের চাপ ৬০ এর নিচে নেমে গেলে আমরা ‘গ্যাস নেই’ এমন সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেই।
গ্যাস চালিত গাড়িচালকদের আয়ে টান : গ্যাস স্বল্পতায় সিএনজি গ্যাসচালিত গাড়িগুলোর আয়ে টান পড়েছে। গ্যাস নিতে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে এবং পর্যাপ্ত গ্যাস নিতে না পেরে গাড়িচালকরা পর্যাপ্ত ট্রিপ দিতে পারছেন না। বিশেষ করে রাইড শেয়ারিং গাড়ির চালকদের আয় বন্ধ হওয়ার পথে। কুড়িল বিশ্বরোডে মনির হোসেন নামের উবারের গাড়িচালক বলেন, পাঁচ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পর মাত্র ১১৮ টাকার গ্যাস নিতে পেরেছি। এ পরিমাণ গ্যাস দিয়ে গাড়ি চালানো যাচ্ছে না। সারা দিনে মাত্র ২০০ টাকার ট্রিপ দিয়েছি। কিন্তু গ্যাস নিতে লাইনে দাঁড়াতে ৫০০ টাকার তেল খরচ করেছি। এ অবস্থায় রোজগার বন্ধ হওয়ার পথে। আগের দিনে হাজার-দেড় হাজার টাকা আয় হলেও এখন ২০০ টাকাও আয় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ঢাকার বেশির ভাগ গ্যাস স্টেশন বন্ধ। আর যেগুলো খোলা আছে সেখানে মানুষের ভোগান্তি হচ্ছে। এ ছাড়া গ্যাসের অভাবে এরই মধ্যে ঢাকার অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যানবাহনগুলোর চলাচল এখন বন্ধ।
বিক্রি কমেছে রেস্টুরেন্টে : গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় রাজধানীর যে হোটেল-রেস্তোরাঁগুলো রান্নার কাজে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করে সেগুলোতেও বিক্রি কমেছে। খিলক্ষেতের একটি খাবার হোটেলের কর্মচারী রুবেল জানান, গ্যাস না থাকায় গত দুই দিন ঠিকমতো রান্না করতে পারছে না। খাবার খেতে এসে অনেকেই ফিরে গিয়েছে। ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে লাকড়ি-কয়লা কিনে রান্নার কাজ করছে অনেক খাওয়ার হোটেল মালিক।
এফএসআরইউর ঠিক করতে যুক্তরাজ্যের বিশেষজ্ঞ দল ঢাকায় : দেশের স্থানীয় প্রকৌশলীরা এফএসআরইউ-এর কারিগরি ত্রুটি ঠিক করতে না পারায় এবার যুক্তরাজ্য থেকে একটি বিশেষজ্ঞ দল ঢাকায় এসে পৌঁছেছে। গতকাল বিকালে দলটি এফএসআরইউটি পরীক্ষা করার জন্য রওনা হন। রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের এলএনজি ডিভিশনের উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী কে এম জহিরুল ইসলাম গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এফএসআরইউ-টির কারিগরি ত্রুটি সারাতে যুক্তরাজ্য থেকে একটি বিশেষজ্ঞ দল এরই মধ্যে বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছে। তবে এ কারিগরি ত্রুটি অগ্নিকাণ্ডের জন্য হয়েছে কি না তা এখনো তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারেননি। আজ শুক্রবার দুপুরের পর বিশেষজ্ঞ দলটি কী কারণে এ কারিগরি ত্রুটি হয়েছে সে বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরবেন। তখন জানা যাবে এফএসআরইউ-এর ত্রুটি কবে নাগাদ ঠিক করা যাবে।
