দক্ষিণ সুদানে চরম ত্রাণ সংকট: অনাহারের ঝুঁকিতে ১০ লাখ মানুষ

অনলাইন ডেস্ক
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) সতর্কবার্তা অনুযায়ী, দ্রুত অতিরিক্ত তহবিল ও সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে দক্ষিণ সুদানে আগামী অক্টোবরের মধ্যেই ১০ লাখের বেশি মানুষ চরম অনাহারের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। গত বছর এই সময়ে যেখানে ১০ হাজার মেট্রিক টন খাদ্য মজুদ ছিল, তা এখন নেমে এসেছে ৩০০ মেট্রিক টনেরও নিচে। একদিকে মানবিক সংস্থাগুলোর তহবিল সংকোচন, অন্যদিকে ক্রমাগত চাহিদা বৃদ্ধি—এই দুইয়ের চাপে পিষ্ট হচ্ছে পুরো অঞ্চল।

চলতি মাসে ডব্লিউএফপির সহকারী নির্বাহী পরিচালক ম্যাথিউ হোলিংওয়ার্থ আপার নীল রাজ্যের রেনক ও মালাকাল এবং জংলেই রাজ্যের পিগি কাউন্টি পরিদর্শন করেন। তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন, সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, ক্ষুধা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় পরিস্থিতি কীভাবে দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে। হোলিংওয়ার্থ জানান, সুদানের সংঘাতের ফলে পণ্য আমদানির জটিলতা বেড়েছে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। এতে আগে থেকেই সংকটে থাকা দক্ষিণ সুদানের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, সুদানের যুদ্ধ এই দেশটির উত্তরাঞ্চলের জন্য ধ্বংসাত্মক প্রমাণিত হয়েছে। সেখানে পণ্য আমদানির জটিলতার কারণে দাম অনেক বেড়ে গেছে। এর সাথে, বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর আগমন এমন একটি দেশে ঘটছে, যা তাদের সাহায্য করার ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে চরম হিমশিম খাচ্ছে।

পিগি কাউন্টির বাস্তুচ্যুত অধিবাসী পিটার মেকার জানান, জাতীয় নিরাপত্তাহীনতা ও অন্যান্য এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষের আগমনের কারণে স্থানীয়দের জন্য কৃষিকাজ বা কাজ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। আমাদের মূল সমস্যা অনিরাপত্তা এবং ফসলি জমিতে প্রবেশাধিকার না পাওয়া। যদিও আমি কাজ করতে সক্ষম এবং যোগ্য, কিন্তু অনিরাপত্তার কারণে বাইরে গিয়ে চাষাবাদ বা চাকরির খোঁজে যাওয়ার উপায় নেই। ফলে আমাদের জাতিসংঘ এবং ত্রাণের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দাবি জানিয়ে পিটার সতর্ক করেন, ত্রাণ সহায়তা আরও কমানো বা বন্ধ করা হলে তা ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে। তিনি স্থানীয় দুর্ভোগের জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সামাজিক বিভাজনকে দায়ী করেন।

চাপের মুখে সীমান্ত
২০২৩ সালের এপ্রিলে সুদানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আপার নীল রাজ্যের রেনক সীমান্ত অঞ্চল যুদ্ধকবলিত মানুষের প্রধান প্রবেশদ্বারে পরিণত হয়েছে। ডব্লিউএফপির তথ্যমতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ১৪ লাখের বেশি শরণার্থী ও প্রত্যাবর্তনকারী দক্ষিণ সুদানে প্রবেশ করেছেন। পথিমধ্যে চাঁদা দাবি, সহিংসতা ও অসংখ্য চেকপয়েন্ট পার হয়ে পৌঁছানো এসব মানুষ জানেন না সামনে তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে।

রেনকের একটি ট্রানজিট সেন্টারে অবস্থানরত ছয় সন্তানের জননী জয়নাব মুসা সম্প্রতি সুদান থেকে সীমান্ত পার হয়েছেন। তিনি জানান, সেখানে পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন এবং খাওয়ার মতো কিছুই নেই। তিনি বলেন, মানবিক পরিস্থিতি খুবই কঠিন, এখানে অনাহার ছাড়া কিছুই নেই। সাহায্য পাওয়ার আশায় জোধা সীমান্ত থেকে রেনকের এই ট্রানজিট সেন্টারে এসেছি।

রেনকের ট্রানজিট সেন্টারগুলো এত বিপুলসংখ্যক মানুষের আশ্রয়ের জন্য তৈরি করা হয়নি। সেখানে পরিবারগুলো মালাকাল বা অন্যান্য অঞ্চলে যাওয়ার পরিবহনের জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করছে।

তহবিল সংকটের কারণে ডব্লিউএফপি ইতোমধ্যে ত্রাণের রেশনের পরিমাণ কমাতে বাধ্য হয়েছে। গত আগস্টে ডব্লিউএফপি এবং জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) সতর্ক করেছিল যে, সাড়ে ৬ লাখের বেশি শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থী খাদ্য সহায়তা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। অতিরিক্ত তহবিল না পেলে সেপ্টেম্বরের মধ্যেই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২ লাখ ৪০ হাজার শরণার্থীর খাদ্য ও পুষ্টি সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল।

সুদানি শরণার্থী নুরা মোহাম্মদ আহমেদ জানান, ক্ষুধা ও পুষ্টিহীনতা ইতোমধ্যে ট্রানজিট সেন্টারে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।

মালাকালের ভঙ্গুর আশ্রয়
বহু বছর ধরেই মালাকাল সংঘাত ও দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর আশ্রয়স্থল। সাবেক ‘বেসামরিক সুরক্ষা কেন্দ্র’টিকে চলতি বছরের শুরুর দিকে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতদের (আইডিপি) এলাকায় রূপান্তরিত করা হয়। সেখানে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ (৬ হাজারের বেশি পরিবার) বসবাস করছেন, যাদের অনেকেই বছরের পর বছর ধরে বাস্তুচ্যুত।

তবে মৌলিক সেবাগুলো এখন চরম হুমকির মুখে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) সতর্ক করেছে, তহবিলের অভাবে বেন্টিউ ও মালাকালে পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও বাঁধ সংস্কার না করা হলে বর্ষাকালে মালাকাল মারাত্মক বন্যার মুখে পড়বে।

চার সন্তানের জননী নাজাহ আল-তৈয়ব আল-ফাদুল ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তার স্বামী নিহত হওয়ার পর রেনকের ট্রানজিট সেন্টারে পৌঁছান। তিনি বলেন, সুদানের সশস্ত্র বাহিনী আমার চোখের সামনে আমার স্বামীকে হত্যা করে। সন্তানদের নিয়ে সেখানে থাকার মতো মনোবল আমার ছিল না। আমি দক্ষিণ সুদানে এসে রেনকভিত্তিক মানবিক সংস্থাগুলোর সাহায্যে ছোটখাটো কাজ করে উপার্জনের চেষ্টা করেছি।

কলেজ ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও স্থিতিশীল চাকরি পাচ্ছেন না নাজাহ। বাজারে কাজ করে দিনে সর্বোচ্চ ২.৫০ ডলারের মতো আয় করেন তিনি। অশ্রুসজল কণ্ঠে তিনি বলেন, এখানে শিশুদের মধ্যে ক্ষুধা, অসুস্থতা ও অপুষ্টির হার ব্যাপক। এমনকি আমার এক সন্তান হৃদরোগে আক্রান্ত, যার চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য আমার নেই। ডব্লিউএফপি শুধু বাচ্চাদের জন্য সামান্য রেশন দিচ্ছে। অনাহারের কারণে বড়দের কাজ করার শক্তিটুকুও নেই।

তহবিলের বিশাল ঘাটতি
ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে তাদের ৮ কোটি ৬০ লাখ (৮৬ মিলিয়ন) ডলার তহবিলের ঘাটতি রয়েছে। আগামী ছয় মাসের জন্য প্রয়োজন ৪১ কোটি ৬০ লাখ (৪১৬ মিলিয়ন) ডলার। এই অর্থ না পেলে শরণার্থী, বাস্তুচ্যুত ও স্থানীয় দুস্থ অধিবাসীদের সহায়তা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

সারাদেশের সামগ্রিক চিত্র আরও করুণ। সংস্থাটির মতে, দক্ষিণ সুদানের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি—অর্থাৎ ৭৮ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগছে এবং ২২ লাখ শিশু মারাত্মক অপুষ্টিতে আক্রান্ত। একই সঙ্গে, ২০২৬ সালের অবশিষ্ট সময়ের জন্য ডব্লিউএফপির দক্ষিণ সুদান জরুরি সাড়াদান তহবিলে ২৫ কোটি ৮ লাখ (২৫৮ মিলিয়ন) ডলারের ঘাটতি রয়েছে।

সুদান থেকে পালিয়ে আসা মানুষের যন্ত্রণা সীমান্ত পার হওয়ার পরও শেষ হচ্ছে না। নুরা মোহাম্মদ আহমেদের কথায় শরণার্থীদের করুণ বাস্তবতা উঠে এসেছে। তার ভাষ্য, ক্ষুধা ও পুষ্টির অভাবে এখানে অনেকেই মারা গেছেন। শক্তি পাওয়ার মতো কোনো খাবার নেই। আমাদের সামনে এখন দুটি পথ—ঝুঁকি সত্ত্বেও যুদ্ধকবলিত সুদানে ফিরে যাওয়া, অথবা এখানে অনাহারে মারা যাওয়া।

সূত্র : আল-জাজিরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights