দল সামলানোর পরীক্ষায় রিজভী

নিজস্ব প্রতিবেদক

দীর্ঘদিন রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে থাকা বিএনপি এখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে। বিরোধী দল থেকে ক্ষমতাসীন দলে রূপান্তরের এই সময়ে দলটির সাংগঠনিক কাঠামো সক্রিয় ও নেতা-কর্মীদের শৃঙ্খলায় রাখা এবং সরকার ও দলের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। আর এই চ্যালেঞ্জের বড় অংশ এখন এসে পড়েছে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর ওপর। গত ২০ আগস্ট বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান রিজভী। এর আগে দীর্ঘদিন তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করেছেন।

রুহুল কবির রিজভী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, তিনি সাংগঠনিক সক্রিয়তা, জনসমর্থন ধরে রাখা, নেতা-কর্মীদের শৃঙ্খলা এবং দল ও সরকারের মধ্যে গতিশীলতা বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেবেন। তিনি বলেন, সারা দেশ থেকে নেতা-কর্মীরা এসে যেন তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারেন, সেই পরিবেশ তিনি করে দেবেন। সামগ্রিকভাবে দলকে আরও বেশি সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার জন্য যা দরকার, বিএনপি চেয়ারম্যানের পরামর্শক্রমে সবই তিনি করবেন।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মূল চালিকাশক্তি ছিল আন্দোলন। কিন্তু সরকারে এসে সেই কাঠামোকে নতুন বাস্তবতায় রূপ দিতে হবে। ফলে রিজভীর দায়িত্ব শুধু সাংগঠনিক নির্দেশনা দেওয়া নয়; বরং ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কীভাবে গড়ে উঠবে, তার ওপরও তাঁর ভূমিকার প্রভাব পড়বে।

রিজভীর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ক্ষমতার সঙ্গে দলের সাংগঠনিক দূরত্ব তৈরি হতে না দেওয়া। সরকারে গেলে অনেক সময় দলের সাংগঠনিক তৎপরতা কমে যায়। বিএনপির ক্ষেত্রে সেটি যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে তাঁকে গুরুত্ব দিতে হবে। সারা দেশে দলকে আরও শক্তিশালী, সুসংগঠিত ও সুসংহত করতে হবে। এটি বাস্তবে সহজ হবে না। সরকার পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও দলীয় নেতারা প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকছেন। স্থানীয় পর্যায়েও জনপ্রতিনিধি ও নেতাদের ওপর সরকারি দায়িত্বের চাপ থাকছে। এর ফলে দলীয় কার্যালয়, সাংগঠনিক সভা, তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ ও নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ভাটা পড়ার শঙ্কা রয়েছে। এ জায়গায় রিজভীকে নিশ্চিত করতে হবে-সরকারের ব্যস্ততার কারণে যেন বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো কাগজকলমে সীমাবদ্ধ হয়ে না পড়ে। দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ দল ও সরকারের মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য সৃষ্টি করা। বিএনপি এখন একই সঙ্গে রাজনৈতিক দল এবং রাষ্ট্র পরিচালনাকারী। ফলে দলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সরকারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সমন্বয় যেমন প্রয়োজন, তেমন দুটির স্বতন্ত্র ভূমিকাও বজায় রাখা জরুরি।

সাম্প্রতিক সময়ে দলীয় পদে থাকা কয়েকজন বিএনপি নেতাকে সরকারি সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া নিয়েও গণমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি সংস্থায় নিয়োগ পাওয়া কয়েকজন বিএনপি নেতা দলীয় পদ ছাড়েননি, যদিও নিয়োগের শর্তে সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্কত্যাগের কথা। এ ধরনের পরিস্থিতিতে দল ও সরকারের ভূমিকার সীমারেখা স্পষ্ট করা রিজভীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।

ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় বিএনপির নেতা-কর্মীরা দীর্ঘদিন মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক চাপের মুখে ছিলেন। ক্ষমতায় আসার পর তাঁদের একটি অংশ স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবশালী অবস্থানে এসেছে। এখন কোনো নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখল, প্রভাব বিস্তার কিংবা দলীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কী ব্যবস্থা নেয়, সেটিই জনমনে বিএনপির ভাবমূর্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ হবে। বিএনপির মতো বড় সংগঠনে স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব নতুন নয়। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পর নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসায় অনেক নেতা-কর্মীর প্রত্যাশাও বেড়েছে। ফলে পদপদবি, সরকারি সুযোগসুবিধা, স্থানীয় নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে বিরোধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিরোধী দলে থাকার সময় রিজভী নিয়মিত দলীয় কার্যালয়ে বসে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলতেন। নতুন দায়িত্বেও সেই যোগাযোগ ধরে রাখা তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে। কারণ দীর্ঘদিনের আন্দোলনে যাঁরা মাঠে ছিলেন, তাঁদের অনেকের প্রত্যাশা এখন স্বভাবতই বেড়েছে। কেউ সাংগঠনিক স্বীকৃতি চান, কেউ পদ চান, আবার কেউ দীর্ঘদিনের ত্যাগের মূল্যায়ন প্রত্যাশা করেন। এসব প্রত্যাশা পূরণে ভারসাম্য রাখতে না পারলে স্থানীয় পর্যায়ে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। তাই কেন্দ্র থেকে শুধু নির্দেশনা পাঠানোর বদলে মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের কথা শোনা এবং তাঁদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করা রিজভীর সাংগঠনিক সক্ষমতার বড় পরীক্ষা।

বিএনপির সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হলো ক্ষমতায় থেকেও জনসমর্থন ধরে রাখা। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় একটি দলের জনপ্রিয়তার বড় ভিত্তি থাকে সরকারের সমালোচনা। কিন্তু ক্ষমতায় এসে সেই অবস্থান বদলে যায়। তখন জনগণ সরকারের কাজের ফলাফল দিয়ে দলকে বিচার করে।

দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, কর্মসংস্থান, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক সংস্কার ও নাগরিক সেবা-এসব বিষয়ে সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতার প্রভাব সরাসরি বিএনপির জনপ্রিয়তার ওপর পড়বে। ফলে রিজভীকে দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি জনসম্পৃক্ততার নতুন কৌশলও তৈরি করতে হবে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দীর্ঘদিন বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তারপর রিজভীর হাতে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব আসায় স্বাভাবিকভাবেই দলীয় নেতৃত্বে নতুন একটি অধ্যায় শুরু হয়েছে। রিজভী নিজেও ফখরুলের অভাব অনুভূত হবে বলে উল্লেখ করেছেন। এবং তাঁর সদালাপী ও আন্তরিক আচরণ অনুসরণ করার কথা বলেছেন। তবে রিজভীর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও কম নয়। দীর্ঘদিন দলের মুখপাত্র হিসেবে তিনি মাঠে ছিলেন এবং প্রতিকূল সময়ে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। এখন সেই অভিজ্ঞতা সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনায় কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারেন, সেটিই দেখার বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights