নেপালে নতুন শঙ্কা

প্রতিদিন ডেস্ক

নেপাল-তিব্বত সীমান্ত অঞ্চলে হিমবাহ ধসের পর সৃষ্ট প্রলয়ংকরী বন্যায় বাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের পরেও বিপদ কেটে যায়নি। সর্বশেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, হিমবাহ ভেঙে যাওয়ার পর বিশাল শিলাখণ্ড, বরফ, কাদা এবং ধ্বংসাবশেষের তীব্র স্রোত হিমালয়ের পার্বত্য নদীব্যবস্থার মধ্য দিয়ে নেমে আসার সময় একটি নতুন হ্রদের সৃষ্টি করেছে। সেই হ্রদে ক্রমাগত পানি জমছে এবং পানির স্তর দ্রুত বাড়ছে। এ পানি এখন নেপাল-চীন সীমান্তে উপচে পড়ছে। এ অবস্থায় আরেকটি ভয়াবহ ঘটনার আশঙ্কায় আতঙ্কিত মানুষ বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সবকিছু ছেড়ে ছুটছে উঁচু জায়গার দিকে। তাঁদের লক্ষ্য উঁচু পাহাড়গুলো। এদিকে গতকাল বিকালে পাওয়া খবর অনুযায়ী, নেপাল ট্র্যাজেডিতে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ৫৭৯-এ পৌঁছেছে। নেপাল সীমান্তে বহু মানুষের লাশ উদ্ধারের পর দেশটির পুলিশ নিহতের সংখ্যা পুনর্নির্ধারণ করে এ তথ্য প্রকাশ করেছে। সূত্র : এএফপি, রয়টার্স, কাঠমান্ডু পোস্ট, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য হিন্দ

নেপাল কর্তৃপক্ষ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, নতুন সৃষ্ট হ্রদের পানি গতকাল উপচে ভোটেকোশি নদীতে পড়ার আগে এর জলাধারে পানির পরিমাণ ২৫ লাখ ঘনমিটার অতিক্রম করেছিল, যা আগের দিন ছিল ১৫ লাখ ঘনমিটার। নেপাল-চীন সীমান্তে হিমবাহ ধসের ফলে সৃষ্ট ওই হ্রদ থেকে গতকাল পানি উপচে পড়তে শুরু করেছে। এ ঘটনায় ওই অঞ্চলে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। দুই দিন আগের আকস্মিক ভয়াবহ বন্যায় তছনছ হয়ে যাওয়া এলাকাগুলো আবার বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে পড়েছে। এ কারণে কিছু সময়ের জন্য উদ্ধারকাজও বন্ধ রাখতে হয়। নেপালের বন্যাদুর্গত রসুয়া জেলার শীর্ষ কর্মকর্তা নরেন্দ্র পরিয়ার বলেন, ‘আমরা একটি নোটিস পেয়েছি, হ্রদের তীর ভেঙে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। কিন্তু এটি ঠিক কত বড় এবং পানির স্তর কতটা উঁচু, তা আমাদের জানা নেই। তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি, নদীতে পানির স্তর দ্রুত বাড়ছে।’ প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, মাইকে সবাইকে নদী থেকে দূরে থাকার সতর্কবার্তা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লোকজন নিজেদের জিনিসপত্র নিয়ে উঁচু স্থানের দিকে দৌড়াতে শুরু করে। আর রশি ও স্ট্রেচার নিয়ে প্রস্তুত অবস্থায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন পুলিশের সদস্যরা। ৪০ বছর বয়সি শান্তি তামাং এ সময় গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সবাইকে পালাও বলে সতর্ক করা শুরু হলে আমিও দৌড় দিলাম। বিদুর শহরের সাইরেনও বেজে উঠেছিল। আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।’ উদ্ধারকর্মীদেরও তাঁদের সরঞ্জামসহ নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়েছিল। আগের দিনের ধ্বংসযজ্ঞ সম্পর্কে তামাং বলেন, ‘আমাদের সব মানুষ চলে গেছে। সবাই মারা গেছে। আমার জন্য অপেক্ষা করার মতো আর কেউ বেঁচে নেই। সবকিছু ও সবাই শেষ হয়ে গেছে। সব শেষ।’ এদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, হ্রদটির বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি দেখা দিলে চীনের সব উদ্ধারকারী কর্মী ও যানবাহনকে পিছু হটে নিরাপদ এলাকায় অবস্থান নিতে বলা হয়। অবশ্য পরে ‘উজানের নদীর মাধ্যমে হ্রদের ঝুঁকিটি সামলানো সম্ভব বলে মনে হওয়ায়’ উদ্ধারকাজ আবার শুরু করা হয়।

নেপাল সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেন, নেপাল কর্তৃপক্ষ ৯০ মিনিটের জন্য উদ্ধার অভিযান স্থগিত রেখেছিল। পরে তা আবার শুরু করা হয়। বুধবারের বন্যা গ্রাম ও উপত্যকাগুলো ধূলিসাৎ করে দিয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র, রাস্তাঘাট ও সেতু ধ্বংস করে দিয়েছে। কাঠমান্ডুর সঙ্গে তিব্বতের লাসাকে যুক্ত করে রাখা সড়ক এবং তীর্থযাত্রীদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি সড়ক ধ্বংস হয়ে গেছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ৮০০ বিদেশি নাগরিক রয়েছেন, যাঁদের অনেকেই ভারতের হিন্দু তীর্থযাত্রী। তাঁরা তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বত ও মানসসরোবরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন।

প্রাণহানি বেড়ে ৫৭৯ : নেপাল-তিব্বত সীমান্ত অঞ্চলে হিমবাহ ধসের পর সৃষ্ট প্রলয়ংকরী বন্যায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ৫৭৯-এ পৌঁছেছে। গতকাল বিকালে পাওয়া খবরে এ তথ্য জানা গেছে। এদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তিব্বত অংশে আরও পাঁচজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। ফলে দুই সীমান্ত মিলিয়ে সার্বিক প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্তত ৫৫২-এ। বর্তমানে শতাধিক বিদেশিসহ ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ২০১৫ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্পের পর এটিই নেপালে ঘটা সবচেয়ে বড় এবং প্রাণঘাতী বিপর্যয়। পাহাড়ের ওপর বিশাল একটি হিমবাহ ধসে পাথর ও বরফের মিশ্রণে ভয়াবহ কাদাপানির তোড় সৃষ্টি হওয়ায় এ বিপুল ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছে।

বিদেশি উদ্ধার সহায়তা প্রত্যাখ্যান নেপালের : চারদিক থেকে সাহায্যের প্রস্তাব এলেও নেপাল জানিয়েছে, তাদের অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে অন্য কোনো দেশের সাহায্যের প্রয়োজন নেই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী গতকাল বলেন, ‘সাহায্যের প্রস্তাব আসাটাই স্বাভাবিক, তবে আমাদের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোই অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। আপাতত আমাদের এ ধরনের সাহায্যের প্রয়োজন নেই।’

স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বাংলাদেশ ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও শ্রীলঙ্কা তাদের অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলগুলোকে অভিযানে সহায়তা করার অনুমতি দিতে সরকারকে অনুরোধ করেছিল। এদিকে সিউলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, দক্ষিণ কোরিয়ার একটি র‌্যাপিড রেসপন্স টিম এরই মধ্যে কাঠমান্ডুতে অবস্থান করছে।

কিন্তু নেপাল সরকার এখনো বিদেশি উদ্ধারকারীদের সহায়তা নেওয়ার পরিকল্পনা না করায় তাদের মোতায়েন করা হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights