প্রবৃদ্ধির গল্প, যুদ্ধের আগুন আর অস্থির পৃথিবী
জিল্লুর রহমান
পৃথিবীটা ক্রমেই অদ্ভুত হয়ে উঠছে। এক দেশে যুদ্ধ হচ্ছে, আরেক দেশে জ্বালানির দাম বাড়ছে, তৃতীয় দেশে মানুষ রাস্তায় নামছে। কোথাও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুখবর, অথচ তরুণদের হাতে কাজ নেই। কোথাও গণতন্ত্রের জয়গান, অথচ মানুষের প্রতিবাদ করার অধিকার সংকুচিত হচ্ছে। রাজনীতিকরা উন্নয়নের হিসাব দিচ্ছেন, আর সাধারণ মানুষ হিসাব করছেন-সংসারটা কীভাবে চলবে।
এ বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোর মধ্যে গভীর সম্পর্ক আছে। সেটি হলো আস্থার সংকট। মানুষ রাষ্ট্রকে বিশ্বাস করতে চাইছে, কিন্তু রাষ্ট্র অনেক ক্ষেত্রেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। সরকারগুলো আন্তর্জাতিক সংকটকে নিজেদের ব্যর্থতার ব্যাখ্যা হিসেবে ব্যবহার করছে। অথচ নাগরিকরা জানতে চাইছেন-সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতি কোথায় ছিল?
বাংলাদেশও এ বাস্তবতার বাইরে নয়। আমাদের অর্থনীতির সামনে আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তা, দেশের ভিতরে বিনিয়োগের স্থবিরতা ও কর্মসংস্থানের সংকট। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন সামনে এনেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিক্ষোভ মনে করিয়ে দিচ্ছে, মানুষের অসন্তোষ দীর্ঘদিন উপেক্ষা করা যায় না। আর ইতিহাস আমাদের ভাবতে বাধ্য করছে, রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি আসলে কোথায়?
১. মাথাপিছু আয়ে এগিয়ে, কর্মসংস্থানে পিছিয়ে
বাংলাদেশ আবার মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনের হিসাবে ভারতকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের অক্টোবরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন হতে পারে ২ হাজার ৮৮৬ এবং ভারতের ২ হাজার ৭৪৯ ডলার। কিন্তু এর অর্থ কি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ভারতের মানুষের চেয়ে ভালো আছে?
উত্তরটা এত সহজ নয়। মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন কোনো ব্যক্তির প্রকৃত আয় কিংবা জীবনযাত্রার মানের সরাসরি পরিমাপ নয়। ক্রয়ক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান ও বৈষম্যের হিসাবও বিবেচনায় নিতে হয়।
আমাদের সমস্যা হচ্ছে, অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানকে আমরা প্রায়ই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অস্ত্রে পরিণত করি। একটি সংখ্যায় প্রতিবেশীকে ছাড়িয়ে যাওয়ার আনন্দে অন্য দশটি সংখ্যার অস্বস্তিকর বাস্তবতা আড়াল করে ফেলি।
অথচ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের আরেকটি বিশ্লেষণে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত তরুণদের প্রায় ২৯ শতাংশ বেকার। উচ্চশিক্ষিত কর্মীদের একটি বড় অংশ এমন কাজে নিয়োজিত, যেখানে তাঁদের যোগ্যতার যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। এ দুটি তথ্য পাশাপাশি রাখলেই সংকটটি স্পষ্ট হয়। একদিকে মাথাপিছু উৎপাদনের অগ্রগতি, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ হাতে তরুণদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
একটি পরিবার সন্তানের শিক্ষার পেছনে বছরের পর বছর বিনিয়োগ করে। সেই সন্তান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে চাকরি না পেলে সংকটটি কেবল অর্থনৈতিক থাকে না; হয়ে ওঠে সামাজিক, পারিবারিক, এমনকি রাজনৈতিক।
আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়িয়েছি, কিন্তু শিক্ষা ও কর্মবাজারের মধ্যে প্রয়োজনীয় সম্পর্ক তৈরি করতে পারিনি। অনেক ক্ষেত্রে সনদ তৈরি হচ্ছে, দক্ষতা তৈরি হচ্ছে না। আবার দক্ষতা থাকলেও উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও একই অস্বস্তি। উচ্চ সুদহার, জ্বালানির অনিশ্চয়তা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে। বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান হবে কীভাবে? আর কর্মসংস্থান না বাড়লে প্রবৃদ্ধির সুফল মানুষের কাছে পৌঁছাবে কোন পথে?
শুধু বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজন করে বিনিয়োগ আসে না। বিনিয়োগকারীরা বক্তৃতার চেয়ে বাস্তব পরিস্থিতিকে বেশি গুরুত্ব দেন। তাঁরা জানতে চান, বিদ্যুৎ থাকবে কি না, চুক্তি কার্যকর হবে কি না, সিদ্ধান্ত পেতে কত দিন লাগবে?
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে অস্বীকার করার কারণ নেই। কিন্তু সাফল্যের গল্প বলতে গিয়ে দুর্বলতাগুলো অস্বীকার করাও আত্মঘাতী। অর্থনীতির প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন তার প্রতিফলন মানুষের জীবনে দেখা যায়।
২. যুদ্ধ হরমুজে, দুশ্চিন্তা বাংলাদেশের ঘরেআস্থার সংকট
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হলে আমরা সাধারণত আন্তর্জাতিক রাজনীতির হিসাব করি। কে কার পক্ষে, কোন শক্তির কতটা সামরিক সক্ষমতা-এসব নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন অন্য জায়গায়। যুদ্ধের কারণে আমাদের জ্বালানি সরবরাহ এবং প্রবাসী আয়ের কী হবে?
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একদিকে এ অঞ্চলের জ্বালানির ওপর নির্ভরতা, অন্যদিকে সেখানে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির পাঠানো অর্থ। ফলে উপসাগরীয় সংকট আমাদের জন্য একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ঝুঁকি তৈরি করে।
হরমুজ প্রণালি পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। সেখানে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে কিংবা নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে পরিবহন ও বিমার খরচ বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে তার প্রভাব পড়ে। বাংলাদেশকে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হতে পারে। জ্বালানির দাম বাড়লে শিল্পকারখানা, পরিবহন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও চাপ তৈরি হয়।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি দীর্ঘদিন অস্থির থাকলে সেখানে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের আয় ও চাকরির নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অর্থাৎ একই সংকট আমাদের দুই দিক থেকে আঘাত করতে পারে। আমদানি ব্যয় বাড়বে, অথচ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
আন্তর্জাতিক সংকট আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না, কিন্তু তার অভিঘাত মোকাবিলার প্রস্তুতি তো নিতে পারি। সেই প্রস্তুতি কতটা আছে? বাংলাদেশের জ্বালানি নীতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার চেয়ে তাৎক্ষণিক সমস্যা সামাল দেওয়ার প্রবণতা বেশি। অথচ জ্বালানি নিরাপত্তার প্রস্তুতি নিতে হয় সংকটের আগেই। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ, আমদানির উৎস বৈচিত্র্যকরণ এবং জরুরি মজুত ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিত পরিকল্পনায় আনতে হবে।
প্রবাসী শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও একই কথা। তাঁদের আমরা বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর উৎস হিসেবে দেখি, কিন্তু সংকটে তাঁদের নিরাপত্তা ও জীবিকার প্রশ্ন কতটা গুরুত্ব পায়? বিদেশে আমাদের দূতাবাসগুলোকে প্রবাসীদের সুরক্ষার কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে।
যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটিই, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং জাতীয় নিরাপত্তা এখন আর আলাদা বিষয় নয়। জ্বালানি, খাদ্য ও মানুষের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়লে রাষ্ট্রের নিরাপত্তাও দুর্বল হয়ে যায়।
৩. রাজপথের ক্ষোভ, তরুণদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের দিকে তাকালে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে। তরুণ প্রজন্ম প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাচ্ছে। কোথাও শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা, কোথাও জীবনযাত্রার ব্যয়, কোথাও দুর্নীতি কিংবা রাজনৈতিক জবাবদিহির অভাব মানুষকে রাস্তায় নামাচ্ছে।
সব দেশের আন্দোলনের কারণ এক নয়। প্রতিটি দেশের নিজস্ব রাজনৈতিক ইতিহাস ও সামাজিক দ্বন্দ্ব রয়েছে। কিন্তু অসন্তোষের কেন্দ্রে প্রায়ই রয়েছে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। এ প্রজন্ম শুধু প্রতিশ্রুতি শুনে অপেক্ষা করতে রাজি নয়। তারা জানতে চায়, শিক্ষা শেষ করে চাকরি পাওয়া যাবে কি না, উপার্জন দিয়ে সংসার চালানো সম্ভব হবে কি না, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে তাদের মতামতের গুরুত্ব আছে কি না।
প্রযুক্তি তরুণদের সামনে সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলেছে। একই সঙ্গে প্রত্যাশার বিশাল জগৎ তৈরি করেছে। একজন তরুণ এখন নিজের জীবনকে পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মানুষের সুযোগসুবিধার সঙ্গে তুলনা করতে পারেন। এই তুলনা অনেক সময় হতাশা বাড়ায়।
এখানেই রাজনীতির পুরোনো ভাষা অকার্যকর হয়ে পড়ছে। সরকারগুলো উন্নয়নের সাফল্য তুলে ধরে, তরুণরা জানতে চান-সেই উন্নয়নে তাদের অংশ কোথায়? আরেকটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিবাদের অধিকার এবং জননিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা হবে?
সহিংসতা কিংবা সাধারণ মানুষের সম্পদ ধ্বংস গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু সহিংসতার অজুহাতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার সংকুচিত করাও গণতান্ত্রিক সমাধান হতে পারে না। রাষ্ট্র মানুষের ক্ষোভের কারণ অনুসন্ধানের পরিবর্তে শুধু পুলিশিব্যবস্থা নিলে সাময়িকভাবে রাজপথ শান্ত হতে পারে, কিন্তু অসন্তোষ দূর হয় না।
বাংলাদেশের জন্য এ অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। আমাদের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের কেন্দ্রে তরুণদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তাঁদের প্রত্যাশা পূরণের প্রশ্নটি আরও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে তরুণরা রাষ্ট্রের পরিবর্তন চান, তাঁরা শুধু ক্ষমতার হাতবদল দেখতে চান না। চান সুযোগের সমতা, ন্যায়বিচার, মর্যাদা এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা।
এখানে প্রথম আলোচনার বেকারত্বের পরিসংখ্যানটি আবার মনে পড়ে। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব কেবল শ্রমবাজারের সমস্যা নয়; দীর্ঘ মেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও উদ্বেগের বিষয়।
গণতন্ত্রের শক্তি শুধু নির্বাচন আয়োজনের মধ্যে নয়। তার শক্তি মানুষের অসন্তোষ শোনার এবং ভুল সংশোধনের সুযোগ তৈরি করার মধ্যে। যে রাষ্ট্র সমালোচনাকে শত্রুতা মনে করে, সে রাষ্ট্র নিজের ভুল সংশোধনের সুযোগ হারায়।
৪. ক্ষমতার ইতিহাস, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ
বর্তমান বিশ্বের ঘটনাগুলো বুঝতে গেলে শুধু আজকের সংবাদ শিরোনাম দেখলে চলবে না। ইতিহাসের দিকেও তাকাতে হবে। কারণ রাষ্ট্রের উত্থানপতন, ক্ষমতার বিস্তার, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং মানুষের প্রতিরোধের মধ্যে এমন সম্পর্ক আছে, যা যুগ বদলালেও পুরোপুরি বদলায় না।
ঔপনিবেশিক যুগে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো সামরিক ক্ষমতা, বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেছিল। স্বাধীনতার পর বহু দেশ রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব অর্জন করলেও অর্থনৈতিক নির্ভরতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
আজ নির্ভরতার ধরন বদলেছে। কোনো দেশের ওপর প্রভাব বিস্তারের জন্য সরাসরি ভূখণ্ড দখল করা প্রয়োজন হয় না। বাণিজ্যিক শর্ত, ঋণ, প্রযুক্তি, জ্বালানি সরবরাহ এবং গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথের নিয়ন্ত্রণও প্রভাব বিস্তারের কার্যকর উপায়।
বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এ পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। আমরা স্বাধীন রাষ্ট্র, আমাদের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি আছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের শর্ত পরিবর্তিত হলে কিংবা বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা তীব্র হলে আমাদের অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়ে।
সার্বভৌমত্ব তাই শুধু মানচিত্রের সীমানা রক্ষার বিষয় নয়। অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা এবং আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলার শক্তিও সার্বভৌমত্বের অংশ।
একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি বোঝার জন্য শুধু তার সামরিক বাহিনী কিংবা অর্থনীতির আকার দেখলে চলবে না। দেখতে হবে প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকর এবং নাগরিকরা রাষ্ট্রকে কতটা বিশ্বাস করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আমরা দেখেছি, সরকার বদলেছে, নেতৃত্ব বদলেছে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক করার কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।
আমরা প্রায়ই মনে করি, একটি খারাপ সরকারের পরিবর্তে ভালো সরকার এলেই সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু দুর্বল প্রতিষ্ঠান অপরিবর্তিত রেখে শুধু নেতৃত্ব বদলালে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হয়। গণতন্ত্রের জন্য তাই শুধু ভালো নেতৃত্ব যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন এমন প্রতিষ্ঠান, যা খারাপ নেতৃত্বের ক্ষমতার অপব্যবহারও সীমিত করতে পারে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের জন্য সুযোগও তৈরি করেছে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি এবং অভ্যন্তরীণ সুশাসনের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। দুর্বল অর্থনীতি ও অকার্যকর প্রতিষ্ঠান নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্ত অবস্থান ধরে রাখা কঠিন।
শেষ কথা
চারটি ভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করলাম। বাংলাদেশের অর্থনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, তরুণদের বিক্ষোভ এবং ইতিহাসের আলোকে রাষ্ট্র ও ক্ষমতার সম্পর্ক। আপাতদৃষ্টিতে আলাদা হলেও বিষয়গুলো একটি জায়গায় মিলে যায়, রাষ্ট্রের সক্ষমতা এবং মানুষের আস্থা।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, কিন্তু কর্মসংস্থান ছাড়া সেই প্রবৃদ্ধি মানুষের জীবনে আশার সঞ্চার করতে পারে না। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক প্রয়োজন, কিন্তু অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কূটনৈতিক সাফল্য সাধারণ মানুষের কাছে অর্থহীন। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন, কিন্তু প্রতিবাদের অধিকার সংকুচিত করে সেই স্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী করা যায় না।
আমাদের রাজনীতিতে পুরোনো একটি অভ্যাস আছে। ক্ষমতায় থাকলে সবকিছু ভালো মনে হয়, আর বিরোধী দলে গেলে সবকিছু খারাপ। ক্ষমতার চেয়ারটি সম্ভবত এমন এক আশ্চর্য আসবাব, যেখানে বসলে বাস্তবতার রং বদলে যায়! কিন্তু মানুষের জীবনের বাস্তবতা এত সহজে বদলায় না।
একজন বেকার তরুণের কাছে সরকারের সাফল্যের সবচেয়ে বড় প্রমাণ একটি চাকরি। একজন কৃষকের কাছে ন্যায্যমূল্য। একজন উদ্যোক্তার কাছে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি। আর একজন নাগরিকের কাছে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি হচ্ছে-তাঁর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা হবে।
বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু অর্থনীতিকে গতিশীল করা কিংবা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা নয়। প্রয়োজন রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠন করা। সেই আস্থা বক্তৃতা দিয়ে তৈরি হয় না। তৈরি হয় সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে। পৃথিবী বদলাচ্ছে, ক্ষমতার সমীকরণ বদলাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কী শুধু পরিবর্তনের অভিঘাত সহ্য করব, নাকি নিজেদের প্রস্তুত করব সেই পরিবর্তনের অংশীদার হতে?
শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সাফল্যের বিচার হবে না শুধু প্রবৃদ্ধির হার কিংবা আন্তর্জাতিক মর্যাদা দিয়ে। বিচার হবে, সেই রাষ্ট্র তার মানুষের জন্য কতটা ন্যায়সংগত, নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পেরেছিল।
লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ; সঞ্চালক, তৃতীয় মাত্রা
