পারিবারিক সহিংসতায় অস্থিরতা

মাহবুব মমতাজী
দেশে সম্প্রতি পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের একের পর এক ঘটনা সামনে আসছে। স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা, সন্তান, ভাইবোন-একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে হত্যার ঘটনা ঘটছে বিভিন্ন এলাকায়। অনেক ক্ষেত্রে হত্যার কারণ হিসেবে পারিবারিক বিরোধ, সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব, মাদকাসক্তি, চুরি কিংবা আর্থিক সংকটের কথা বলা হলেও বেশ কিছু ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনো স্পষ্ট নয়।

গত ছয় মাসের ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অন্তত ১৯টি ঘটনায় প্রায় ৫০ জন পরিবারের সদস্যদের হাতে বা পারিবারিক বিরোধের জেরে প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ১২ ঘটনায় একই পরিবারের দুই বা ততোধিক সদস্য নিহত হয়েছেন। এদিকে পুলিশের হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে সারা দেশে ২ হাজার ৭৬টি হত্যা মামলা হয়েছে। তবে এসব মামলার মধ্যে পারিবারিক হত্যাকান্ডের সংখ্যা কত তার আলাদা কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছে ঢাকার আশুলিয়ায়। ৫ সেপ্টেম্বর মধ্য জামগড়ায় একটি ভাড়া বাসার তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে দুর্গন্ধ বের হলে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হয়। পরে দরজা ভেঙে কক্ষের ভিতর থেকে এক দম্পতির পচাগলা লাশ উদ্ধার করা হয়। তাঁরা হলেন দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার আলমগীর হোসেন (৪২) ও নাজমা আক্তার (৩৩)। নাজমা পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। এ ছাড়া গত মাসেই রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় এক পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। নিহত ব্যক্তিরা হলেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে অগমী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুষ চক্রবর্তী (১২)। বাড়ির ভিতর থেকে তাঁদের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মুগ্ধা দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাসকে (১৯) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। যদিও শুরুতে পুলিশ বলছিল, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে গণপতিকে হত্যা করা হয়। তবে শুধু এই কারণ দিয়ে পরিবারের চার সদস্য হত্যার বিষয়টি পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরে মামলাটি গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অপারেশনস) তোফায়েল আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা প্রাথমিকভাবে কিছুটা শনাক্ত করেছি। সামগ্রিক তথ্য বিশ্লেষণ করে হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য শনাক্তের চেষ্টা করছি।’

এদিকে ২৫ জুন লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে শাহিনুর বেগম (৪০) ও তাঁর তিন মেয়ে সাইমা আক্তার (২১), ইকরা (১৭) ও সিপাকে (১০) কুপিয়ে হত্যা করা হয়। দা নিয়ে ঘরে ঢুকে তাঁদের ওপর হামলা চালানো হয়। দুজন ঘটনাস্থলে মারা যান। হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান আরও দুজন। হামলাকারী পালানোর চেষ্টা করলে স্থানীয় লোকজন তাকে ধরে পিটুনি দেয়। পরে তারও মৃত্যু হয়। ফলে হামলার পেছনের প্রকৃত কারণ জানার সুযোগও অনেকটা নষ্ট হয়ে যায়।

এ ছাড়া ২৫ জুলাই চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ব্যবসায়ী স্বপন দাশগুপ্ত (৬৫) ও তাঁর স্ত্রী কল্পনা দাশগুপ্তকে (৫৫) হত্যার অভিযোগ ওঠে তাঁদের একমাত্র ছেলে রিমন দাশগুপ্তের বিরুদ্ধে। পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য, রিমন বেকার ও মাদকাসক্ত ছিলেন। চাকরি নিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে তাঁর বিরোধ চলছিল। এর জেরে তিনি বাবা-মাকে হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়। তবে পারিবারিক হত্যাকান্ডের ক্ষেত্রে কোনো ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে যে কারণ সামনে আসে, সেটিই যে শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়ায় ঘটনার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘প্রতিটি হত্যাকান্ডের তাৎক্ষণিক কারণ আলাদা হলেও এর পেছনে বৃহত্তর সামাজিক ও কাঠামোগত সংকট রয়েছে। পারিবারিক বিরোধ, সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব, প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা ও প্রতিশোধপরায়ণতা এসব অপরাধে ভূমিকা রাখছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights