বাহারি শরবতে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
জয়শ্রী ভাদুড়ী
বৈশাখের গরমে উত্তপ্ত হচ্ছে চারপাশ। তীব্র গরমে কাজ করতে হাঁপিয়ে ওঠা শ্রমজীবীরা প্রাণ জুড়াতে হাতে তুলে নিচ্ছেন শরবত। সচ্ছলরা বিভিন্ন জুসবার বা ডাবের পানিতে তৃষ্ণা মেটালেও স্বল্প আয়ের মানুষের ভরসা রাস্তার পাশের রকমারি শরবতের দোকান। এই শরবতে ব্যবহৃত মিশ্রণ, পানি নিয়ে তৈরি হয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকির শঙ্কা।
রাজধানীর ফার্মগেট, শাহবাগ, গুলিস্তান, পল্টন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, রাস্তার পাশে বিভিন্ন রং-বেরঙের ও ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের শরবত বিক্রি হচ্ছে। শিশু থেকে প্রাপ্তবয়স্ক সবাই পান করছেন রাস্তার পাশের শরবত। এসব দোকানে লেবুর শরবত প্রতি গ্লাস ১০ টাকা, প্যাকেটজাত ফ্লেভার দিয়ে বানানো ৫০০ মিলি লিটার বোতলের শরবত ২০ টাকা, বেলের শরবত প্রতি গ্লাস ২০ টাকা ও তোকমাসহ বিভিন্ন ফল দিয়ে বানানো শরবত প্রতি গ্লাস ২০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। উন্মুক্ত স্থানে, ধুলায় আচ্ছন্ন রাস্তায়, নোংরা পরিবেশে উন্মুক্তভাবে বিভিন্ন ফল সাজিয়ে রাখা হয়। এগুলো দিয়েই তৈরি হয় ফলের শরবত। গরমে সুস্থতার খোঁজে মানুষের পছন্দের তালিকায় থাকে বেলের শরবত। কিন্তু বেল ভেঙে দোকানের চারপাশে সাজিয়ে রাখায় পড়ছে ধুলাবালি। এগুলো দিয়েই তৈরি হচ্ছে শরবত।
রাস্তার পাশে সিএনজি অটোরিকশা থামিয়ে শরবত পান করছিলেন চালক বায়েজিদ হোসেন। তিনি বলেন, তিন ঘণ্টা টানা গাড়ি চালিয়ে ভীষণ তৃষ্ণা পেয়েছিল। গরমে অস্থির হয়ে গেছি। তাই ঠান্ডা শরবত খেলাম। পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে জানতে চাইলে বলেন, কত কিছুই তো খেয়ে ফেলছি আমরা; এটায় আর কী হবে।
এ ব্যাপারে শ্যামলী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ক্ষতিকর রং মেশানো শরবত খাওয়ার ফলে পেটে সমস্যা হয়। ধীরে ধীরে আলসার হয় একটা সময় লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দূষিত পানি দিয়ে বানানো শরবত খেলে জন্ডিস, টাইফয়েড, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হবে মানুষ। নোংরা, দূষিত খাবার খেলে হৃদরোগ, কিডনি সমস্যা এমনকি ক্যানসার পর্যন্ত হয়। গর্ভবতী নারীদের জন্য এসব ভেজাল খাবারের ক্ষতি কয়েকগুণ বেশি। গর্ভের শিশু মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভেজাল খাবারে। এটা সব প্রাণি এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। তাই সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে।’
এর আগে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুজীববিজ্ঞান বিভাগের গবেষণায় এসব পানীয়তে মিলেছে মারাত্মক ক্ষতিকর উপাদান। মিলেছে মাত্রাতিরিক্ত কলিফর্মের উপস্থিতি। এসব পানীয়তে মিলেছে ইকোলাই, ভিবরিও কলেরা, স্টেফাইলোকক্কাস, শিগেলা, সালমোনেলার মতো ব্যাকটেরিয়া যা অধিকাংশই মলের জীবাণুতে থাকে। এগুলো পান করলে ডায়রিয়া, আমাশয়, কলেরা, টাইফয়েড, হেপাটাইসিস, ডায়রিয়া, মূত্রনালির সংক্রমণসহ মারাত্মক ক্ষতিকর রোগ সৃষ্টি করে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ থেকে রেহাই পেতে দরকার সচেতনতা, দোকানিদের প্রশিক্ষণ, সরকারি প্রতিষ্ঠানের তদারকি, ফুডকোর্টে নিরাপদ উপকরণ ব্যবহার এবং গবেষণার উৎসাহ বাড়ানো।
এ ব্যাপারে হিউম্যান এইড বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি ডা. শেখ মইনুল খোকন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘শরবতে বিভিন্ন অস্বাস্থ্যকর উপাদান যোগ করা এবং দূষিত পানি ব্যবহারে টাইফয়েড, জন্ডিস, হেপাটাইটিসের ঝুঁকি বাড়ে। লিভারের সমস্যার পাশাপাশি কিডনির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় এসব খাবার। অনেক উপাদান দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত তৈরি করে এবং দুরারোগ্য রোগ জন্ম দেয়। তাই এসব খাবার থেকে দূরে থাকতে হবে। বাড়িতে স্বাস্থ্যকর উপায়ে বানানো খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়তে হবে।’
শরবত তৈরির পানি ও বরফ কোথা থেকে আনেন জানতে চাইলে পল্টন এলাকার শরবত বিক্রেতা কবির হোসেন বলেন, আমি ওয়াসার বুথ থেকে কার্ড দিয়ে পানি আনি। আমার দোকানের শরবতে ব্যবহার করা পানি পরিষ্কার। বরফ আনি স্টেডিয়াম মার্কেটের একটা দোকান থেকে সেটাও ভালো বরফ। শরবতের ব্যবহৃত প্যাকেটজাত উপাদান স্বাস্থ্যসম্মত কি না জানতে চাইলে বলেন সেটা তো আমি জানি না। দোকান থেকে কিনে ব্যবহার করি।
