পৃথিবী কি একটিু বেশি কাঁপছে?

অনলাইন ডেস্ক

ভূমিকম্প এমন এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যার কোনো মৌসুম নেই, কোনো পূর্বাভাস নেই। তাই কয়েক সেকেন্ডের ভূমিকম্পেও প্রলয় ঘটে যেতে পারে এবং ঘটছেও। পূর্ব প্রস্তুতির সুযোগ নেই বলে ভূমিকম্পে প্রাণহানী হয় বেশি। ভবনধ্বস, ভূমিধ্বস, পাহারধ্বসের মত ঘটনায় সম্পদহানীও কম নয়। নির্দিষ্ট কোনো মৌসুম না থাকলেও এ বছরের জুন, জুলাই, আগস্ট যেন হঠাৎ ভূমিকম্পের মৌসুম হয়ে গেছে।

গত ২৪ জুন ভেনিজুয়েলায় ৭.৫ মাত্রার অত্যন্ত শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্প আঘাত হানে। এখন পর্যন্ত এ বছরের সবচেয়ে প্রাণঘাতী এই ভূমিকম্প ৬ হাজার ৪৩৮ জন মানুষ মারা গেছে। ধ্বংস হয়েছে ব্যাপক ঘরবাড়ি। তবে এ বছরের সবচেয়ে বড় মাত্রার ভূমিকম্পটি হয়েছে গত ৭ জুন ফিলিপাইনে। মিন্দানাও দ্বীপের সোকসার্জেন উপকূলীয় এলাকায় ৭.৮ মাত্রার এই ভূমিকম্পে ৭৭ জন মারা যান। প্রায় ১৬ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ভূমিকম্পের পর কয়েক হাজার আফটারশক হয় এবং প্রায় ৮০ হাজার ঘরবাড়ি কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গত ১০ আগস্ট পশ্চিম কলম্বিয়ার চোকো অঞ্চলের

সান জোসে দেল পালমার নামক স্থানে ৭.৪ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এটি এই শতাব্দীর মধ্যে কলম্বিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। এতে ৩১৯ জন মারা গেছেন। ৪ হাজার ৬০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন এবং ৪২৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। গত ১৪ আগস্ট ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব নুসা টেঙ্গারা অঞ্চলের এন্ডে নামক দ্বীপের অদূরে ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে কমপক্ষে ৫৩ জন মারা গেছেন এবং বিপুল সংখ্যক মানুষ আহত হয়েছেন। গত ২৮ জুলাই জাপানের কুয়ামামোতো অঞ্চলে ৬.৮ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। জাপানের আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ও ভূমিকম্প-প্রতিরোধী অবকাঠামোর কারণে বড় বিপর্যয় এড়ানো গেছে। এতে ১২ জন নিহত এবং বেশ কিছু মানুষ আহত হয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার পেরুর দক্ষিণাঞ্চলীয় উপাহুয়াচো এলাকায় ৬.৭ মাত্রার একটি কম্পন অনুভূত হয়। ভূমিকম্পটি ভূত্বকের গভীর এলাকায় হওয়ায় বড় ধরনের বিপর্যয় হয়নি। ৩ জন সামান্য আহত হয়েছেন এবং ২২টি বাড়ি ও কয়েকটি মেডিকেল সেন্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, ২০২৬ সালের এই সময়ে পরপর বেশ কয়েকটি বড় ভূমিকম্প হলেও, ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বজুড়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পের বার্ষিক গড় হারের তুলনায় এটি স্বাভাবিক মাত্রার মধ্যেই রয়েছে। বিশ্বে বছরে গড়ে ১৫টি ৭ বা এর বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হয়। এ বছর এখন পযন্ত হয়েছে ১১টি। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ২০ হাজার ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়। এই হিসেবে প্রতিদিন গড়ে ৫৫টি ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটে।

তবে এর অধিকাংশই এত দুর্বল যে মানুষ তা টেরও পায় না। সাধারণত ৬ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারে। ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বে বছরে গড়ে ১৩৩টি ৬ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে ৬ বা তার বেশি মাত্রার সবচেয়ে কম ৯৯টি ভূমিকম্প রেকর্ড হয় ২০২৪ সালে এবং সবচেয়ে বেশি ১৫৭টি হয় ২০২১ সালে। ২০২৬ সালের ২০ আগস্ট পর্যন্ত বিশ্বে ৬ বা তার বেশি মাত্রার ৯২টি ভূমিকম্প হয়েছে। সংখ্যাগুলো গত এক দশকের গড় গতির তুলনায় কিছুটা বেশি হলেও তা এখনো স্বাভাবিক সীমার মধ্যেই রয়েছে। পরপর কয়েকটি বড় ভূমিকম্প আতঙ্ক ছড়ালেও তা অস্বাভাবিক নয়।

পৃথিবীর ওপরের কঠিন স্তরটি কয়েকটি বড় বড় টুকরো বা টেকটনিক প্লেটে বিভক্ত। এই প্লেটগুলো যখন একটি আরেকটির দিকে এগিয়ে আসে, দূরে সরে যায় বা পাশাপাশি ঘষা খায়, তখন সীমানায় প্রচণ্ড চাপের সৃষ্টি হয়। চাপ সহ্য ক্ষমতার বাইরে চলে গেলে শিলাস্তর ভেঙে হঠাৎ ভূমিকম্প হয়। ভূতাত্ত্বিক ও গবেষকদের মতে, এটি কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়, বরং পৃথিবীর একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। প্রশান্ত মহাসাগরের চারপাশ ঘিরে একটি ঘোড়ার খুরের মতো অঞ্চল রয়েছে, যাকে রিং অব ফায়ার বলা হয়। বিশ্বের প্রায় ৮০ ভাগ বড় ভূমিকম্প এই অঞ্চলেই ঘটে। সাম্প্রতিক কম্পনগুলোর বেশিরভাগই এই জোনে বা এর কাছাকাছি অবস্থিত। এ ছাড়া জাভা থেকে হিমালয় হয়ে তুরস্ক ও ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ‘আলপাইড বেল্ট’ও বড় ভূমিকম্পের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল।

একটি বড় ভূমিকম্প হওয়ার পর সেই এলাকার ফল্ট লাইন বা ফাটলগুলো নতুন করে বিন্যস্ত হতে থাকে। এর ফলে মূল কম্পনের পর কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ ধরে ছোট-বড় অনেকগুলো আফটারশক হতে পারে, যা মানুষের মনে আতঙ্ক ছড়ায়।

বর্তমানে অত্যন্ত সংবেদনশীল সিসমোগ্রাফ যন্ত্রের কারণে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের ছোট কম্পনও সাথে সাথে রেকর্ড করা যায়। পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়া ও দ্রুত সংবাদ মাধ্যমের কারণে আমরা যেকোনো ভূমিকম্পের খবর তাৎক্ষণিকভাবে পেয়ে যাচ্ছি। ফলে মনে হতে পারে ভূমিকম্প হঠাৎ বেড়ে গেছে। তবে তথ্য বলছে, পৃথিবী আগের চেয়ে অস্বাভাবিকভাবে বেশি কাঁপছে; এমন কোনো প্রমাণ নেই। বিজ্ঞানীদের মতে, বছরের নির্দিষ্ট কিছু সময়ে পৃথিবীর কোথাও কোথাও ভূমিকম্পের প্রকোপ সাময়িকভাবে বেশি মনে হতে পারে, কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বজুড়ে ভূমিকম্পের গড় সংখ্যা আগের মতোই রয়েছে।

ভূমিকম্প কতটা ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী হবে, তা শুধু এর মাত্রার ওপর নির্ভর করে না। ভূমিকম্পের গভীরতা, জনবসতির কতটা কাছে এটি আঘাত করছে, স্থানীয় ভবনগুলোর নির্মাণমান, মাটির প্রকৃতি এবং সুনামি বা ভূমিধসের মতো পার্শ্ববর্তী দুর্যোগের আশঙ্কাও প্রাণহানির সংখ্যা বাড়িয়ে দিতে পারে।। ভূমিকম্পপ্রবণ জাপান আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ও ভূমিকম্প-প্রতিরোধী অবকাঠামো গড়ে তুলেছে বলে বড় ভূমিকম্পেও তাদের ক্ষতি তুলনামূলক কম হয়।

ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পটি রেকর্ড করা হয়েছিল ১৯৬০ সালের ২২ মে চিলির ভালদিভিয়ায়। ৯.৫ মাত্রার ভূমিকম্পের ফলে প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে সুনামি সৃষ্টি হয়েছিল। ২০০৪ সালে সুমাত্রার উপকূলে ৯.১ থেকে ৯.৩ মাত্রার ভূমিকম্পের পর ভারত মহাসাগরে ভয়াবহ সুনামি আঘাত হানে, যাতে প্রায় ২ লাখ ২৮ হাজার মানুষ মারা যান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights