ডেঙ্গু হলে কী করবেন, কী কী করবেন না

অনলাইন ডেস্ক

প্রতিনিয়ত বাড়ছে ডেঙ্গুর ঝুঁকি। হঠাৎ জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরব্যথা কিংবা দুর্বলতা শুরুতে এসব উপসর্গকে অনেকেই সাধারণ জ্বর ভেবে অবহেলা করেন। অথচ ডেঙ্গু হলে রোগের শুরু থেকেই সতর্ক থাকা জরুরি। বিশেষ করে জ্বরের প্রথম ২৪ ঘণ্টা রোগীর অবস্থা বোঝা এবং পরবর্তী জটিলতা এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছরে ডেঙ্গুতে ২৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে মোট ভর্তি হয়েছেন মোট ৭৯ হাজার ৬২০ জন।

ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। তাই উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ, বিশ্রাম এবং বিপজ্জনক লক্ষণগুলো পর্যবেক্ষণ করাই প্রাথমিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

জ্বরের সঙ্গে যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন

হঠাৎ ১০১ থেকে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, পেশি ও জোড়ায় ব্যথা, অতিরিক্ত দুর্বলতা, বমি বা বমিভাব, ক্ষুধামন্দা এবং ত্বকে লালচে দানা বা র‍্যাশ দেখা দিতে পারে ডেঙ্গুতে। এসব উপসর্গ দেখা দিলে শুধু অনুমানের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া

জ্বর হলেই ডেঙ্গু হয়েছে -এমনটা যেমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়, তেমনি সাধারণ জ্বর ভেবেও অবহেলা করা উচিত নয়। জ্বর শুরুর পর যত দ্রুত সম্ভব নিবন্ধিত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা ভালো। রোগীর উপসর্গ ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করবেন।

শরীরে পানির ঘাটতি হতে দেবেন না

ডেঙ্গুতে পানিশূন্যতার ঝুঁকি থাকে। তাই শুরু থেকেই পর্যাপ্ত তরল পান করা জরুরি। বিশুদ্ধ পানি, ওরস্যালাইন, ডাবের পানি, লেবুর শরবত, স্যুপ, পাতলা ভাতের মাড় কিংবা অতিরিক্ত চিনি ছাড়া ফলের রস খাওয়া যেতে পারে। একসঙ্গে বেশি না খেয়ে অল্প অল্প করে বারবার তরল গ্রহণ করা সুবিধাজনক।

জ্বর কমাতে ওষুধে সতর্কতা

ডেঙ্গুতে জ্বর ও ব্যথার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল ব্যবহার করা হয়। তবে নিজে থেকে আইবুপ্রোফেন, ডাইক্লোফেনাক, ন্যাপ্রোক্সেন বা অ্যাসপিরিনজাতীয় ওষুধ খাওয়া উচিত নয়। এগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বেশি জ্বর হলে ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছে কিছুটা আরাম দেওয়া যেতে পারে।

প্রথম দিনেই পরীক্ষা সব সময় জরুরি নয়

জ্বরের একেবারে শুরুতেই পরীক্ষা করালে সব ক্ষেত্রে নির্ভুল ফল পাওয়া নাও যেতে পারে। রোগের সময়কাল ও উপসর্গ বিবেচনা করে চিকিৎসক এনএস১ অ্যান্টিজেন, সম্পূর্ণ রক্তের পরীক্ষা বা প্রয়োজনীয় অন্য পরীক্ষা দিতে পারেন। তাই নিজের সিদ্ধান্তে পরীক্ষা বা রিপোর্টের ফল দেখে চিকিৎসা শুরু না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করা উচিত।

শুধু প্লাটিলেট নয়, নজর দিতে হবে পুরো শরীরে

ডেঙ্গু হলে প্লাটিলেট কমে যাওয়াকে ঘিরে আতঙ্ক তৈরি হয়। কিন্তু রোগীর অবস্থা নির্ধারণে শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যা যথেষ্ট নয়। রক্তচাপ, নাড়ির গতি, রক্তক্ষরণের লক্ষণ, প্রস্রাবের পরিমাণ এবং সামগ্রিক শারীরিক অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই রিপোর্টে প্লাটিলেট কম দেখলেই আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

যে লক্ষণগুলো দেখা দিলে দেরি নয়

তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া, কালো বা রক্তমিশ্রিত পায়খানা, শ্বাসকষ্ট, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব, অচেতন হওয়ার প্রবণতা কিংবা প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। এসব লক্ষণ গুরুতর জটিলতার ইঙ্গিত হতে পারে।

বিশ্রামের পাশাপাশি খাবারেও নজর

ডেঙ্গুতে ক্ষুধা কমে যেতে পারে। তবু শরীরের শক্তি ধরে রাখতে সহজপাচ্য খাবার খাওয়ার চেষ্টা করা উচিত। নরম ভাত, খিচুড়ি, ডাল, স্যুপ, দই, মৌসুমি ফল ও সিদ্ধ সবজি অল্প অল্প করে খাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামও জরুরি।

যা করবেন না

ডেঙ্গু জ্বরের ক্ষেত্রে প্লাটিলেট এখন আর মূল বিষয় নয়। প্লাটিলেট হিসাব নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। তবে প্লাটিলেট কাউন্ট ১০ হাজারের নিচে নামলে বা শরীরের কোনো জায়গা থেকে রক্তপাত হলে প্রয়োজন বোধে প্লাটিলেট বা ফ্রেশ রক্ত দেওয়া যেতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি খুবই কম দেখা যায়।

অনেকের ধারণা, পেঁপেপাতার জুস ইত্যাদি খেলে প্লাটিলেট বাড়ে। আসলে এসবের বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি নেই। জ্বর কমে যাওয়ার পর সংকটকাল পেরিয়ে গেলে আপনা থেকেই প্লাটিলেট বাড়তে শুরু করে।

ডেঙ্গু জ্বরের শেষের দিকে রক্তচাপ কমে যেতে পারে অথবা মাড়ি, নাক, মলদ্বার দিয়ে রক্তপাত হতে পারে। এ রকম হলে প্রয়োজনে শিরাপথে স্যালাইন দেওয়া লাগতে পারে। এসব ক্ষেত্রে তাই হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।

তথ্যসূত্র: ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights