ট্রাম্পের মেয়াদ না ফুরালে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আসবে না?
অনলাইন ডেস্ক
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, যার থেকে বেরিয়ে আসার কিংবা টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার কোনো তাৎক্ষণিক সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। তেহরান ও ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ এবং অবস্থান পর্যালোচনায় এশিয়া টাইমসের এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, দেশটির রাজনীতি ও সামরিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত বেশিরভাগ বড় খেলোয়াড়ই এখন একই মত পোষণ করছেন। তারা ধরে নিচ্ছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদকালে এই অঞ্চলে স্থায়ী কোনো শান্তির সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।
ফলস্বরূপ, ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলো এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা সামরিক চাপ ও রাজনৈতিক ভুল পদক্ষেপগুলোকে অগ্রাহ্য করে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার ও ধৈর্য ধারণের কৌশল অবলম্বন করছে।
ইরানের বিরুদ্ধে আট মাস ধরে চলা এই যুদ্ধে ওয়াশিংটন এখন পর্যন্ত তেহরানের রাজনৈতিক ও সামরিক আত্মবিশ্বাস ভাঙতে সক্ষম হয়নি। একই সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ বা পরিস্থিতি শান্ত করার মতো কোনো সুনির্দিষ্ট এবং বাস্তবসম্মত পথও খুঁজে পায়নি যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক মন্তব্যগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তার বিকল্পগুলোর পরিধি ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। বিখ্যাত ‘টাইম’ সাময়িকীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন যে, ইরানের সাথে কোনো ধরনের স্থায়ী শান্তি চুক্তি সম্ভব বলে তিনি মনে করেন না। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকদের মতে, দায়িত্বে থাকা একজন বিশ্বনেতার জন্য এমন মন্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যা এই ইঙ্গিত দেয় যে প্রশাসন দীর্ঘমেয়াদী কূটনীতির চেয়ে অনড় অবস্থানকেই প্রাধান্য দিচ্ছে।
অন্যদিকে, তেহরানও তাদের নিজস্ব শর্তাবলি এমনভাবে তৈরি করেছে যা ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে মেনে নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ইরানের স্পষ্ট বার্তা হলো— নতুন করে কোনো আলোচনায় বসার আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সব ধরনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক হুমকি পুরোপুরি তুলে নিতে হবে। এর পাশাপাশি, ইরান তাদের পরিশোধিত ইউরেনিয়াম বাইরে পাঠানোর যেকোনো প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। উভয় পক্ষই যখন তাদের অবস্থান থেকে এক চুলও সরতে নারাজ, তখন এটা স্পষ্ট যে কেউই আসলে সমঝোতার জন্য টেবিলে বসেনি। তারা প্রত্যেকেই কেবল একে অপরের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পটভূমি ও পরিস্থিতি পরিবর্তনের অপেক্ষা করছে।
তবে ওয়াশিংটনের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ট্রাম্পের জন্য এক বিরাট চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্টের জনসমর্থনের হার প্রায় ৩৯ শতাংশে নেমে এসেছে এবং এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত খনিজ তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১১০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। রাজনৈতিক সংকটের কারণে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ ইতোমধ্যে তিনবার যুদ্ধ ক্ষমতা সীমিত করার পক্ষে ভোট দিয়েছে। এমনকি প্রতিযোগিতামূলক আসনের বেশ কয়েকজন রিপাবলিকান প্রার্থীও এখন জ্বালানি তেলের দাম কমানো এবং যুদ্ধ বন্ধের দাবি তুলে প্রকাশ্যে প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছেন।
রাজনৈতিকভাবে ব্যাকফুটে থাকা সত্ত্বেও হোয়াইট হাউস থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, নির্বাচনের আগে কোনো বড় ধরনের নতুন বিমান হামলা চালানো হবে না। কিন্তু একই সময়ে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডকে পুনরায় বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করার প্রস্তুতি রাখতে বলা হয়েছে। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, ভোটের দিন ঘনিয়ে আসার আগেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের নির্দেশ দিতে পারেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য পরাজয় ট্রাম্পকে আরও বেপরোয়া করে তুলতে পারে, কারণ ক্ষমতার শেষ সময়ে ভোটের সমীকরণের তোয়াক্কা না করে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তার কোনো ভয় থাকবে না। তবে সাম্প্রতিক পলিটিকো জরিপ অনুযায়ী, ৪৬ শতাংশ ভোটার মনে করেন নির্বাচন আয়োজনের ঠিক আগে যুদ্ধ বন্ধ হলেও তা তাদের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবে না।
এদিকে ইরান তাদের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোর সুরক্ষা ব্যবস্থা কয়েক গুণ জোরদার করেছে এবং একই সাথে সতর্ক করে দিয়েছে যে, নতুন কোনো মার্কিন হামলা হলে তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে আঞ্চলিক জ্বালানি পরিকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে। ফলে শেষ মুহূর্তে যেকোনো আক্রমণ তেলের বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। এই পরিস্থিতির গভীরতা বুঝতে পেরে প্রেসিডেন্টের অভ্যন্তরীণ চক্রের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরাও যুদ্ধের পরবর্তী পরিস্থিতির জন্য নিজেদের গুটিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স শুরু থেকেই এই যুদ্ধের ব্যাপারে কিছুটা সতর্ক ও সংশয়ী ছিলেন। তিনি সাম্প্রতিক সময়ে নিজের অবস্থান খানিকটা দূরে রেখেছেন এবং ইজরায়েলের আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর পক্ষে প্রকাশ্যে সমর্থন জানাতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। ভ্যান্সের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী তথা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই সময়ে ইরান সমস্যা থেকে দূরে থেকে বাণিজ্য সংক্রান্ত কাজে ভারত সফরে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। বিপরীতে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ট্রাম্পের নেতানিয়াহু সমর্থনের পরদিনই ইসরায়েল সফর করে নিজের অবস্থান জোরালো রাখার চেষ্টা করছেন, যা নিয়ে প্রশাসনিক ভেতরে রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরির গুঞ্জন রয়েছে।
আন্তর্জাতিক এই উত্তেজনার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর। উপসাগরীয় দেশগুলো নিশ্চিত হয়েছে যে, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি দীর্ঘস্থায়ী বা নির্ভরযোগ্য নয়, যার কারণে তারা নিজস্ব উদ্যোগে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুরু করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হওয়া ইরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের জোটে যোগ দিলেও, অতি সম্প্রতি তারা তেহরানের সাথে সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগ তৈরি করেছে। মার্কিন কৌশলের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে সংঘাত এড়ানো এবং ইয়েমেন সংকটের কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজা এখন তাদের মূল লক্ষ্য। কয়েক হাজার ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার অভিজ্ঞতা অর্জনের পর আবুধাবি এখন ওয়াশিংটনের অনিশ্চিত রাজনৈতিক পদক্ষেপের তোয়াক্কা না করে নিজেদের সুরক্ষায় স্বতন্ত্র বোঝাপড়া তৈরির চেষ্টা করছে।
ইয়েমেন সংকটের দিকে তাকালে মার্কিন নীতির এই দোলাচল আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের বিমান হামলার বারবার অনুরোধ যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার ফিরিয়ে দিয়েছে এবং আপাতত প্রত্যক্ষ কোনো সামরিক অভিযানে জড়াবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। ওয়াশিংটন সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া বন্ধ করায় সংযুক্ত আরব আমিরাত ইয়েমেনের দক্ষিণ অংশের হুতি-বিরোধী বাহিনীকে পুনরায় আর্থিক সহায়তা প্রদানে সম্মতি প্রকাশ করেছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কোনো রকম সরাসরি হামলায় অংশ না নিয়েও তাদের মিত্রদের দিয়ে প্রক্সি লড়াই বজায় রাখতে পারছে।
তেহরানের বর্তমান কৌশলটি মূলত ধৈর্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ইরানের নীতিনির্ধারকরা নিশ্চিত যে, ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা এই অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ অন্তত আরও এক বা দুই বছর সহ্য করে নিতে পারবেন। সৌদি আরবের প্রতি তেহরানের সাম্প্রতিক আচরণও এই হিসেব-নিকেশের কথাই মনে করিয়ে দেয়। হুথি হামলায় সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে প্রাণহানি ঘটার পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি রিয়াদকে ফোন করে হুথিদের সাথে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছেন এবং সামরিক সমাধানের বদলে রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো সৌদি অবকাঠামো ধ্বংস করা নয়, বরং তাদের এটা বোঝানো যে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর অন্ধ বিশ্বাস রাখা ঝুঁকিপূর্ণ এবং ইসরায়েলের সাথে নৈকট্য বৃদ্ধির চড়া মূল্য দিতে হতে পারে। রিয়াদও এই পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে শুরু করেছে, কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনিক ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত এ জটিলতা কমার সুযোগ খুব কম।
সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া ঠিক কী হবে, বিশেষ করে নেতানিয়াহুর বর্তমান মেয়াদকাল ও তার পরবর্তী সময়ে দেশটির অবস্থান কী দাঁড়াবে। ট্রাম্প ইতোমধ্যে ইরান ইস্যুতে কাজ শেষ করার জন্য নেতানিয়াহুকে সমর্থন দিয়েছেন এবং ইসরায়েল তাদের নিজস্ব নির্বাচনের আগে বড় কোনো মার্কিন হামলার ঝুঁকি না নেওয়ার অনুরোধ করেছে। তবে সমীক্ষা অনুযায়ী নেতানিয়াহুর জোট সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন সংখ্যা পাওয়ার ক্ষেত্রে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। যদি ক্ষমতায় কোনো পরিবর্তন আসে এবং গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বে নতুন প্রশাসন গঠিত হয়, তবে তারা পারমাণবিক ইস্যুতে কড়া অবস্থান রাখলেও ট্রাম্পের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভাগ্যের ওপর ইসরায়েলের কৌশল সম্পূর্ণ সঁপে দেবে না।
কিন্তু অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র সরে দাঁড়ানোর পর যদি ইসরায়েল এককভাবে কোনো সামরিক অভিযান চালায়, তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিজেদের নিরাপদ রাখার কূটনৈতিক চেষ্টা আরও দ্রুত বিস্তার লাভ করবে এবং রিয়াদ ও তেল আবিবের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিককরণের প্রক্রিয়া পুরোপুরি অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। পরিস্থিতি যেদিকেই যাক না কেন, তেহরান থেকে শুরু করে সমগ্র উপসাগরীয় অঞ্চল এখন নিজেদের রাজনৈতিক হিসেব চূড়ান্ত করে ট্রাম্প প্রশাসনের মেয়াদ শেষের এবং হোয়াইট হাউসে নতুন কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ চেয়ে রয়েছে।
