বাংলাদেশের বাণিজ্যে রপ্তানি বহুমুখীকরণই প্রধান সুরক্ষা
ড. মোস্তাফিজুর রহমান
ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা বাংলাদেশের বাণিজ্য ও শিল্প খাতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক নৌপথে বিঘ্নের কারণে জাহাজকে দীর্ঘ পথ ঘুরে চলতে হচ্ছে।
বাড়ছে জাহাজভাড়া, পরিবহন সময় ও বীমা ব্যয়। এর প্রভাব শুধু রপ্তানিতে সীমাবদ্ধ নয়; আমদানি বাণিজ্য, আমদানিনির্ভর স্থানীয় শিল্প এবং রপ্তানিমুখী উৎপাদন—সব ক্ষেত্রেই বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হচ্ছে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব কতটা গভীর হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে রাজনৈতিক অস্থিরতা কত দিন স্থায়ী হয় তার ওপর। সংকট দ্রুত কেটে গেলে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি সীমিত থাকতে পারে। কিন্তু অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও শিল্প খাতকে আরো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।
বিশেষ করে ইউরোপের বাজার বাংলাদেশের রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের চাহিদার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ভোক্তার ব্যয় করার সক্ষমতা কমলে ক্রেতারা নতুন ক্রয়াদেশ কমাতে পারেন কিংবা পণ্যের দাম কমানোর জন্য চাপ দিতে পারেন।
ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ও শিল্পের মুনাফা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তবে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ঠিক কতটা অতিরিক্ত ক্ষতি হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
এ ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু নিজেদের অর্থনীতির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ আমাদের রয়েছে। বাজার বৈচিত্র্য, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানোকে তাই নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে রাখতে হবে।
বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণের জন্য আঞ্চলিক বাজার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভারত বছরে প্রায় ৭০০ বিলিয়ন ডলারের এবং চীন প্রায় তিন লাখ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করে। অথচ এসব বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি তুলনামূলকভাবে অনেক কম। এই বিশাল বাজারে প্রবেশ বাড়াতে পারলে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে ইউরোপ বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট বাজারে মন্দা দেখা দিলে তার প্রভাব সামাল দেওয়ার সক্ষমতাও বাড়বে।
এ জন্য সরকারকে বাণিজ্য কূটনীতি জোরদার, রপ্তানিকারকদের বাজারে প্রবেশের বাধা কমানো এবং পণ্যের মান ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে হবে। শিল্পোদ্যোক্তাদেরও উৎপাদন ব্যয় কমানো, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং নতুন পণ্য ও ক্রেতা অনুসন্ধানে বিনিয়োগ করতে হবে। বৈশ্বিক অস্থিরতা সাময়িক হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামোর দুর্বলতা দীর্ঘদিনের। তাই শুধু বর্তমান সংকট মোকাবেলা নয়, দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য। রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও আঞ্চলিক বাজার সম্প্রসারণে সফল হতে পারলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারবে।
লেখক: সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)
