বিদ্যুৎ নিয়ে চরম অস্বস্তি

জিন্নাতুন নূর

চরম অস্বস্তিতে আছেন বিদ্যুতের গ্রাহকরা। নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের কথা বলে জুনে দাম বৃদ্ধি করা হলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকছেন গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দারা। লোডশেডিংয়ের কারণে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে। বিদ্যুৎ না থাকায় এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদেরও। এর সঙ্গে নতুন করে অস্বস্তি বাড়িয়েছে বিদ্যুতের অস্বাভাবিক ভূতুড়ে বিল। এই অস্বাভাবিক বিল নেওয়ার বিষয়টি যাচাই করতে এরই মধ্যে দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জন্য ২৮টি টিম গঠন করে দেওয়া হয়েছে। এ টিমের সদস্যরা গ্রাহকদের বিভিন্ন অভিযোগ এখন যাচাই করছেন। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহকরা অনেক দিন ধরেই বিদ্যুতের অস্বাভাবিক বা ভূতুড়ে বিল নিয়ে অভিযোগ করছেন। ভুক্তভোগী গ্রাহকরা বলছেন, তাঁরা প্রতি মাসে গড়ে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন গত জুনের বিলে তার তুলনায় অনেক বেশি ইউনিট দেখানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বছরের অন্য সময় সাধারণত এমন না হলেও জুন ক্লোজিংয়ের আগে প্রকৃত মিটার রিডিংয়ের পরিবর্তে অনুমানভিত্তিক বা অতিরিক্ত ইউনিট দেখিয়ে বিল করা হয়। যদিও এ অভিযোগ বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো বরাবরই অস্বীকার করেছে। ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অভিযোগ, বছরের অন্য সময় থেকে জুনে ব্যবহারের চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ বেশি বিল আসে। এজন্য তাঁরা স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসে অভিযোগ করেও কার্যকর সমাধান পাচ্ছেন না। বেশ কিছু এলাকায় নিয়মিত মিটার রিডিংও হয় না। কোথাও একসঙ্গে দুই মাসের বিল নেওয়া হয়। অনুমানভিত্তিক বিল তৈরিরও অভিযোগ আছে। এতে প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহারের সঙ্গে বিলের কোনো মিল থাকে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পবিস) মনিটরিং ও ব্যবস্থাপনা পরিচালন (কেন্দ্রীয় অঞ্চল) পরিদপ্তরের একজন উপপরিচালক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানের নির্দেশে এক সপ্তাহ ধরে বিদ্যুতের অস্বাভাবিক বিলের বিষয়ে যাচাই চলছে। এজন্য ২ জুন ২৮টি টিম গঠন করা হয়েছে, যারা ৮০টি পবিসে গিয়ে এ-সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে সত্যতা যাচাই করছে। ঈদের সময় ছুটিতে মানুষ বাসায় এসি ও ফ্রিজের মতো ইলেকট্রনিক পণ্য বেশি ব্যবহার করায় মে-জুনে বিল বেশি এসেছে। তবে দুই-একটি জায়গায় ইন্টিগ্রেটেড বিলিং সিস্টেমের কারণে ম্যানুয়ালি পোস্টিং দিতে গিয়ে সংখ্যাগত ভুল হতে পারে। এ ব্যাপারে কেউ অভিযোগ জানালে আমাদের লোক তা যাচাই করে ঠিক করে দেন।’ বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বিল নিয়ে গ্রাহকের অভিযোগ পাওয়ার পর তাৎক্ষণিক নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিলও বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণে প্রিপেইড গ্রাহকদের আগের চেয়ে ঘন ঘন রিচার্জ করতে হচ্ছে। এ ছাড়া কম বৃষ্টি, অতিরিক্ত তাপ, বিশ্বকাপ ফুটবল, এইচএসসি পরীক্ষার জন্য সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রামাঞ্চলেও বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় এর প্রভাব বিলের ওপর পড়েছে। তবে কিছু ভুল পাওয়া গিয়েছে এ ব্যাপারে পরীক্ষানিরীক্ষা করে সমস্যার সমাধান করা হচ্ছে।

ব্রাক্ষণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার মো. মাকসুদ জানান, মে মাসে তাঁর বিদ্যুৎ বিল এসেছে ২ হাজার ৭২১ টাকা, কিন্তু জুনে এসেছ ৫ হাজার ১০১ টাকা। হঠাৎ এই বাড়তি বিল আসার কারণ তিনি বুঝতেই পারছেন না। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির গ্রাহক পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার বাঁশবাড়িয়া গ্রামের জাহাঙ্গীর মৃধা জানান, তাঁর হাতে পাওয়া সর্বশেষ বিলে ৬ জুন পর্যন্ত ৪৯০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব দেখানো হয়েছে। কিন্তু ২১ জুন মিটারে গিয়ে তিনি দেখেন রিডিং রয়েছে মাত্র ৪৩০ ইউনিটের। অর্র্থাৎ বিলের হিসাবে ব্যবহারের চেয়ে ৬০ ইউনিট বেশি দেখানো হয়েছে। পরে তিনি মিটারের বর্তমান রিডিংয়ের ছবি নিয়ে গলাচিপা জোনাল অফিসে গেলে কর্তৃপক্ষ বিল সংশোধন করে দেন। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে সম্প্রতি জানানো হয়েছে, বিল দিতে কোনো কারিগরি ভুল হয়ে থাকলে তা দ্রুত সংশোধন করা হবে। পাশাপাশি কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সমস্যা সমাধানে গ্রাহকদের হটলাইন বা সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। গত জুনে ভোক্তাপর্যায়ে বিদ্যুতের দাম রেকর্ড প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করে সরকার। আর পাইকারি পর্যায়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। দাম বাড়ানোর আগে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে বলা হয়, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। কিন্তু দাম বৃদ্ধির পরও গ্রাহক নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না, উল্টো ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঢাকার বাইরের মানুষ বিদ্যুৎহীন থাকছেন। দাম বৃদ্ধির পরও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ার বিষয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের সুফল তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায় না। জুনের বিল জুলাইয়ে আদায় হবে, ফলে এর আর্থিক প্রভাব আগস্ট থেকে দেখা যাবে। তখন অতিরিক্ত রাজস্ব দিয়ে আরও জ্বালানি সংগ্রহ করা সম্ভব হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও বাড়ানো যাবে।’ ঢাকার বাইরে বিদ্যুতের আসা-যাওয়ায় একদিকে যেমন শিল্পকারখানাসহ উদ্যোক্তাদের পণ্য উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমন তীব্র গরম ও লোডশেডিংয়ে শিশু-বৃদ্ধদের বেশ কষ্ট হচ্ছে। এরই মধ্যে দেশজুড়ে চলা এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা পড়েছেন চরম বিপাকে। তারা জানান, বিদ্যুতের আসা-যাওয়ায় ঠিকমতো পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারছেন না। সিলেট সরকারি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী আবিদুল হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পরীক্ষায় কী হবে জানি না। লোডশেডিংয়ের কারণে প্রস্তুতি নেওয়া যাচ্ছে না।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights