পোশাকশ্রমিকদের মজুরি কতটা বাড়ানো সম্ভব

নিজস্ব প্রতিবেদক

তিন বছরের ব্যবধানে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের মধ্য দিয়ে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শিগগিরই নতুন মজুরি কাঠামো নিয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কতটা মজুরি বাড়ানো সম্ভব, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে এমনিতেই চাপে রয়েছে রপ্তানি খাত। খাত-সংশ্লিষ্টদের দাবি, অন্তত অর্ধেক কারখানার নতুন মজুরি বৃদ্ধির বাড়তি ব্যয় বহনের সক্ষমতা নেই।

অন্যদিকে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও জীবনমান উন্নয়নের প্রশ্নে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, কম মজুরির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা সম্ভব নয়। এজন্য শ্রমিকের মজুরি বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

তৈরি পোশাকের বৈশ্বিক বাজারে দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক বাংলাদেশকে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে চীন, ভিয়েতনাম, ভারত, পাকিস্তান ও কম্বোডিয়ার সঙ্গে। দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলক কম শ্রমমূল্য এ খাতের প্রতিযোগিতায় বড় সুবিধা দিলেও ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয় ও শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এ কৌশলের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হচ্ছে।

১৯৮৬ সালে প্রথমবারের মতো পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয় ৬২৭ টাকা। ১৯৯৪ সালে তা বেড়ে হয় ৯৩৮ টাকা। পরবর্তী সময়ে কয়েক ধাপে বেড়ে ২০১৩ সালে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৩০০ টাকা। সর্বশেষ ২০২৩ সালে তা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয় ১২ হাজার ৫০০ টাকা।

মালিকপক্ষের মতে, নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের নীতিসহায়তা জরুরি। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতিবছর মজুরি পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকলে শ্রমিকদের প্রকৃত আয় ধরে রাখা সহজ হবে। এতে কয়েক বছর পরপর মজুরি নিয়ে আন্দোলন ও নতুন বোর্ড গঠনের প্রয়োজনও কমবে। বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ইতোমধ্যে অনেক কারখানা বন্ধ হয়েছে, এখনো হচ্ছে। নতুন মজুরির বাড়তি ব্যয় অনেক কারখানার পক্ষে বহন করা সম্ভব হবে না। তাই মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রস্তাব এবং সরকারের মতামতের ভিত্তিতে এমন একটি মজুরি নির্ধারণ করতে হবে, যাতে শ্রমিকরা সন্তুষ্ট হন এবং শিল্পও টিকে থাকতে পারে।

খাত-সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, মাত্র ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কারখানা উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে নতুন মজুরির চাপ সামাল দেওয়ার মতো অবস্থানে রয়েছে। বাকিদের সক্ষমতা সীমিত। এ ক্ষেত্রে প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতার ব্যবধান বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

উদ্যোক্তার ভাষ্য, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, শ্রীলঙ্কা ও চীনের কারখানায় প্রতি ঘণ্টায় একটি উৎপাদন লাইনে যত পণ্য তৈরি হয়, বাংলাদেশের অনেক কারখানায় তার চেয়ে কম উৎপাদন হয়। পিস রেট বা উৎপাদনের পরিমাণের ভিত্তিতে কাজের ব্যবস্থা এবং দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে এ ব্যবধান কমানো সম্ভব। উৎপাদনশীলতা বাড়লে তুলনামূলক বেশি মজুরি দিয়েও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা যাবে।

তবে শ্রমিকদের ন্যূনতম আইনগত মজুরিকে শুধু শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার হিসাব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত নয় বলে মনে করেন মজুরি বোর্ডের শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বাবুল আখতার। তাঁর মতে, শ্রমিকের মৌলিক জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মজুরি নিশ্চিত করা মালিকের দায়িত্ব। ন্যূনতম আইনগত পাওনা দেওয়ার সক্ষমতা নেই, এমন কারখানার ব্যবসায়িক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

এদিকে চার দশকে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অর্জন উল্লেখযোগ্য। ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরে এ খাতের রপ্তানি ছিল মাত্র ৩ কোটি ডলার। সর্বশেষ অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে এ সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে এখন কম মজুরির শ্রমিকনির্ভর উৎপাদন থেকে বেরিয়ে আসার তাগিদ দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।

তাঁর মতে, উচ্চমূল্যের, মানসম্পন্ন ও বেশি মুনাফার পণ্য উৎপাদনে যেতে হবে। এখনো অধিকাংশ উদ্যোক্তা বিপুল পরিমাণ পণ্য উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। কম শ্রমমূল্যের সুবিধা থাকায় এ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার আগ্রহও কম। অথচ পণ্যের মূল্য সংযোজন ও মুনাফা বাড়াতে পারলে শ্রমিকদের বেশি মজুরি দিয়েও ব্যবসা পরিচালনা সম্ভব। এর পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির অপ্রাপ্যতা ও ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করছে। প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরিও কম বলে খাত-সংশ্লিষ্টদের দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights